প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবারও ঢাকায় পরিবহন নৈরাজ্য

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানী ঢাকায় আবারও গণপরিবহনে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। যাত্রী নিয়ে টানাটানি, মাঝরাস্তায় যাত্রী নামিয়ে দেওয়া, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা, যাত্রী পেতে দুই বাসের রেষারেষিসহ সব নৈরাজ্য আবারও ফিরে এসেছে রাজধানীর সড়কে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে না কোনো বাসেই। করোনাকালে যানবাহনে যাত্রী কমে গেলেও গাড়ির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে যাত্রী পেতে স্টপেজগুলোয় দাঁড়িয়ে থাকছে বাসের দীর্ঘ সারি। প্রতিটি স্টপেজেই এখন এই অভিন্ন চিত্র। যাত্রীবাহী বাসের এসব বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে ঢাকায় যানজট বেড়ে গেছে। এজন্য উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মাণাধীন মেট্রোরেলের কর্মযজ্ঞকেও দায়ী করেছেন অনেকে। কিছু জায়গায় বাস বে নির্মাণ করা হলেও সেসব স্থানে বাস থামছে না। তারা যাত্রী তুলছে নিজেদের সুবিধাজনক স্থান থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়ক-মহাসড়কে বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা, কিছু সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যায়। রাজধানীর এমইএস মোড়ে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হলে দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গড়ে ওঠে। তখন সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাপে গত দুই বছরেও সেই সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগ করতে পারছে না সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এখন সড়কে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কম। ফলে অনিয়ম, নৈরাজ্য অনেক বেশি। গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকরা কোনো আইনের তোয়াক্কা করছেন না। এমইএস মোড়ের দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেখানে একটি আন্ডারপাস নির্মিত হয়েছে। এর সুফল হয়তো সে এলাকার যাত্রী-পথচারীরা পাবেন। সেখানকার দুর্ঘটনার পর ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর ভাটারায় বাসচাপায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়-ছাত্র আবরার। সেখানে তার নামে একটি ফুটওভার ব্রিজ করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু নগরজুড়ে বেপরোয়া যানবাহন চলাচল এখনো অব্যাহত রয়েছে। আলোচিত কোনো দুর্ঘটনার পর সাময়িক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সড়ক নৈরাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধানের পথে নেই কেউই। অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকদের কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যায় না। সরকারি সংস্থাগুলোও পরস্পরকে সহযোগিতা করে না। সড়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর মাত্র কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে সড়ক পাহারা দেওয়া কঠিন। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সহযোগিতাও ঠিকমতো মেলে না। নানামুখী জটিলতায় সড়ক নৈরাজ্যের শিকার মানুষগুলো বিচার পর্যন্ত পান না। ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক বাস থেকে নেমে পেছনের বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যান বাসসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট সাংবাদিক জগ্লুল আহ্মেদ চৌধূরী। তার মৃত্যুর ছয় বছরেও ঘাতক চালকের বিচার হয়নি। এ ঘটনায় সরকার গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট ফাইলচাপা পড়ে আছে। ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহ উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই গণপরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধে বাসরুট ফ্রাঞ্চাইজির বিষয়টিতে জোর দিয়েছি। এতে বাস ড্রাইভারদের বাড়তি আয়ের জন্য রেষারেষি করতে হবে না। মাস শেষে তাদের নির্ধারিত বেতন নিশ্চিত থাকবে। তিনি বলেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক এ কাজটি শুরু করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর তা থেমে যায়। এখন নতুন করে দুই মেয়র কাজটি শুরু করেছেন। আশা করি, এবার সড়কে শৃঙ্খলা আসবে।বাংলাদেশ প্রতিদিন

এদিকে গত ৬ অক্টোবর নগর ভবনে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা ও যানজট নিরসনে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন’ কমিটির এক সভা হয়েছে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, ট্রাফিক বিভাগ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাস মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে মেয়র তাপস গণমাধ্যমকে বলেন, বাস রুট রেশনালাইজেশন ও টার্মিনাল নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিবেদন আমরা হাতে পেলে আগামী সভা থেকে কাজ শুরু করব। বৈঠক শেষে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, শতকরা ৬৩ শতাংশ মানুষ বাসে চলাচল করে। আমরা দুই সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আলোচনা করেছি। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যে চেষ্টা করেছিলেন তার ধারাবাহিকতায় ঢাকা সিটির দুই মেয়র হিসেবে আমরা এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এটার একটা রূপ অচিরেই দেখা যাবে। জনগণের স্বপ্ন বাস রুট রেশনালাইজেশনে দুই মেয়র একত্রে কাজ করব- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি। সড়ক পরিবহন মালিকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব ও এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, মাঝরাস্তায় যাত্রী নামিয়ে দেওয়া, যত্রতত্র বাস রেখে যাত্রী তোলা, যাত্রীর জন্য দুই বাসের রেষারেষিসহ সব নৈরাজ্য বন্ধে আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছি। বিআরটিএ এসব ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মামলা দিচ্ছে। নতুন আইনের কঠোর প্রয়োগ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বাসরুট ফ্রাঞ্চাইজিতে যেতে পারলে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ হবে। এ লক্ষ্যে আমরা একটি সভা করেছি দক্ষিণ সিটির মেয়রের নেতৃত্বে। আগামী মাসে আবার বৈঠক হবে। কাজ এগোচ্ছে। এদিকে করোনা সংক্রমণের এই সময়েও গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। যাত্রী সুরক্ষার ১১ দফা শর্তের কিছু মানছেন না পরিবহন কর্মীরা। উপরন্তু নিজেদের সুরক্ষার বিষয়েও উদাসীন তারা। সকালে অফিস শুরুর সময় এবং বিকালে অফিস শেষে গাদাগাদি করে যাত্রী নিচ্ছে যাত্রীবাহী বাসগুলো। কিন্তু মাস্ক ও স্যানিটাইজার ব্যবহারে কোনো উদ্যোগই নেই কোনো পরিবহনে। গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহনের কারণে গণপরিবহন থেকে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। মতিঝিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আকিব হোসেন বলেন, আমাকে প্রতিদিনই উত্তরা থেকে বাসে অফিসে যেতে হয়। এ পথের অধিকাংশ গণপরিবহনে এখন আর কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। অনেক ভয়ে ভয়ে যাতায়াত করি। কার কাছ থেকে সংক্রমিত হই জানি না। সামর্থ্য থাকলে বিকল্প উপায়ে গন্তব্যে যেতাম। তিনি বলেন, স্যানিটাইজার ব্যবহারে কত টাকা আর খরচ হয়। মাস্ক তো যাত্রীরাই নেবেন নিজেদের প্রয়োজনে। সবার স্বার্থে এ দুটি বিষয় নিশ্চিত করা উচিত।

যানজট বেড়েছে বাসের কারণে : করোনাকালেও রাজধানীতে দুঃসহ যানজটে পড়ে দীর্ঘ সময় রাস্তায় কাটাতে হচ্ছে যাত্রীদের। যেন মহামারীর এই আকালেও পুরনো চেহারাতেই ফিরে গেছে রাজপথ। এর জন্য যাত্রীবাহী বাসের বিশৃঙ্খল চলাচলকে দায়ী করছেন অনেকে। এখন বাসগুলো যাত্রীর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বাসস্টপে অপেক্ষা করে। ফলে নগরীর প্রতিটি স্টপেজে বাসের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। এর বাইরে মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটসহ (বিআরটি) বিভিন্ন উন্নয়নকাজের জন্য সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়াকেও যানজটের কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, করোনার এই সময়ে বাসের যাত্রী কমে গেছে। ফলে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কোম্পানির বাস রাস্তায় চলে না। তবু যানজট বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। তিনি বলেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মাঝবরাবর মেট্রোরেলের কাজ চলছে। রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় নগরীতে যানজট বেড়েছে। কারণ, সরু হয়ে যাওয়া রাস্তা ব্যবহার করেই বাসগুলোকে চলতে হয়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত