যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর লাগাতার হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে তেহরান যে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি নামিয়েছিল, সেই সক্ষমতা এখন অনেকটাই স্তিমিত। তবে ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি কমলেও দমে যায়নি ইরান। উল্টো রণকৌশল বদলে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। গত ছয় দিনে অন্তত ১১টি দেশে হামলা চালিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে তেহরান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ খবর জানিয়েছে।
পেন্টাগন বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় বর্তমানে ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার ৯০ শতাংশ কমেছে। ড্রোন হামলার হারও কমেছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। কিন্তু ইরান এখন সংখ্যার চেয়ে নিরবচ্ছিন্নতার ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব মেটাতে তারা ব্যবহার করছে হাজার হাজার সস্তা আত্মঘাতী ড্রোন।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো হাসান আল হাসান বলেন, “ইরান এখন সংখ্যার চেয়ে স্থায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।” ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তথাকথিত ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলোতে সফল হামলা চালিয়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও লঞ্চার ধ্বংস করেছে। তা সত্ত্বেও ইরান তাদের সস্তা শাহেদ ড্রোন দিয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে।
১১ দেশে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত
নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ইরান এখন মিত্র ও প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে। তুরস্ক, সাইপ্রাস এবং আজারবাইজানসহ অন্তত ১১টি দেশে হামলা চালিয়েছে তেহরান। বুধবার তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রবাহী একটি সামরিক ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভূপাতিত করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক থিংকট্যাংক এদাম-এর পরিচালক সিনান উলগেন বলেন, “ইরান মূলত ঝুঁকির পরিধি বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে চাইছে।”
অর্থনৈতিক ধাক্কা ও তেলের বাজার
ইরানের হামলায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। সেখানে আটকা পড়েছে কয়েক হাজার জাহাজ, যা বিশ্বের প্রতিদিনের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বহন করে। ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ও কাতারের গ্যাস রফতানি বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তাহীনতা
সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ইরানের আকাশপথের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। গত সপ্তাহে দেশটিতে ১৬৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও বর্তমানে তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে। তবে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। দুবাই ও বাহরাইনের বিলাসবহুল হোটেল ও বহুতল ভবনে ড্রোন আছড়ে পড়ায় এসব দেশের পর্যটন ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ‘নিরাপদ ইমেজে’ বড় ফাটল ধরেছে।
জেনেভা গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ গবেষক ফারজান সাবেত বলেন, “ইরানের বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ক্ষমতা হয়তো কমছে, কিন্তু এই ড্রোনগুলো দিয়ে তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুঁকি জিইয়ে রাখতে পারবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান হয়তো তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মারণাস্ত্রগুলো যুদ্ধের পরবর্তী ধাপের জন্য জমা করে রাখছে। যখন শত্রু দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে আসবে, তখনই হয়তো তেহরান তার হাতে থাকা অবশিষ্ট শক্তিশালী ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহার করবে।