প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]ভয়ঙ্কর প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ৫ লাখ টাকা খোয়ালেন পুলিশ সুপার !

সুজন কৈরী : [২] সরকার ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন একটি প্রতারক চক্র। মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও পুলিশ প্রধানসহ বিশিষ্টজনের নাম ভাঙিয়ে করেছেন প্রতারণা। প্রতারণায় পারদর্শী এ চক্রের কাছে ফাঁদে পড়ে মোটা অঙ্কের টাকা খুইয়েছেন খোদ পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাও। এমন অসংখ্য অভিযোগের পর অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশ। হত্যা ও অপহরণসহ একাধিক মামলায় কারাভোগের পর প্রতারক চক্রটির হোতা গোলাম মোস্তফা আদর ও তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালু বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

[৩] নিজেকে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রতারক গোলাম মোস্তফা আদর একজন পুলিশ সুপারকে ঢাকায় বদলির ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দেন। প্রমাণ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সঙ্গে থাকা তার বাবার ছবিও পাঠান। প্রতারক চক্রটির কবলে পড়া ওই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন। চক্রের কথার ফাঁদে পড়ে তিনি খুইয়েছেন ৫ লাখ টাকা।

[৪] জানা যায়, নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এসপিকে বদলির তদবীর করেন গোলাম মোস্তফা আদর। আস্থা অর্জনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতারক বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুর কিছু ছবি পাঠান।

[৫] রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন বলেন, আমার স্ত্রী ঢাকায় চাকরি করেন। আমার তিন মেয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। এ নিয়ে আমি সবসময় একটু চিন্তায় থাকি। এজন্য ঢাকার কোনো ইউনিটে বদলির জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে বদলি করতে অনুরোধও জানান। এক পর্যায়ে পরিচয় হয় আদরের সঙ্গে। সে আমাকে বদলি করে দিতে পারবে বলে জানায়।

[৬] বিভিন্ন মন ভেলানো কথায় ধীরে ধীরে আদরের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় এসপি বেলায়েতের। হঠাৎ একদিন অসুস্থতার কথা বলে, অসুস্থার কিছু ছবি পাঠিয়ে এসপির কাছে ১০ লাখ টাকা ধার চান। বদলির আশায় আর মানবিক কারণে ৫ লাখ টাকা দিয়েও দেন এসপি বেলায়েত।

[৭] তার অভিযোগ, টাকা ফেরত চাইলে তাকে নানা বাহানায় ঘুরায় আদর। কখনও বলে লকডাউন চলছে। আবার কখনও ভিন্ন কথা। এক পর্যায়ে হুমকি দেয়া শুরু করে- আপনার ফ্যামিলি ঢাকায় থাকে, আপনার বাচ্চারা ঢাকায় পড়াশোনা করে, আপনি কি বুঝেন না। আপনি নিরাপত্তা চান না? আপনি তো দূরে থাকেন। কি করবেন? আমি টাকা দিতে পারবো না।

[৮] টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো, টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে এসপি বেলায়েতের বিরুদ্ধে মামলা করেন গোলাম মোস্তফা আদর। কৌশলে অভিযোগের তীর ছুঁড়েন এসপির দিকে।

[৯] আদর বলেন, এসপি দাবি করছেন আমি এ বছর টাকা নিছি। এ বছর তো আমি অসুস্থই ছিলাম না। আর আদরের বাবা জানান, তারা ষড়যন্ত্রের শিকার।

[১০] তবে আদরের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডে শোনা যায়, এসপি বেলায়েতকে আশ্বস্ত করে আদর বলেন, বদলির ব্যাপারে মন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করানো হয়েছে। সবচেয়ে হাই লেভেলের তদবির হল আপনারটা। এর ওপর আর কোনো তদবির নাই।

[১১] এছাড়া ব্যাংক হিসাব দেখেও আদরের কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি। ১৬ মার্চ আদরই চেকের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা তোলেন এসপি বেলায়েতের অ্যাকাউন্ট থেকে। ওই টাকা ফেরত না দিয়ে এসপি পরিবারকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য আর নানা হুমকি দেন আদর।

[১২] অপরদিকে গত ৭ নভেম্বর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ময়নুল হক। ১৯ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন উত্তর সিটির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব। আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয়ে এই দুই কাউন্সিলরকে জামিনে বের করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে হাতিয়ে নেন কয়েক লাখ টাকা।

[১৩] সাবেক কাউন্সিলর ময়নুল হকের স্ত্রী জাহানারা বেগম রেখা বলেন, আমাকে প্রথমে বলেছে যে আট লাখ টাকা লাগবে সাতদিনের মধ্যে তাকে বের করে দিবে। পরে বলে ত্রিশ লাখ টাকা লাগবে, দরকার হলে তারা আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করবে। আপনি এখন পনের লাখ দেন বাকীটা আমরা দিয়ে দিবো।

[১৪] অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ছিল আদরদের পৈতৃক নিবাস। তাদের বাড়িটি ঋণের দায়ে নিলামে উঠে ৮ বছর আগে। নানা প্রতারণা করে একদিন রাতের আধারে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান।

[১৫] একের পর এক মিলছে বাবা-ছেলের প্রতারণার তথ্য। আদর ও তার বাবা খুনের মামলারও আসামি। ২০১৫ সালে উত্তরা থেকে অপহরণ করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে খুন করা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র আসিফ ইমরানকে। বিচার চাওয়ায় উল্টো ৩টি মামলা দিয়ে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হয় এই আসিফের পরিবারকে। সন্তানকে খুনের পরিবর্তে আসামিদের মৃত্যুদÐের দাবি করেন আসিফের মা। আদর ও তার বাবা সব সময় প্রতারণাসহ হত্যাকাÐের মতো অপরাধ করে বেড়ান বলে অভিযোগ আসিফের বাবার।

[১৬] তবে অভিযুক্ত গোলাম মোস্তফা ও তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালু সব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। আদর বলেন, আমার নামে যেসব অভিযোগ এসেছে এগুলা ভিত্তিহীন। কেউ কোন প্রমাণ দিতে পারবে না।

[১৭] ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের গুলশান জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, এই প্রতারক বাবা-ছেলের সঙ্গে আসলে কারোরই কোন সম্পর্ক নেই। এরা একটি নেটওয়ার্ক বজায় রেখে ভুক্তভোগীদের দুর্বল জায়গায় আঘাত করেন। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সূত্র : সময় টিভি ও ডিবিসি নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত