প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চীন-ভারত সঙ্কট : সমাধানের সূচনা কি মস্কোতেই?

ডেস্ক রিপোর্ট: লাদাখ সীমান্তে ১৫ জুন রাতে চীন ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষের পর দুই দেশের চারজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছেন মস্কোতে।

জানা গেছে, এ সপ্তাহে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ইতিমধ্যেই সেখানে গেছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। পরে তার সাথে যোগ দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

ঐ সম্মেলনে থাকবেন এই জোটের প্রধান উদ্যোক্তা চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়ে ফেংহি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

ভারতের সরকার কিছু না বলা হলেও চীনা কম্যুনিস্ট পারটির মুখপাত্র হিসাবে বিবেচিত গ্লোবাল টাইমসের প্রধান সম্পাদক টুইট করেছেন।

এসসিও জোটের বৈঠকের বাইরে শুক্রবার রাতে মস্কোতে ভারত ও চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা আলাদাভাবে বসে সীমান্ত সংকট নিয়ে কথা বলতে পারেন।

এছাড়া, বৃহস্পতিবার দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিজে জানিয়েছেন মস্কোতে ১০ সেপ্টেম্বর তিনি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই‘র সাথে বৈঠক করবেন।

জয়শঙ্কর বলেন, তিনি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে অনেকদিন ধরে চেনেন, সুতরাং “আমাদের দুজনের মধ্যে অর্থপূর্ণ কথাবার্তা হওয়া সম্ভব।“

তবে জয়শঙ্কর স্বীকার করেন, চীনের সাথে এখন যে সঙ্কট ভারতের তৈরি হয়েছে তার গভীরতা এবং বিপদকে খাটো করে দেখার কোনো উপায় নেই কিন্তু, তার মতে, “কূটনীতি ছাড়া এ সমস্যার সমাধানের বিকল্প কিছু নেই।“

মস্কোতে লাদাখ সংকট নিরসনের সূচনা কি আদৌ হতে পারে?

গত আড়াই মাস ধরে লাদাখ সীমান্ত কেন্দ্র করে ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে গড়াচ্ছে তাতে আদৌ তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক।

দিল্লির জওহরলাল নেহুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বলেন, লাদাখ সীমান্তে চীন ও ভারতের মধ্যে যা হচ্ছে তা দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর সঙ্কটের একটি ‘উপসর্গ মাত্র‘।

“দুই বা চার বা ছয় মন্ত্রীর বৈঠক থেকে সেই বৃহত্তর সঙ্কটের সমাধান হবেনা। বড়জোর সংকট আয়ত্তে রাখার ক্ষেত্রে কিছু ভূমিকা হয়তো রাখতে পারে। তার বেশি কিছু প্রত্যাশা করা ঠিক হবেনা।“

ভারত ও চীনের মধ্যে বৃহত্তর সেই সঙ্কট ঠিক কি? অধ্যাপক ভরদোয়াজ মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়াকে তার প্রভাব বলয়ের মধ্যে আনতে চীনের যে অভিলাষ ভারত সেটাকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবং চীন যে তাতে ক্ষুব্ধ।

তার মতে, ভারত মনে করে লাদাখ সীমান্তে হঠাৎ করে তৈরি হওয়া এই সঙ্কট মূলত সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলেন – “দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে ভারত কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করতে রেল ও সড়ক নির্মাণের একটি প্রস্তাবে ভারত বাগড়া দিয়েছে। নেপালে ও বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে চীনের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করছে ভারত।“

অধ্যাপক ভরদোয়াজের মতে, সামরিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত পিছিয়ে থাকলেও সম্পর্কে একটা ‘ভারসাম্য‘ রাখতে ভারত উদগ্রীব এবং সে জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীন বিরোধী যে জোট তৈরি হচ্ছে তাতে খোলাখুলি যোগ নিয়েছে।

সুতরাং পরিস্থিতির সমাধান এখন দুদেশের মন্ত্রীদের বা সামরিক কমান্ডারদের ভেতর দু-চারটি বৈঠকের মধ্যে এখন আর সীমাবদ্ধ নেই।

সে কারণেই, জুনের মাঝামাঝি সীমান্তের উত্তেজনা কমাতে দুই দেশের রাজনৈতিক এবং সামরিক পর্যায়ে দফায় দফায় কথা হলেও সোমবার আবারো পরিস্থিতি বিপজ্জনক চেহারা নেয়। কিছু মিডিয়ার খবরে প্রাণহানি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

আপোষের পথে নেই ভারত
কুয়ালালামপুর মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা চলার মধ্যেই গত দুই মাসে ভারত এমন কিছু সামরিক-কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে যা নিয়ে চীন বেশ উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা বিস্মিত।

ড. আলী প্রধানত ভারতের দুটো সামরিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন যা চীনের মাথাব্যথা তৈরি করেছে।

এক, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাত মিলিয়ে ভারত তাদের নৌবাহিনীর একটি আধুনিক রণতরী দক্ষিণ চীন সাগরে এমন এক জায়গায় (নাইন ড্যাশ লাইন) মোতায়েন করেছে যেটা চীন তাদের জলসীমার অংশ বলে দাবি করে। “যে জায়গার সাথে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই সেরকম একটি স্পর্শকাতর জায়গায় তাদের যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন একবারেই অপ্রত্যাশিত, বিস্মিত হওয়ার মত ঘটনা।“

পাশাপাশি, আন্দামান-নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের কাছে ভারত যেভাবে নৌ শক্তি বাড়িয়েছে তা চীনকে উদ্বিগ্ন করেছে।

আন্দামান-নিকোবর মলাক্কা প্রণালীর পশ্চিম দিকের প্রবেশ পথ। ব্যবসার দিকে দিয়ে চীনের কাছে এই জায়গাটির গুরুত্ব অনেক কারণ এই প্রণালী দিয়েই চীনের বাণিজ্যের ৬৫ শতাংশ চলে। চীনা মালবাহী জাহাজগুলোকে আন্দামান-নিকোবরের পাশ দিয়ে গিয়ে মলাক্কা প্রণালীতে ঢুকে ভারত মহাসাগরে পড়তে হয়।

“সেখানেই ভারত এমন ব্যবস্থা নিচ্ছে যে প্রয়োজনবোধে যে কোনো জাহাজকে তারা অবরোধ করতে পারে। এবং সেকথা ভারত খোলাখুলি বলছে।“

“আপনি যদি এসব মিলিয়ে দেখেন তাহলে দেখবেন চীনের মধ্যে বিশ্বাস এখন দৃঢ় হচ্ছে যে মীমাংসা করার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাত মিলিয়ে ভারত এখন চীনের বিরুদ্ধে লেগেছে।“

সামরিক দিক দিয়ে বৈরি পদক্ষেপের সাথে চীনা পণ্য এবং এবং বিনিয়োগের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে ভারতের সরকার। প্রায় ১৮০টির চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে যার অনেকগুলো চীনের সাথে ব্যবসায় লেনদেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ড. আলীর মতে, এই পরিস্থিতিতে চীনের পক্ষে ভারতের সাথে আপোষ-মীমাংসা দুরূহ হয়ে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
এরই সাথে যোগ হয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। দুটো দেশেই কট্টর জাতীয়তাবাদী দুটো সরকার, এবং এমন ধরনের সরকারগুলোর পক্ষে সীমান্ত নিয়ে আপোষ-মীমাংসা কঠিন।

অধ্যাপক ভরদোয়াজ বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি লাদাখ সঙ্কটের আপোষ মীমাংসায় বড়রকম নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোভিড প্যানডেমিক এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে সরকার যে চাপে পড়েছে তাতে সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে চীনের সাথে চলতি সঙ্কটকে একটা বড় বিকল্প উপায় হিসাবে দেখা হচ্ছে।

“আপনি যদি ভারতের মিডিয়ার দিকে তাকান সেখানে এখন প্রধান খবর সুশান্ত সিংয়ের আত্মহত্যা আর চীন। অর্থনীতি বা কোভিড পরে।“

সুতরাং মস্কোতে চীনা এবং ভারতীয় চার মন্ত্রী বসে কি বললেন তাতে খুব একটা ফল হবে বলে মনে করছেন না অধ্যাপক ভরদোয়াজ। “নেতৃত্ব নরেন্দ্র মোদী এবং শাহের হাতে।”

এই সংকটের পরিণতি কি?
খুব সীমিত আকারের একটি সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেনা না অধ্যাপক ভরদোয়াজ যদিও তার মতে তা অনেকটাই নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর।

ড. মাহমুদ আলী বলেন, যুদ্ধের পরিণতির বিবেচনায় দুটো পারমানবিক শক্তিধর দেশ যুদ্ধের কথা ভাবছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে, তার মতে, দুদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি সমাধানের সম্ভাবনাকে দুরে ঠেলে দিয়েছে।

৭০ বছর ধরে সীমান্ত নিয়ে যে বিরোধ- বিতর্ক চীন ও ভারতের মধ্যে চলছে তার সমাধানে যে রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রয়োজন তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো যে দুর্বল হয়েছে তা পরিষ্কার। বিবিসি, নয়া দিগন্ত

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত