প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নতুন উদ্যোগ, টিকে থাকবে বিটিসিএল?

ডেইলি স্টার: অনেকেই শেষ কবে ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করেছেন তা মনে করতে পারেন না। কয়েকটি পরিবার এখনো ঘরের কোণায় কোনো একটি টেবিলে ল্যান্ডফোন সাজিয়ে রাখলেও এটির ব্যবহার তেমনটা নেই বললেই চলে। মাত্র দুই দশক আগেও অনেকেই বাসায় ল্যান্ডফোন রাখতেন। কিন্তু, এখন এটি অতীতের নিদর্শন।

তবে, বর্তমানে কয়েকটি বাসায় প্রবীণ সদস্যদের সুবিধার্থে ল্যান্ডফোন রাখা হয়। এই ধরনের পরিবারের সংখ্যা খুবই কম। এই ফোনগুলো মূলত বেশিরভাগ সরকারি ও বেসরকারি অফিসেই ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ইন্টারনেট-মোবাইলের সহজলভ্যতা ও স্মার্টফোনের উত্থানের ফলে ল্যান্ডফোন এখন বাড়িতে সাজিয়ে রাখার একটি বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা নাভিদ হাসান খান বলেন, ‘ষাটের দশকের শেষের দিকে আমাদের বাড়িতে টেলিফোন সংযোগ ছিল। তবে, আমরা আজকাল কেউই এটা ব্যবহার করি না। আমাদের দাদার স্মৃতিকে ধরে রাখতে টেলিফোন সেটটি বাসায় রেখেছি।’বাংলাদেশ টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ বোর্ড (বিটিটিবি) এখনো কার্যকর। তবে, মোবাইল ফোনের যুগে এটির কোনো গরিমা নেই।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে চালু হওয়ার পর বাংলাদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানি বিটিটিবি’র ব্যবহারকারি ব্যাংক ও এর উপার্জনে কঠোরভাবে আঘাত করে, যেখান থেকে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সত্তা এখনও চাঙা হতে পারেনি। নাম পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) আরও দ্রুত ও উন্নতমানের সেবা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে।

বিটিসিএল ২০০৮ সালে যাত্রা শুরুর সময়ে উত্তরাধিকার সূত্রে ৮ দশমিক ৬৬ লাখ ব্যবহারকারী পেয়েছিল। তবে, এটি ধীরে ধীরে কমেছে। সরকারি তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে ল্যান্ডফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ দশমিক ৩০ লাখ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সঙ্গে তুলনা করলে সংখ্যাটি তুচ্ছ।

দেশে বর্তমানে ১৬৬ মিলিয়নেরও বেশি মোবাইল ফোন সিম ব্যবহারকারী রয়েছেন। ১৮ বছরের বেশি বয়সী জাতীয় আইডি কার্ড আছেন, এমন যে কেউই সর্বাধিক ১৫টি সিম কিনতে পারেন। কম ব্যবহারকারী অর্থ হলো কম রাজস্ব। বিটিসিএল বেশ দুর্বলভাবে কাজ করছে এবং বর্তমানে এটি কেবল সরকারি ভর্তুকির ওপর টিকে আছে।

২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে বিটিসিএল প্রায় ১০৬ কোটি টাকার নিট মুনাফাসহ ১৬৮৯ দশমিক ৩৬ কোটি টাকা আয় করে। ১১ বছর পর, এই আয় প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বিটিসিএল আয় করেছে ৮৮৬ দশমিক ৮১ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩8৮ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

২০১২-২০১৩ আর্থিক বছরে ব্যতিক্রম ছাড়া গত দশ বছর ধরেই লোকসান গুনছে বিটিসিএল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিটিসিএল কর্মকর্তা সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তারা এখন নগদ অর্থ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।

ভারতেও চিত্রটি প্রায় একই রকম

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড (বিএসএনএল) এক সময় ভারতে একটি উচ্চ লাভজনক সংস্থা ছিল। তবে, এটি ২০১০ সাল থেকে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে। সরকারি মালিকানাধীন আরেকটি টেলিযোগাযোগ মহানগর টেলিফোন নিগম লিমিটেডও (এমটিএনএল) প্রায় এক দশক ধরে ক্ষতির মুখে পড়েছে।

গত বছরের অক্টোবরে সরকার এই দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জন্য ৬৯ হাজার কোটি রুপি পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। তবে, গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, টেলিকম পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ক্ষতির মুখোমুখি।

অস্তিত্ব টেকাতে বিটিসিএল

বিটিসিএলের এমডি রফিকুল মতিন জানান, ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়াতে তারা ল্যান্ডলাইন টেলিফোনকে বহুমুখী করার জন্য বেশ কয়েকটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরিষেবার মান বাড়িয়ে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আমরা এখন এক থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া যেকোনো অভিযোগের সমাধান করছি। গ্রাহকের অভিযোগ ও সমস্যা সমাধানে “টেলিসেবা” অ্যাপ চালু করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিটিসিএল কেবল টেলিফোন পরিষেবা না, ইন্টারনেটসহ বহুমাত্রিক পরিষেবা দেওয়ার কথাও ভাবছে। গ্রাহকরা আমাদের টেলিফোন সংযোগের সঙ্গে একই লাইনে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পাবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিটিসিএল ১১-সংখ্যার নম্বর সরবরাহ করা শুরু করেছে, যাতে ব্যবহারকারীরা যেকোনো জেলাতে বাস করেই একই নম্বর ব্যবহার করতে পারেন। আমরা ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো একটি মোবাইল অ্যাপ “আলাপ” চালু করব, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা যেকোনো জায়গা থেকে যোগাযোগ করতে পারেন।’ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিটিসিএল সারা দেশে এক হাজার ২১৭ ইউনিয়নে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের কাজ করছে।

বিটিসিএলের এমডি বলেন, ‘আমাদের ওয়াই-ফাই দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হবে। অন্য যেকোনো ব্রডব্যান্ড সংস্থার তুলনায় আমাদের ইন্টারনেট আরও সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী হবে।’ তবে, একাধিক ল্যান্ডলাইন টেলিফোন ব্যবহারকারী জানান, বিটিসিএলের অব্যবস্থাপনা, ঘুষ ও দুর্বল গ্রাহকসেবার অতীত রেকর্ডের কারণে তারা বিটিসিএলের পরিষেবা নেবেন কি না, এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।

৫০ বছর বয়সী ব্যবসায়ী বাদল চৌধুরী বলেন, ‘তারা যদি টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা সরবরাহ করে, তবুও আমি এটা নেবো কি না, সেটা নিয়ে ভাববো। ইন্টারনেটের গতি কেমন বা এটির জন্য কত খরচ হবে সেসব নয়, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্রাহক পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা কতটা ভালো।’

তিনি আরও বলেন, ‘বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে, মধ্যরাতে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তারা তখন সেটা মেরামত করতে আসবে। সরকারি সংস্থা যে আমাকে এই সার্ভিস দেবে না, আমি এ বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত।’

বাসার ল্যান্ডলাইনটি নিয়ে কী পরিমাণ ভোগান্তিতে পড়েছিলেন সে কথাও স্মরণ করেন বাদল। তিনি জানান, প্রায়ই তার ল্যান্ডফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত এবং দীর্ঘসময় ভোগান্তির পর এটি ঠিক করার জন্য এমনকি লাইনম্যানকেও ঘুষ দিতে হয়েছিল।

ঘন ঘন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বিটিসিএলের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ। যদিও বিটিসিএল জানায়, গ্রাহকদের আকর্ষণ করার জন্য তারা এ বিষয়ে আরও বেশি এবং আরও ভালো পরিষেবা চালু করছে। এই বছরের শুরুর দিকে বিটিসিএলের এমডি রফিকুল মতিন ব্যক্তিগতভাবে বিটিসিএলের পরিষেবা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন। বাদল বলেন, ‘টেলিফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবা ২৪/৭ প্রয়োজনীয়। এটা নয়টা থেকে পাঁচটার বিষয় নয়।’

পেশায় ফ্রিল্যান্সার ৩০ বছর বয়সী নাভিদও একই কথা জানান। তবে, তিনি অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘বিটিসিএল আগের তুলনায় সাম্প্রতিক বছরে এর পরিষেবার মান ভালো করেছে।’ নাভিদ বলেন, ‘আমি দেখেছি কীভাবে আমার পরিবার সংযোগ ঠিক করার জন্য অফিস থেকে অফিসে দৌঁড়াতেন। বিভিন্ন জায়গায় আবেদন করার পরে লাইন ঠিক করতে প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহ লেগে যেত। তবে, আপনি যদি এখন অভিযোগ করেন, তাহলে সেদিন বা পরের দিনই লাইন ঠিক করে দেবে।’

সর্বাধিক পঠিত