প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাহমুদুর রহমান: যেখানে স্বাভাবিক পন্থা অনেক আগেই মরিচা পড়ে গেছে, সেখানে দাবি ছাড়া তো উপায়ও নেই

মাহমুদুর রহমান: দাবি আদায় হচ্ছে না, কেননা ক্ষমতাসীনরা (সরকার হইতে পারে, ভার্সিটি অথরিটি হইতে পারে) নানা ষড়যন্ত্র করে আন্দোলন বানচাল করে দিচ্ছে, বিগত প্রায় সব কয়টা আন্দোলনের ক্ষেত্রেই এই কথা শুনেছি আমরা সবাই। কথা পুরোপুরি মিথ্যা বা ভুল না হলেও এই মুহূর্তে কথাটা অজুহাত ছাড়া কিছু না। কেননা বছরের পর বছর যখন একই রকম ভাবে এক একটা আন্দোলন বানচাল করা হয়, সেই সাথে ভেসে যাওয়া আন্দোলনকারীরাই কী আন্দোলন নষ্ট হওয়া বা দাবি আদায় না হওয়ার জন্য দায়ি না? পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো আন্দোলন, কোনো দাবিই বিরুদ্ধতা বাদে সফল হয় না। কথা হলো যে দাবিটা করা হচ্ছে সেটা আসলে কয়জনের দাবি, কে কী চায় সেটা স্পষ্টভাবে জানা। মিছিল দেখে মিছিলে চলে যাওয়া মানুষেরা মিছিলের শেষ পর্যন্ত থাকে না। কিন্তু যারা জানে না মিছিল কেন হচ্ছে, তাদের সেটা জানানো যায়। আমাদের সেই জানানোর প্রোসেসটা গড়ে ওঠেনি। কোনো একটা আন্দোলন হুট করে শুরু হয়। কিন্তু গড়ে ওঠা আর তারপর ধরে রাখার প্রোসেস নেই, মানুষ নেই। সবাই যে কোন আন্দোলনের সাথে একাত্তর, নব্বই জড়িয়ে থাকেন। সেটা জড়িয়েই একটা উদাহরণ দেই, তখনকার যে দাবি ছিলো তা জনসাধারণের দাবি ছিলো। তাই সবাই যুক্ত হয়েছিলো।

কিন্তু তখনো সবাই আসলে বুঝতো না। একাত্তরে গ্রামের একজন কৃষক বুঝতো না দেশ কী, স্বাধীনতা কী। কিন্তু সে বুঝতো সে ক্রমাগত ঠকে যাচ্ছে। আর সেই বোঝানোর মানুষগুলো কখনো ছিলো ইউনিভার্সিটির ছাত্র, কখনো নিবেদিত নেতা। এখন আমরা সেই বোঝানোর জায়গাটায় কতোটা সফল সেই প্রশ্নটা থাকছে। কেননা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা মজা লুঠতে, প্রধান বিরোধী পক্ষ সার্ভাইভ করার জন্য চুপ আর যাদের কাছ থেকে অনেকে আশা করে বা যারা আশা জাগিয়ে থাকে, শেষমেশ তাদের কাপড়ের ব্যাগ, মুখ ভর্তি দাড়ি আর কিছু বাঁধা বুলি ছাড়া কিছু থাকে না। জনসাধারণ বলে আমরা যাদের বুঝি, এদের জীবনে অনেক সমস্যা থাকে। টাকার সমস্যা, বউয়ের সাথে ঝগড়া, পাইলস, দ্রুতপতন ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব ছেড়ে তারা আন্দোলনে ততোক্ষণই থাকবে যতোক্ষণ তাদের বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হবে, তুমি অমুক জায়গায় বঞ্চিত। কিন্তু সেই কাজটাই করা হচ্ছে না। বাঙালি আরামে থাকতে চায়। যে কোনো ওজুহাতে প্যারা এড়াতে চায়। কিন্তু প্যারা না নিলে দাবি আদায় হবে না।

প্রশ্ন হলো বিচার তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেখানে বিচার কেন দাবি করতে হবে? উত্তর হলো যেখানে স্বাভাবিক পন্থা অনেক আগেই মরিচা পড়ে গেছে, সেখানে দাবি ছাড়া তো উপায় নেই। শুধু দাবিই না, প্রয়োজন জোর গলায় কথা বলা। কিন্তু যারা বলে তারাও আজকাল দুইদিন পর আর বলে না। বললেও কেউ শোনে না। আমার আজকাল ইলিয়াস কাঞ্চনের কথা বেশ মনে পড়ছে। বসুন্ধরায় রেইডের পর আপনারা যখন কালো কালো ডিপি বদলে চ্যালেঞ্জিং টাইমএ ভেসে যাচ্ছিলেন, ওই লোকটা একা একটা মেগাফোন হাতে রাস্তায় চিৎকার করছিলো পাগলের মতো। দেখেন সরকার আকাশ থেকে পড়ে না। সরকার তৈরি করি আমরা। জাল ভোটের কথা বলতে পারেন। কিন্তু জাল ভোট যে ঠেকাইতে যে আমরা কিছু করিনি সেটা বলা উচিত। ফুটপাতে কেবল ছাত্রলীগ বাইক চালায় না, মাঝে মাঝে আপনিও পাঠাও রাইডারকে বলেন ফুটপাতে উঠতে। সরকারের শীর্ষস্থানে বসা মানুষেরাই কেবল সরকার না, ব্যাংকের পিয়ন থেকে তুখোর আমলা, সবাই সিস্টেমের অংশ। সেখানে আমার আপনার বাপ, চাচা, ভাই, মামাও আছে। সিস্টেমরে খেয়ে দিয়ে যে টাকা আসে সেই লাভের গুড় আপনার আমার পকেটেও আছে।

আমরা কয়জন হালাল খাই আজকাল আমার সন্দেহ হয়। খাই না বলেই হয়তো আমাদের ক্বলবে সীলমোহর পড়ে গেছে। নাহলে দুই দিন আগের ঘটনা, এতো দাবি এতো কথা আজকে ভুলে যাওয়ার কথা না। অনেকে বলবেন ভুলিনি। কিন্তু অ্যাক্টিভিটি তো তা প্রকাশ করে না। ফেসবুকে আন্দোলন নিয়ে যে এতো তর্ক হলো, সেই ফেসবুক আন্দোলনটুকুও নেই হয়ে যাচ্ছে। এই নষ্ট হয়ে যাওয়া আর ভুলে যাওয়া যতোগুলো নতুন ধর্ষক তৈরি করবে, কোনো রাজনৈতিক দলও হয়তো ততোগুলো তৈরি করে না। আন্দোলন নিয়ে বলতে গিয়ে অনেক কিছু বলে ফেলছি। মূল কথা হলো কিছু পাইতে হলে, বিশেষত ক্ষমতাবান আর তাদের চাটুকাররা দিতে চায় না, এমন কিছু পাইতে হলে জোর করে খুঁটি গেড়ে পড়ে থাকতে হয়। নইলে পাওয়া যাবে না। বলতেই পারেন পুলিশ মারে, লীগ মারে সেখানে বলি, কথায় কথায় যে বর্তমান সময়কে একাত্তরের সাথে তুলনা করেন, একাত্তরে মারেনি। মাইর পাছা তোলেনি বলেই সেই সময় জয় আসছিলো।এসে কোনো লাভ হয় নেই, আজকাল এটা অনেকে বলে। লাভ হয়নি কারণ স্বাধীনতা কী সেইটাই আমরা বুঝিনি।

আজকে সেই দিন আসলেই নেই কেননা আমরা আসলে সবাই কম বেশি সুখেই আছি। স্ক্রল বন্ধ করে দিলে কিংবা নেটফ্লিক্সে চলে গেলেই অন্য দুনিয়া। আসলে ঠিক কোনটা চাই, সেইটাই বোধহয় ঠিক হয়নি। কিংবা বাঙালি পুরুষের ২ মিনিটের মতো আমাদের আবেগও ২ মিনিটে এসে ঠেকছে। কিংবা আসলে আবেগ নেই, যা আছে সব সময়ের প্রয়োজনে শো-অব। না হলে যাদের কণ্ঠ, যাদের শব্দ কাল রাতেও কঠিন ছিলো, এখন তারাও কোমল আর অ্যাস্থেটিক। তবুও আশা থাকে যখন দেখি যুবায়েরের মতো অনেকে রাস্তায় চিৎকার করতে করতে পানির বোতল খুঁজতেছে। আরও হয়তো কয়দিন চিল্লাবে। আমি হয়তো আরও কয়দিন লিখবো। তারপর? আরেকটা ধর্ষণের আগ পর্যন্ত। আরেকজন আবরারের আগ পর্যন্ত। আরেকজন মাহমুদের হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত