প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআরবি সংবাদ সম্মেলন এবং তথ্যবিভ্রাট

ডা. আরমান রহমান, এমবিবিএস, এমপিএইচ, পিএইচডি, ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড থেকে: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে কয়েকদিন আগে আইইডিসিআর এবং আইসিডিডিআরবি সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্ত্যবে যে তথ্যবিভ্রাট হয়েছে, একজন গবেষক হিসেবে তার একটা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছি।

উনারা যে পরীক্ষাটি করেছেন তা হল ঢাকা শহরে বাসায় থাকা এবং বস্তিতে থাকা মানুষের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শতকরা কতজনের করোনা ভাইরাসের বিপরীতে এন্টিবডি তৈরী হয়েছে। তারা ঢাকা শহরের ৩২২৭ টি বাসার থেকে ৫৫৩ জন কোভিড-১৯ এর লক্ষণযুক্ত এবং ৮১৭ জন লক্ষণহীন মানুষকে শনাক্ত করেছেন। এদের মধ্যে থেকে ৩৩৩ লক্ষণযুক্ত এবং ৩৫৯ জন লক্ষণহীন মানুষের রক্তে করোনা ভাইরাসের এন্টিবডি শনাক্ত করেছেন।

একই ভাবে তারা বস্তিতে যেয়ে সেখান থেকে ৯৬ জন লক্ষণযুক্ত এবং ৩২৪ জন লক্ষণহীন মানুষকে শনাক্ত করে তাদের মধ্যে থেকে যথাক্রমে ৩৬ এবং ৮৯ জন মানুষের রক্তে এন্টিবডি দেখেছেন। এইপরীক্ষা থেকে হিসাব করলে দেখা যায় বাসায় থাকা শহুরে মানুষের মধ্যে ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরেই করোনার এন্টিবডি শনাক্ত করা গেছে। আর বস্তিতে থাকা ৭৪ শতাংশ মানুষের শরীরে পাওয়া গেছে করোনার এন্টিবডি।

এখানে উল্ল্যেখ্য যে উনাদের মূল লক্ষ ছিল সাধারণ মানুষের শরীরে করোনার এন্টিবডি শনাক্ত করা, কাজেই এখানে করোনা রোগী টেস্টের মাধ্যমে আগেই শনাক্ত করা জরুরি ছিল না, কাজেই তারা এইসমস্ত মানুষের পিসিআর রিপোর্ট আছে কি নেই তা তারা আমলে নেন নি, আমলে নিয়েছেন তাদের জ্বর সর্দি কাশি ছিল কি না। উনারা ১২-অক্টোবর-২০২০ তারিখে যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তার থেকে আমরা কি জানতে পারি?

এক-প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায় বস্তিবাসী মানুষের মধ্যে করোনা এন্টিবডি শনাক্তের হার বাসায় থাকা মানুষের থেকে বেশি। দুই-বস্তিবাসীদের মধ্যে আই জি জি এর পরিমান বাসাবাড়িতে থাকা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু কেন বেশি তা জানতে আরো বিশ্লেষণ এবং গবেষণা প্রয়োজন। তিন-একটি বিশাল সংখ্যার শহরের এবং বস্তিবাসী মানুষের রক্তে এন্টিবডি নির্ণয় করা গেছে, কাজেই ধারণা করা যায় শীঘ্রই তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যদিও তৈরি হওয়া এই এন্টিবডি কতদিন তাদেরকে করণামুক্ত রাখবে, তা এই সমীক্ষার থেকে বলা যায় না। চার- এই গবেষণায় এন্টিবডি শনাক্তের যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তা প্রচলিত প্রদ্ধতির থেকে একটু আলাদা এবং তা উনাদের ল্যাবেই তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশে হওয়া এই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত আরো মাঠ পর্যায়ের গবেষণা, ভ্যাক্সিনের কার্যকরী প্রয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে যুগান্তকারি ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। এই একই গবেষণা যদি আরো বিস্তৃত ভাবে করা যায়, তাহলেই তা ঢাকা শহরের মানুষের করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্তের আসল চিত্র তুলে ধরতে পারবে।

উনারা আরো বলেছেন তারা ৬৭ জন মানুষের ভাইরাস জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন। এই জিনোম সিকোয়েন্স থেকে তারা দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পরা করোনা ভাইরাস অন্যান্য দেশের মূল কয়েকটি করোনা ভাইরাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এই খবরটিও ভ্যাক্সিন আসার আগেই জানা জরুরি ছিল।

বাংলাদেশের করোনা ভাইরাস দ্রুত মিউটেশন করেছে; এরকম গুজবকে উড়িয়ে দিয়ে এই গবেষণাই প্রমান করে যে বাংলাদেশে ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতা অন্যান্য দেশের মতোই হবে।

আই ই ডি সিআর তাদের দৈনন্দিন রুটিন কাজের সাথে সাথে সীমিত সক্ষমতার মধ্যে আইসিডিডিআর, সহযোগিতায় যে উঁচু দরের গবেষণা চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের মানুষের উচিত তাকে সাধুবাদ জানানো। সাইন্টিফিক ইনফরমেশন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যে দক্ষ সাংবাদিক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত