প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনিস আলমগীর: আমাদের নব্বই ভাগ পাঠক-দর্শক বায়াসড

আনিস আলমগীর: আমার সমস্যা মোহাম্মদ আলী আরাফাতের থেকে আরও বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুযোগ পান বলে তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে আমাকে একদিন এক পক্ষের বানিয়ে সুখ পান। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিখি তাদের ভাষায়- আমি শাহবাগী, ভাদা (ভারতীয় দালাল), চেতনাবাজ। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো লেখা গেলে- বাকশালী, সরকারি দালাল। বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করলেও একই রকম টাইটেল- সরকারের দালাল। ভারতের পক্ষে কোনো লেখা গেলে দিল্লির গোলাম, ‘র’- এর এজেন্ট। ইসলামী দল, বিশেষ করে জামায়াত-শিবির এবং মুসলিম জঙ্গিদের সমালোচনা করলে নাস্তিক (দুইবার হজ করলাম তারপরও)।

বাংলাদেশি হিসেবে আমি কোনো দেশেরই বিদ্বেষী না কিন্তু মোদির হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা করলে, মুসলমানকে নির্যাতনের কথা বললে হিন্দু জঙ্গিরা বলে আমি মৌলবাদী, পাকিস্তানের দালাল, ভারতবিদ্বেষী। আবার পাকিস্তানের সমালোচনা করলে পাকিপ্রেমীরা বলে ভারতের পা-চাটা গোলাম। হিন্দুর ঘরে জন্ম।

মুসলিমদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লিখলে, আইএসে নাম লিখিয়েছে, হেফাজতি, সুক্ষ্মভাবে নাকি মুসলিম মৌলবাদের পক্ষে মগজধোলাই করি। বিএনপির বা বিরোধী দলের ওপর সরকারি নির্যাতনের সমালোচনা করলে, আওয়ামীরা বলে- তিনি সুশীল। ‘ও তো আমাদের না।’ বিএনপি বলে, তোর দরদ দেখাতে হবে না। সরকারের দালালি নিয়ে থাক। লাইন পরিবর্তন করছে।

শুনলে আশ্চর্য হবেন, লেখালিখির জন্য সবচেয়ে বেশি হিংসাত্মক গালি খেয়েছি কথিত প্রগতিশীলদের থেকে, যাদের অনেকে চেনে বামাতি হিসেবে। নাস্তিক-ব্লগারদের ধান্ধা কার্যক্রমের সমালোচনা করায়, হাইকোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি অপসারণ এবং রামপাল বিদুৎকেন্দ্র সমর্থন করায় ওরা পেজ খুলে গালাগালি করেছে। ছাত্র ইউনিয়নের এক সাবেক সভাপতি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আবেদন করেছে আমার লেখা যাতে প্রকাশ না করে। কী দুর্ভাগা জাতির, এরা আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনীতি করে! অবশ্য মন খারাপের সঙ্গে সুখের খবরও কম নেই। যত সংখ্যক তারা বিরোধিতা করেছে তার চেয়ে শতগুণ বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে লেখা না থামাতে উৎসাহও দিয়েছেন।

আমাকে কোনো পক্ষে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে আবার নিজেরাই বিভ্রান্ত। সর্বশেষ মোদির বিরুদ্ধে কথা বলেছি বলে এক হিন্দু জঙ্গি আমাকে পাকিপ্রেমী বানাতে গিয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করে। উল্টো আমিও পাকিস্তানের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লিখলে সে লিখেছে, ‘তা কাকু এখন বুঝতে পারছি আপনি কোন ক্ষেতের মাল।’

সমস্যাটা এখানেই। আমাদের পাঠক-দর্শক-সমালোচক সবাই নিজে যখন একটি পক্ষের ‘মাল’ হয়ে থাকেন, তখন তারা অন্যকেও তাই ভাবেন। তারা এটা ভাবতেই পারেন না যে, কোনো কোনো লোক তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। অন্ধ নয়।

আমি বহুদিন বলেছি ‘বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালিয়ানার পক্ষে আমার পক্ষপাত আছে।’ এর মধ্যে বাঙালিয়ানা নিয়ে আবার ১৬ আনা পক্ষপাত আছে কি-না তাতে আমি সন্দিহান। একটু হয়তো ঘাটতি আছে। আর বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু বললে মুক্তিযুদ্ধ আসবেই। এক্ষত্রে কোনো আপস নেই। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা রাজনীতি করেন স্বাভাবিক কারণেই তারা আমার কাছের লোক। তাই বলে আমি কি আমার নিজের বায়াসনেস দ্বারা পরিচালিত হই? না, পারতপক্ষে হই না। পক্ষ না নিয়েও লেখা যায়। একজন সাংবাদিকের তাই করা উচিত। সত্যের সঙ্গে থাকা উচিত, সেটা কার পক্ষে-বিপক্ষে যাচ্ছে ভাবার দরকার নেই। কারণ আখেরে সত্যের জয় হয়।

আমাদের পাঠক-দর্শক কি বায়াস? হ্যাঁ। নব্বইভাগ ক্ষেত্রে তাই। তারা সাংবাদিক থেকে শতগুণ বায়াস। ‘কনফার্মেশন বায়াস’ নামে একটি বিষয় আছে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি দেখেন। তারা সেই রোগের শিকার। তাদের মনে একটা বিশ্বাস এবং থিওরি রয়েছে, মনে মনে একটা বিষয় তারা নিজেদের মতো চিন্তা করে রাখে। তার সঙ্গে যখন অন্যের লেখা, বিশ্বাস বা বক্তব্য মিলে যায় তখন তাতে অপার আনন্দ পান। সেটা দিয়েই বক্তব্য প্রদানকারীকে ভাবেন নিরপেক্ষ লোক। আর যখন মেলে না তখন ভাবেন অন্যপক্ষের দালাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত