হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরব লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে সরিয়ে নিচ্ছে। এ তথ্য জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অঞ্চলটির তেল সংরক্ষণ ট্যাংকগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহে ব্যাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা বলছে, মার্চ মাসের প্রথম কয়েক দিনে সৌদি আরবের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দর থেকে পাঁচটি সুপারট্যাংকার ইতোমধ্যে তেল বোঝাই করেছে। এতে ফেব্রুয়ারির গড় রপ্তানির তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি তেল রপ্তানি হয়েছে।
সাধারণত সৌদি আরব তার বেশিরভাগ অপরিশোধিত তেল আরব উপসাগরের রাস তানুরা বন্দর থেকে পাঠায়। সেখানে তেল মজুদ এখনো বন্ধ হয়নি, তবে সংঘাতের কারণে আগের মতো করে জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে পারছে না।
চলমান সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তেল, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলটির জ্বালানি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সৌদি আরবের বিশাল সংরক্ষণ সক্ষমতা
জেপি মরগান চেজের বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল তেল সংরক্ষণ সক্ষমতার কারণে হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় সৌদি আরব পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠানোর বিকল্প ব্যবস্থাও তাদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিচ্ছে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাস্পেক্টস জানিয়েছে, সৌদি আরব প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পূর্বাঞ্চল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠাতে পারে, যা বড় ধাক্কা সামাল দিতে সহায়ক হবে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকো জানিয়েছে, তারা দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল লোহিত সাগরের বন্দরে পাঠাচ্ছে। তাত্ত্বিকভাবে এই পাইপলাইন প্রতিদিন প্রায় ৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহণ করতে সক্ষম।
ইয়ানবু থেকে পাঁচটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ রওনা
ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, মার্চের প্রথম চার দিনে ইয়ানবু বন্দর থেকে পাঁচটি ভিএলসিসি (ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার) জাহাজ রওনা হয়েছে। এসব জাহাজ মোট মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল বহন করতে পারে।
এর ফলে মার্চে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল তেল পাঠানো হচ্ছে, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক গড় ছিল প্রায় ৭ লাখ ৮৬ হাজার ব্যারেল। এদিকে কিছু তেলবাহী জাহাজ, যেগুলো আগে আরব উপসাগরের দিকে যাচ্ছিল, সেগুলোও এখন লোহিত সাগরের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সংকটের প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম গত শুক্রবারের পর থেকে প্রায় ১৫% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে কাতার সাময়িকভাবে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দামও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় আরব উপসাগরের বিভিন্ন তেলক্ষেত্র ও রিফাইনারিতে সংরক্ষণ ট্যাংক দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন করে তেল মজুদ করার মতো জাহাজের সংখ্যাও দ্রুত কমে যাচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইরাক তাদের সংরক্ষণ ট্যাংক পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কিছু তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। আর জেপি মরগান চেজের বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, কুয়েতসহ আরও কয়েকটি উৎপাদক দেশ দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যেই একই সমস্যায় পড়তে পারে।
সূত্র- আল আরাবিয়া