প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আলী রিয়াজ: এখন কেবল একটি জামিনের প্রত্যাশাই হচ্ছে সর্বোচ্চ প্রত্যাশা

আলী রিয়াজ: পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক আমলের রাজনীতির সঙ্গে যারা পরিচিত তাঁদের স্মরণে থাকবে যে, সেই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হতো – তাঁদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হতো। মিছিলে শ্লোগান উঠতো ‘*** ভাইয়ের হুলিয়া, নিতে হবে তুলিয়া’। রাজনীতিবিদরা পলাতক জীবনযাপন করতেন, কিন্ত তাঁরা রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকতেন। তখন ‘হুলিয়া’ জারিই ছিলো ভয়াবহ, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতো, মিছিলে-শ্লোগানে প্রতিধ্বনিত হতো দাবি। পুলিশের গুলিতে একটি মৃত্যুই দেশ কাঁপিয়ে দিতো। স্বাধীনতার পরেও সেই শ্লোগান উঠেছে ‘*** ভাইয়ের হুলিয়া, নিতে হবে তুলিয়া’। তখন আর হুলিয়া নয়, নেতা-কর্মীরা আটক হওয়ার ঘটনাই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠলো। তখন দাবি উঠতো ‘****-এর মুক্তি চাই, দিতে হবে’। স্বাধীনতার পরে অনেক মৃত্যুই হয়ে উঠলো স্বাভাবিক। অবস্থার বদল ঘটলো – ‘খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনি তোমার রক্ষা নাই’ হয়ে উঠলো শ্লোগানের ভাষা। সেই সময়ে দাবি ছিলো স্বাভাবিক মৃত্যুর, পুলিশের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ছিলো, প্রতিবাদ ছিলো।

তারপরে দেশে ‘গণতন্ত্র’ ফিরলো। অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়ে উঠেছে নিয়ম। পিতা-মাতার সামনে থেকে সন্তান, সন্তানের সামনে থেকে পিতা নিমিষে উধাও হয়ে যাচ্ছে, স্ত্রী হারাচ্ছে স্বামীকে। পিতামাতার, স্ত্রী’র প্রত্যাশা, প্রার্থনা - বেঁচে থাকুক মানুষটি, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাক। প্রায়শই সাংবাদিক সন্মেলনে তাঁরা দাবি করেন – অপরাধী হলে তাঁকে গ্রেফতার করুন। কেউ কেউ আর ফেরেন না। কেউ কেউ ফেরেন লাশ হয়ে, ‘এনকাউন্টার’, ‘বন্দুক যুদ্ধ’, ‘ক্রসফায়ার’। সন্তানের-পিতার-স্ত্রী’র হাহাকারই স্বাভাবিক। শুধু কি তাই?

এখন কেবল একটি জামিনের প্রত্যাশাই হচ্ছে সর্বোচ্চ প্রত্যাশা। সুবিচার নয়, অন্যায্য মামলা প্রত্যাহার নয়, গুম থেকে ফেরত আসাদের কথা শুনতে চাওয়া নয়, গুম হওয়া মানুষের ফেরতের দাবি নয়, বিনাবিচারে হত্যার বিচার নয় – এখন কেবল একটি জামিন প্রাপ্তির দাবিই যথেষ্ট। সেই কথা বলার জন্যেও না আছে মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা, না আছেন সাংবাদিকদের ইউনিয়ন।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার সূত্রে শফিকুল ইসলাম কাজলের সন্তান মনোরম পলক লিখেছেন, “মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্যের করা মামলায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আজ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের জামিন শুনানী ছিল। আবেদন নামনজুর। বাম হাত অবশ, রক্ত বমি করছে, চোখের সমস্যা ৫৩ দিন গুম থাকার সময়ে চোখ বাধা থাকার কারণে- এসব কোনও কিছুই জামিন পাওয়ার জন্য যথেষ্ট হল না”। প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে জানা গেলো “শফিকুল ইসলাম কাজলকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়েছিল আজ সোমবার সকালে। ঘণ্টা দুয়েক পর আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়”।

ভয়াবহ অপরাধে অভিযুক্ত এবং দন্ডপ্রাপ্তরা মাসের পর মাসের পর আরামে আয়েশে হাসপাতালে থাকেন। কিন্ত কাজলের চিকিৎসার জন্যে বরাদ্দ দুই ঘণ্টা। কাজলের ছেলে মনোরম পলক প্রথম আলোকে জানান, তাঁর বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হবে শুনেই তিনি তাঁর মা জুলিয়া ফেরদৌসী ও ষষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া বোন মনিহার ইসলামকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ কাছেই ভিড়তে দেয়নি। “মনোরম পলক বলেন, ‘বাবাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। দুপাশ থেকে দুজন তাঁকে ধরাধরি করে নামিয়ে আনেন। কোনো রকমে একটু দেখতে পেয়েছি, কথা বলতে পারিনি।”

নারীর অবমাননায় প্রতিবাদ নেই, সাংবাদিকদের ওপরে নির্যাতনে প্রতিবাদ নেই, নাগরিকের অধিকার লুন্ঠনে উচ্চস্বর নেই। মনে পড়ে হাসান হফিজুর রহমানের কবিতা -

"আজ ক্রোধ নেই, ক্ষোভ নেই
ঘরহারা লক্ষজন পথের ওপর উঠে আসে,
আজ তাতে বিকার নেই,
মাছির মতো মানুষ মরে যায়,
আজ তার দুর্গন্ধ নেই, আজ প্রতিরোধ নেই,
পিঠের ওপর পায়ের ছাপ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়,
শরীরে রিরি নেই, আজ অপমানে লাঞ্ছনা নেই।"

(‘আজ ভালোবাসা নেই’; আমার ভেতরের বাঘ/হাসান হাফিজুর রহমান)

ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত