প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এক হাজার দুর্ধর্ষ জঙ্গীর হদিস পাচ্ছে না পুলিশ : সব পালিয়েছে জঙ্গীদের অভয়াশ্রম পাকিস্তানে

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশের পাঁচটি নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের এক হাজার দুর্ধর্ষ জঙ্গীর হদিস পাচ্ছে না পুলিশ। এদের মধ্যে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত, মোস্ট ওয়ান্টেড, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত, পুরস্কার ঘোষিত জঙ্গীও রয়েছে। পাঁচটি জঙ্গী সংগঠন হচ্ছে- নব্য জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), আনসার আল ইসলাম, হিযবুত তাহরীর ও হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি)। পলাতক জঙ্গীদের মধ্যে অনেক দুর্ধর্ষ ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির শীর্ষ জঙ্গী পাকিস্তানে অবস্থান করছে। জঙ্গী তৎপরতার জন্য পাকিস্তানকেই নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিচ্ছে জঙ্গীরা। এসব জঙ্গীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা-ইন্টারপোলের রেড নোটিসও জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, দেশের কারাগারগুলো থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে যাওয়া জঙ্গীরাও আছে পলাতক থাকার তালিকায়। পলাতকদের গ্রেফতারের জন্য দেশের থানাগুলোতে বার্তা পাঠানো হয়েছে। জামিনে বের হওয়া পলাতকদের মধ্যে অনেক জঙ্গীই পরিচয় গোপন করে ও চোরাপথে চলে গেছে ভারত ও পাকিস্তানে। দেশের ভেতরে আত্মগোপনে থেকে গোপন এ্যাপসের মাধ্যমেও তৎপরতা চালাচ্ছে এমন অভিযোগ পেয়েছে জঙ্গী তদন্তকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে পলাতক জঙ্গীদের বিষয়ে এই ধরনের তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া আছে। এছাড়া কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের গোয়েন্দারা তাদের বিষয়ে সর্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। বিশেষ করে জামিনে পলাতক গুরুত্বপূর্ণ ২০ থেকে ২৫ জঙ্গী নেতার খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। গ্রেফতারের সময় অনেক জঙ্গীই ভুয়া পরিচয় দিয়েছে এবং ভুয়া পরিচয়ের জঙ্গীরা জামিনে বের হয়ে আর আদালতে হাজির হচ্ছে না বলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট কর্মকর্তার দাবি।

তদন্ত সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুর্র্ধর্ষ জঙ্গী সালাহ উদ্দিন ওরফে সালেহীন, হাফিজুর রহমান শেখ, মাহিন, সজীব ও তাওহীদ- এ রকম কয়েকটি ছদ্মনামও রয়েছে তার। তবে সবচেয়ে পরিচিত সালেহীন নামে। ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে হামলা চালিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে জেএমবির তিন শীর্ষ নেতাকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাদের একজন ছিল সালেহীন। দীর্ঘদিন ভারতে পালিয়ে ছিল সে। সেখানে উপমহাদেশীয় জেএমবির নতুন শাখা গঠনে নেতৃত্ব দেয় সালেহীন। জামা’আতুল মুজাহিদীন ইন্ডিয়া (জেএমআই) নামে আলাদা সংগঠন তৈরি করে সালেহীন ও তার সহযোগীরা। দুই সংগঠনে একাধারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল দুর্র্ধর্ষ এ জঙ্গী। বাংলাদেশ-ভারতের গোয়েন্দাদের কাছে সালেহীন মোস্ট ওয়ান্টেড এক জঙ্গী। কিছুদিন আগে ভারত থেকে সালেহীন পাকিস্তানে পালিয়ে যায় বলে জানা গেছে। সালেহীনের একাধিক সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারী সংস্থাগুলো। জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন শূরা সদস্য ছিল সালেহীন। তাকে ধরিয়ে দিতে অনেক আগেই ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা-এনআইএ তালিকায়ও সে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গী। পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার পর সালেহীনকে ধরা আরও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২০১৪ সালে প্রিজনভ্যানে হামলার পর জেএমবির দুর্র্ধর্ষ জঙ্গী সালেহীন ও সংগঠনের বোমা বিশেষজ্ঞ জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান ওরফে মিজান ভারতে পালিয়ে যায়। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় জেএমবির আরও দুই শীর্ষ নেতা সোহেল মাহফুজ ও ফারুক হোসেন। ভারতে অবস্থান করে তারা জেএমবি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করে। ত্রিশালের ঘটনার পর ছিনিয়ে নেয়া জঙ্গী রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়।

ভারতের বর্ধমানে খাগড়াগড়ের একটি বাড়িতে বিস্ফোরণে দু’জন নিহত হয় ২০১৪ সালের অক্টোবরে। এর পরই জেএমবির নাম সেখানে আলোচনায় আসে। ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে সালেহীন ও বোমারু মিজানের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে। এর পরই বাংলাদেশী গোয়েন্দাদের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দারা তথ্য বিনিময় করেন। পরে ভারতীয় পুলিশের বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সালেহীন ও মিজান ভারতে জেএমআই গঠন করেছে। বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার শেখ রহমতুল্লাহ সাজিদ নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা। ওই ঘটনায় নিহত শাকিল টাঙ্গাইলের বাসিন্দা ছিল। পরে বেরিয়ে আসে বিস্ফোরণের ঘটনায় সালেহীন, বোমারু মিজান ও তরিকুলের জড়িত থাকার কথা। এনআইএর চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে। এনআইএ সদস্যরা ১১ জনের একটি তালিকা দেন যারা বাংলাদেশে পালিয়ে আছে বলে তাদের সন্দেহ। অন্যদিকে র‌্যাবের পক্ষ থেকে ১০ জঙ্গীসহ ৫১ জনের একটি তালিকা দেয়া হয় এনআইএকে, যারা ভারতে পালিয়ে রয়েছে বলে তাদের ধারণা। ওই তালিকায় থাকা জঙ্গীদের মধ্যে ছিল- সোহেল মাহফুজ, সালেহীন, বোমারু মিজান, আনোয়ারুল ইসলাম, সাখাওয়াত ও আবু সাঈদ শেখ হোসাইন। এরপরই পলাতক জঙ্গীদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক তৎপরতা চালায়। ভারতে গ্রেফতার হয় বোমাররু মিজান, সোহেল মাহফুজ ও ফারুক হোসেন সেখানকার কারাগারে আছে তদন্ত সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান।

জঙ্গী বিষয়ক তদন্তকারী সংস্থা সিটিটিসির সূত্রে জানা গেছে, নিরাপদে জঙ্গী তৎপরতা চালানোর জন্যই সে মূলত পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছে। নিরাপদ সেফ হোমের জন্য জামিন নিয়ে দেশের বাইরে পালিয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজনভ্যানে হামলাকারী জঙ্গী নেতা আজমির ওরফে অমিত। হামলার অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে তাকে খুঁজছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই মামলার আসামি গোলাম সারওয়ার রাহাত জামিন নিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই আত্মগোপন করেছে। তাকেও খুঁজে পাচ্ছেন না মামলার তদন্তকারী সিটিটিসির কর্মকর্তারা।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপন করে বিভিন্ন গোপন অ্যাপসের মাধ্যমে পলাতক অন্য জঙ্গীরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অনেকেই দেশের বাইরে থেকে এ দেশের পলাতক জঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। বিশেষ করে আনসারুল্লা বাংলা টিম বা এবিটির শক্তিশালী সাংগঠনিক নেতৃত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ওই কর্মকর্তা। হিযবুত তাহরীর থেকে আসা এবিটির বেশিরভাগ জঙ্গী অত্যন্ত মেধাবী। এ কারণে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্যমতে, সম্প্রতি লালমনিরহাট জেলার কারাগার থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশে বিভিন্ন অঞ্চলে লুকিয়ে রয়েছে নব্য জেএমবির জঙ্গী তৌহিদুল ইসলাম (২৫), হাসানুল বান্না (২৪), হযরত আলী (৪৫) ও তাজুল ইসলাম (৪৫)। এ তালিকায় আরও রয়েছে রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ১৪ নম্বর মামলার পলাতক আসামি হাবিবুর রহমান, গুলশান থানার ৩২ নম্বর মামলার পলাতক জঙ্গী ছগির হোসেন, কালিয়াকৈর থানার ১২ নম্বর মামলার জঙ্গী রফিকুল ইসলাম ওরফে রকিব ওরফে সুমন ওরফে ছমির ভূঁইয়া। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন মামলার পলাতক অন্য জঙ্গীরা হচ্ছেÑ কাজী মোঃ রেজওয়ান শরীফ, জসিমউদ্দিন আহমেদ, মোঃ হানফি, মুশফিকুর রহমান, মিনহাজ আবেদীন, মোঃ মনিরুজ্জামান, সায়েফ ও নাজমুল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার জঙ্গী আবদুন নূর সাঈদী ওরফে তিতুমীর, তরিকুল ইসলাম ওরফে এখতিয়ারও পালিয়েছে। একই জেলার নাচোল থানার কলারনা গ্রামের বাসিন্দা মোস্তফার ছেলে কারবান আলীও পালিয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে বোয়ালিয়া থানায় মামলা রয়েছে। পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানার সোনাহার গজপুরী গামের বাসিন্দা আবদুল্লাহর ছেলে নব্য জেএমবির সদস্য নজরুল ইসলাম ওরফে বাইক নজরুল ওরফে পারভেজ ওরফে হাসান জামিনে বের হয়ে আত্মগোপন করেছে। জামিন পেয়েছে একই জেলার হিযবুত তাহরীরের জঙ্গী আশরাফ আলী। কক্সবাজার জেলার নব্য জেএমবির জঙ্গী সদস্য নূর মোহাম্মদ চৌধুরী ওরফে রবিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একাধিক মামলার আসামি। সম্প্রতি সেও জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছে। একই জেলার সদর থানার মধ্যপেচা গ্রামের বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম রাউজান থানার মামলার আসামি হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ বা হুজি-বির দুর্র্ধর্ষ জঙ্গী মাওলানা নোমানও সম্প্রতি জামিন নিয়ে আত্মগোপন করে আছে। ফেনী জেলার হিযবুত তাহরীরের সদস্য তৌহিদা আক্তার ওরফে ঊর্মি, শাহ ইমরান, মোঃ ওমর ফারুক, মোঃ মাঈনউদ্দিন, ফেরদৌস ওয়াহিদ ওরফে প্রিন্স জামিন পেয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের লিগ্যাল ইন্টারসেপশনের (এলআইসি) এক কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের প্রায় এক হাজার জঙ্গীর হদিস মিলছে না। এর মধ্যে অনেকেই জামিন নিয়ে আর আদালতে হাজিরা দিচ্ছে না। কারাবন্দী যেকোন আসামি জামিন নিয়ে বের হলে নির্দিষ্ট সময় পর পর আদালতে হাজির হবে এটাই নিয়ম। এ ক্ষেত্রে জঙ্গীরা পালিয়ে গেলে বা আত্মগোপন করে থাকলে পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো অবশ্যই তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গীদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড এ্যালার্ট জারি করে আনা হবে। তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে এই চুক্তি না থাকার কারণে সে দেশ থেকে কোন জঙ্গীকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ভারতে জঙ্গীবিরোধী অভিযানে বাংলাদেশের বেশ কয়েক জঙ্গী সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। তাই পলাতক জঙ্গীরা তাদের সেফ হোমের জন্য পাকিস্তানকেই বেছে নিয়েছে।
সূত্র- জনকণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত