প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা ৩২ নম্বরের বাসায় ছিলেন না বলেই আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে যান। সেদিন যদি ওই বাসভবনে থাকতেন, তাদের ভাগ্যে কী ঘটতো সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আমরা দেখেছি সেদিন রাতে দশ বছরের শিশু, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেলও হত্যাকারীদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। পরবর্তী দীর্ঘসময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। কারণ তারা দেশে ফিরতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা দেশ পরিচালনায় ছিলো বলে তাদের দেশে ফেরার পথে নানা ধরনের বাধা তৈরি করেছিলো। এরপরও বহুবাধা-প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি ১৯৮১ সালে ১৭ মে একটি বর্ষণমুখর অপরাহ্নে ঢাকায় এসে অবতরণ করলেন। এরপর থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলছেন। পর্যায়ক্রমে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২০ সালে এসেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এই র্দীঘসময় আমরা শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড মূল্যায়ণ করলে দেখতে পাই, তিনি বাধ্য হয়ে যে দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনযাপন করেন, এরপর ঢাকাতে ফিরে বৃষ্টিতে ভিজে যে কথা তিনি বলেছিলেন, মানুষ তা বৃষ্টিতে ভিজে শুনেছিলো। তিনি বলেন, ‘আমি এসেছি আপনাদের (সাধারণ মানুষকে) মুক্তি দিতে’ গণতন্ত্রের পথে মুক্তি। এই মুক্তির কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই মুক্তি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন, আমরা স্বাধীন দেশ অর্জন করি। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে এই মুক্তির পথ আবার রুদ্ধ করা হয়েছিলো। যেখানে আমাদের বঙ্গবন্ধুর দর্শন, আর্দশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা সেখানে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরমুহূর্ত থেকে দেশকে আবার পাকিস্তান কেন্দ্রিক করা হয়েছিলো। আমরা দেখেছিলাম, তারা মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনাকে ভূলুন্ঠিত করে পাকিস্তানের পশ্চাৎমুখী মনভাবাপন্ন হয়ে দেশকে পাকিস্তানমুখী করেছিলো। বাংলাদেশ বেতার মুহূর্তে মধ্যে রেডিও পাকিস্তান হয়ে যায়, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি মুহূর্তে পাকিস্তান জিন্দাবাদে রূপান্তরিত হয়েছিলো। সে সময় শেখ হাসিনা ফিরে এসে গণতন্ত্রের পথে বাঙালিকে মুক্তির দেওয়ার যে আন্দলোন শুরু করেছিলেন, সেই আন্দলোনের ফল আজ ২০২০ সালে বাংলাদেশ যেখানে দাড়িয়ে আছে।
বঙ্গুবন্ধুর হত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে ইতোমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তির রায় কার্যকর করা হয়েছে, বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনের মান্নোয়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিসহ সবক্ষেত্রে যে বহুমাত্রিক উন্নয়ন আমরা লক্ষ্য করেছি, এটি মূলত শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সুফল এবং শেখ হাসিনা যে বঙ্গবন্ধুর উদার মনোভাব নিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করেছেন সেটির বহু প্রমাণ দেয়া যেতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষের যে যোগাযোগের চাহিদা সেটি পূরণের জন্য শেখ হাসিনার অবদান স্মরণ করলে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তথ্য-প্রযুক্তিকে কুক্ষিগত করার জন্য সেসময় সিটিসেল নামে একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিকে এককভাবে অনুমোদন দিয়েছিলো। এই একটি মোবাইলসেট কোম্পানিকে মনোপলি দিয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিলো। এতে করে সংযোগ খরচসহ টেলিফোনের যে বিল নেওয়া হতো তা এতোই উচ্চ মাত্রায় ছিলো শুধু মধ্যবিত্ত কেন, অনেক উচ্চবিত্ত মানুষেরও মোবাইল টেলিফোন ব্যবহার করা সম্ভব ছিলো না। তবে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সিটিসেলের মনোপলি ভেঙে দিয়ে অন্যান্য মোবাইল অপারেটর কোম্পানিকে অনুমোদন দিলেন। এই সিটিসেলের মনোপলি ভেঙে দিয়ে প্রথম যে কোম্পানিটির অনুমোদন দিলেন সেটি ছিলো একটেল। এই একটেল কোম্পানির মালিক ছিলেন বিএনপির সাবেক এক মন্ত্রী। তিনি বিএনপির আমলে মনোপলির কারণে অনুমোদন পাননি কিন্তু শেখ হাসিনার শাসন আমলে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী হয়েও অনুমোদন পেয়েছিলেন, এরপর গ্রামীণফোন এবং পরবর্তী সময়ে বহু কোম্পানি বাংলাদেশে এসেছে। যার ফলে বর্তমানে রিকশা শ্রমিক থেকে শুরু করে প্রত্যেক সাধারণ মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। এতে বোঝা যায় সেদিনকার সেই সিদ্ধান্ত আজকে সাধারণ মানুষের যোগযোগের ক্ষেত্রে কতোটা প্রভাব ফেলেছে।

আজকের করোনার এই মহাসংকটে আমরা ঘরে বসে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারছি। এতে ডিজিটাল বাংলাদেশের যে প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করছি সেটির মূল অবদান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন প্রাককালে ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ ইশতেহার ঘোষণা করেছিলেন। সেই নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছেন, যদি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্বে আসেন তাহলে তিনি বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরের প্রচেষ্টা চালাবেন এবং রূপান্তর করবেন। তারই ধারাবাহিকতায় একযুগ পর আমার দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয় আন্তর্জাতিকভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে শেখ হাসিনা নন্দিত, প্রশংসিত ও স্বীকৃতি পাচ্ছেন এবং পুরস্কৃত হচ্ছেন। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সূদুরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা, তার দূরদৃষ্টি এবং অন্তরদৃষ্টি বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনিমার্ণের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার সাথে তথ্যের চাহিদার যে মৌলিক অধিকার এটি উপলব্ধি করে ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বাধীন তথ্য কমিশন গঠন করেছেন এবং জনগণের তথ্য আধিকার নিশ্চিতের জন্য তথ্য আইন প্রণয়ন করেছেন। তিনি গণযোগাযোগ ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছেন প্রচুর সম্প্রচার মাধ্যম, অনলাইন নিউজপোর্টাল, কমিউনিটি রেডিও, বেসরকারি খাতে রেডিওর অনুমোদন দিয়ে এবং পত্র-পত্রিকায় প্রণোদনা দিয়ে এমন এটি মাত্রায় নিয়ে গেছেন। যেখানে একজন সাধারণ নাগরিক সহজে গিয়ে তথ্য জানানোর পূর্ণ অধিকার দেওয়া আছে। এরপর যদি জনগণ মনে করে তথ্য আদায়ে বঞ্চনা হচ্ছে তাহলেও সেই বঞ্চনার কথা বলে প্রতিকার পাওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করা আছে।

তথ্য অধিকার যে মানুষকে কতোটা ক্ষমতায়িত করে, সেটি আমরা আধুনিক বিশে^ তাকালে দেখতে পাই। আমরা সবসময় বলি মানুষের ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ণের কথা প্রধামন্ত্রী বারবার বলে থাকেন। ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নারীর শিক্ষা, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং এইকসঙ্গে নারীর মৌলিক চাহিদা পূরণে যে অধিকার তা নানাভাবে কর্মবাস্তবায়নের পরিকল্পনা সরকার চালিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সলে প্রথম রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন থেকেই আমরা লক্ষ্য করেছি তিনি সমাজের বঞ্চিত মানুষের কথা সবসময় চিন্তা করেন। সেসময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থা, মাথাপিছু আয় অনেক কম ছিলো কিন্তু সেসময়ও আমরা দেখেছি বাজেটে বিভিন্ন সামাজিক ভাতা, বয়সক ভাতা, বিধবা ভাতা এই খাতগুলো প্রথমবারের মতো শুরু করা হয়। এছাড়া যেটাকে আমরা সামাজিক নিরাপত্তা বলে অবহিত করি সেটিও তিনিই প্রথম সূচনা করেন। যার ধারাবাহিকতা ২০২০ সালে এসেও বাজেটে লক্ষ্য করি, বাজেটের একটি বিশাল বরাদ্দ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে থাকে। কারণ তিনি সবসময় মনে করেছেন সমাজের বঞ্চিত মানুষেরস্বার্থ দেখা সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের কথা ১৯৯৬ সাল থেকে শুরু করে সব সময় তিনি যখনই সরকারে এসেছেন সরকারি বাজেটে তার প্রতিফলন আমরা দেখেছি। এই কথাটি বঙ্গবন্ধুর দর্শন থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গ্রহণ করে বাস্তবায়নে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন, স্বাধীনতার সুফল সাধারণ মানুষের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে এবং সাধারণের মানুষের মুখের হাসি অর্জন করা আমাদের মূল লক্ষ্য। শেখ হাসিনা সেটিই সবসময় বলেছেন, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার জন্যই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আস্থা রাখেন যেভাবে আস্থা রাখতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। তিনি বলেছেন, ডিজিটাল জ্ঞানসম্পন তরুণ প্রজন্মই বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করার পথে নেতৃত্ব দেবে। এই তরুণ প্রজ¥মের উপর আশাবাদ ও মানুষকে ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। আমরা মনে করি শেখ হাসিনার এই জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি আমাদের অগাত, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা শুভেচ্ছা থাকবে। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তিনি সুস্থ থাকুন, র্দীঘজীবী হোন, শতায়ু হোন। জয়তু শেখ হাসিনা।

পরিচিতি : সাবেক ভিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনুলিখন : আব্দুল্লাহ মামুন

সর্বাধিক পঠিত