প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আত্মরক্ষা ও সতর্কতার গুরুত্ব

মুফতি মাহমুদ হাসান: কারও ওপর অন্যায়, অবিচার, আক্রমণ ও জুলুমকে ইসলাম হারাম করেছে। কারণ, ইসলাম ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে ইসলাম আত্মরক্ষার অধিকারও দিয়েছে। নিজের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মরক্ষা করার অনুমতি রয়েছে। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তাতে উৎসাহিত করা হয়েছে। নারী, শিশু, শারীরিক প্রতিবন্ধীরা কোনো অন্যায় ও আক্রমণের শিকার হলে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তি প্রয়োগের অনুমোদন ইসলামি দন্ডবিধিতে রয়েছে।

অধিকার: ইসলাম আত্মরক্ষাকে মানুষের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং যে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, তোমরা তার ওপর আক্রমণ করো, যেরূপ সে তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছে। আর আল্লাহকে ভয় কর এবং জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৪) অন্য আয়াতে ধ্বংস ও ক্ষতির হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ফেল না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘তবে অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিবিধান করে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪১)

আত্মরক্ষার প্রস্তুতি: ইসলাম শরীরচর্চা ও আত্মরক্ষামূলক খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করেছে। মুমিনকে এতটুকু শারীরিক সামর্থ্য অর্জন করতে বলেছে, যেন নিজের ও দেশের প্রয়োজনে আত্মরক্ষা গড়ে তুলতে পারে। অক্ষম ও অসমর্থ হয়ে থাকা ইসলামে নিন্দনীয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে দুর্বল ইমানদারের চেয়ে শক্তিশালী ইমানদার বেশি পছন্দনীয়। যদিও উভয় প্রকার ইমানদারের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। তুমি তোমার কল্যাণকর বিষয়াদির প্রতি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর সাহায্য চাও, অক্ষম হয়ো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৬৪)

সতর্কতা: ইসলাম মানুষকে আত্মরক্ষার অধিকার দিয়েছে। আত্মরক্ষার মতো প্রস্তুতিও নিতে বলেছে। তবে তার আগে বলেছে, সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে। যেন কোনো ধরনের বিপদে পড়তে না হয় এবং পড়লেও তা থেকে সহজে উদ্ধার পাওয়া যায়। ইসলামের ইতিহাসে সতর্কতা অবলম্বনের এমন অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। যেমন : জোবায়ের ইবনুল আউয়াম (রা.) বলেন, ‘ওহুদ যুদ্ধের দিন রাসুল (সা.) দুটি বর্ম পরিহিত ছিলেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৯২)

আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আসার পর আকাক্সক্ষা পোষণ করলেন যে যদি তার কোনো সাথী তাকে পাহারা দিতেন। তখন আমরা অস্ত্রের আওয়াজ শুনলাম। রাসুল (সা.) বললেন, ‘কে? বলা হলো, আমি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, আপনাকে পাহারা দেওয়ার জন্য এসেছি। অতঃপর রাসুল (সা.) ঘুমালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৮৫)

এ ছাড়া ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নামাজরত অবস্থায় অতর্কিত আক্রমণে শহীদ হওয়ার পর উসমান (রা.) মসজিদে স্বতন্ত্র মেহরাব বানিয়ে সেখানে নামাজে দাঁড়াতেন। এমনিভাবে আলী (রা.) শহীদ হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রা.) মসজিদে স্বতন্ত্র মেহরাবে রক্ষীর পাহারায় নামাজে দাঁড়াতেন। (ওয়াফাউল ওয়াফা : ২/৮৮; তারিখে তাবারি : ৫/১৪৯)

জীবন ও সম্পদ রক্ষা: সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি স্বীয় সম্পদ রক্ষায় খুন হবে সে শহীদ, যে ব্যক্তি দ্বীন রক্ষায় খুন হবে সে শহীদ, যে ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষায় খুন হবে সে শহীদ, যে ব্যক্তি নিজ পরিবারের প্রাণ অথবা ইজ্জত রক্ষায় খুন হবে সে শহীদ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৮০; সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৪২১)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘জনৈক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে আরজ করলেন, যদি কোনো ব্যক্তি এসে আমার সম্পদ ছিনিয়ে নিতে চায়? রাসুল (সা.) বললেন, তোমার সম্পদ তুমি দেবে না। লোকটি বলল, যদি সে আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়? রাসুল (সা.) বললেন, তার সঙ্গে তুমি মোকাবিলা করো। লোকটি বলল, যদি সে এতে আমাকে হত্যা করে? রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে তুমি শহীদ। লোকটি বলল, যদি আমি তাকে হত্যা করি? রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে সে জাহান্নামি হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৫)

পাল্টা আক্রমণ: ইয়ালা (রা.) বলেন, আমার একজন কর্মচারী ছিল। সে জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলে একে অন্যের হাতে কামড় দেয়। এতে অপরজন কামড় থেকে তার হাত ছাড়াতে টান দিলে ওই ব্যক্তির একটি দাঁত পড়ে যায়। বিচার নিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে এলে রাসুল (সা.) তার দাঁতের ক্ষতিপূরণ দেওয়া লাগবে না মর্মে বিচার করেন এবং বললেন, সে কি তার হাত তোমার মুখে এমনভাবে চাবানোর জন্য রেখে দেবে যেভাবে মানুষ (খাদ্য) চাবায়? (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৯৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৭৪)

সম্ভ্রম রক্ষা: ধর্ষক কোনো নারীর ওপর চড়াও হলে যদি নারী সম্ভ্রম রক্ষায় তার ওপর আক্রমণ করে এবং এতে ধর্ষক খুন হয়, তবে ইসলামি দ-বিধিতে এই খুন দায়হীন। এই খুনের জন্য নারী শাস্তির মুখোমুখি হবে না। উবাইদ ইবনে উমায়ের (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ব্যক্তির ঘরে একজন মেহমান এলো। ফলে তারা জনৈক বাঁদিকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে পাঠাল। বাঁদিকে মেহমানের পছন্দ হলে তার পেছনে লাগল এবং তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করতে চাইল। বাঁদি তাকে বাধা দিল। সে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ মোকাবিলা করল। অতঃপর বাঁদি দৌড়ে পালাল এবং পাথর ছুড়ে মারল। এতে তার কলিজা বিদীর্ণ হলো। ঘরে এসে সবাইকে ঘটনা জানাল। তারা ওমর (রা.)-এর কাছে ঘটনার বৃত্তান্ত জানাল।

ওমর (রা.) সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে ফায়সালা দিলেন, সে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিহত হয়েছে, তার কোনো রক্তপণ দেওয়া লাগবে না।’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৭৯১৯, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ২৭৭৯৪)

সুলাইমান ইবনে ইয়াসার (রহ.) থেকে বর্ণিত, শামের জনৈক মহিলা জাহহাক ইবনে কাইস (রা.)-এর কাছে এসে ঘটনা বর্ণনা করল, জনৈক ব্যক্তি তার ঘরে করাঘাত করল। নারী তার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাহায্য চাইল। শীতের রাতে কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে এলো না। ফলে সে দরজা খুলে একটি পাথর নিয়ে তার ওপর নিক্ষেপ করলে লোকটি মারা যায়। জাহহাক ইবনে কাইস (রা.) সরেজমিন গিয়ে তদন্ত করে জানতে পারলেন, লোকটি একজন চোর, তার সঙ্গে চুরির সামগ্রীও রয়েছে। ফলে তিনি তার রক্তপণ বাতিল করলেন।’ ( ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ২৭৭৯৫)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত