শিরোনাম
◈ মধ্যস্থতার চেষ্টা ব্যর্থ, ইরান যুদ্ধ থামাতে রাজি নয় ট্রাম্প ◈ বাংলাদেশে এসে বিশ্বকাপে ব্যর্থতার দায়ে বড় অঙ্কের জরিমানামুক্ত হওয়ার সুখবর পেলো পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা ◈ আঙ্কারায় বাংলাদেশ–তুরস্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক, সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার ◈ হাদির হত্যাকারীদের পালাতে ‘সহায়তাকারী’ ফিলিপ সাংমাও পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার ◈ পূর্বাচল প্লটের ৬ লাখ টাকার কাঠা এখন ৭৫ লাখ: নতুন দাম নির্ধারণ করলো রাজউক ◈ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে ফেরার পথ খুঁজছে কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামীলীগ ◈ উন্নত চিকিৎসায় মির্জা আব্বাসকে কাল  সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে, মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট ভালো এসেছে ◈ ঈদের আগে-পরে ১২ দিন ২৪ ঘণ্টা তেলের পাম্প খোলা থাকবে ◈ ছুটিতে আসা প্রবাসীদের এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি ◈ মা‌ঠে অ‌শোভন আচর‌ণের জন‌্য শাস্তি পেলেন পা‌কিস্তা‌নের সালমান আলি আঘা

প্রকাশিত : ১৪ জুলাই, ২০২০, ১২:২০ দুপুর
আপডেট : ১৪ জুলাই, ২০২০, ১২:২০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

[১] সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিপন্ন মানুষ আতঙ্কে

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] অবিরাম ভারীবর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় বাঁধে ফাটল দেখা দেয়ায় চরম আতঙ্কে রয়েছে ওই সব এলাকার মানুষ। সিলেটে সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় নদনদীর পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকায় পানি বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। ফলে লাখ লাখ পানিবন্দী মানুষ চরম আতঙ্ক নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

[৩]অজানা আতঙ্কে সুনামগঞ্জের লাখো মানুষ

সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই-শাল্লাসহ সব ক’টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও হাওর প্লাবিত হয়েছে। হাওরের বিচ্ছিন্ন গ্রামের বানভাসিরা তাদের গরু ছাগল হাঁস মুরগিসহ গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। একদিকে পানি বৃদ্ধি অন্যদিকে হাওরের ঢেউয়ে তাদের মনে অজানা শঙ্কা বিরাজ করছে। উজানের পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও জেলা শহর ও উপজেলা সদরে রাস্তাঘাট, বাসাবাড়িতে পানি থাকায় পানিবন্দী রয়েছে লাখ লাখ মানুষ। জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, দিরাই ও শাল্লা এই সব উপজেলার নিম্নাঞ্চলে এখন পানি বাড়তে শুরু করায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় শহরের ষোলঘর পয়েন্টের সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল যা গতকালের চেয়ে ১১ সেন্টিমিটার কম হলেও জেলা শহরের অধিকাংশ রাস্তাঘাট ও বাসাবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের কাজির পয়েন্ট, উকিলপাড়া, নতুনপাড়া, বড়পাড়া সাহেববাড়ি ঘাট, ষোলঘর, হাজিপাড়া, জামতলাসহ অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে পানি থাকায় লোকজন ঘরের বাইরে বের হতে না পারায় খাদ্যসঙ্কটে রয়েছে লাখো পরিবার। সুনামগঞ্জ শহর ছাড়াও জেলার ১১ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ রোপা আমন ও পুকুরের মাছ নদীর পানিতে ভেসে গিয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্যসঙ্কটও চরম আকার ধারণ করেছে। জেলা শহরের সাথে জামালগঞ্জ-সাচনাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর-তাহিপুর, দিরাই-শাল্লার একমাত্র সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

[৪] ফেনীতে মহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে ১৫ গ্রাম প্লাবিত

ছাগলনাইয়া-পরশুরাম (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে ফেনীর মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পরশুরাম ও ফুলগাজীর ১৫টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ফাটল দেখা দেয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আরো বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রা। অপর দিকে ভারতের উজানে অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে মুহুরী নদীর দুই পাড় ভাসিয়ে গতকাল সোমবার ভোর থেকে ছাগলনাইয়া উপজেলার ফসলি মাঠসহ নিম্নাঞ্চলে হু হু করে ঢুকছে বানের পানি। এতে তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। করোনাভাইরাস সংক্রমণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢোকার কারণে তীরবর্তী মানুষদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে কয়েক গুণ। ফসলি জমি, রাস্থাঘাট, অসংখ্য পুকুরের মাছ ভাসিয়ে নেয়ার ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মুহুরী, কহুয়ার তীরবর্তী ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টায় মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কথা জানিয়ে, এ পর্যন্ত বাঁধ ভেঙে ১৫টি গ্রাম ঢলের পানিতে প্লাবিত হয়েছে বলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন জানিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই বর্ষা মওসুমে ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির তোড়ে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় মহুরী, কহুয়া নদীর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। সম্পদ ও ফসলহানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লাখ লাখ তীরবর্তী মানুষ। বিভিন্ন সময় বাঁধ মেরামতের কাজ হলেও বর্ষার শুরুতেই বাঁধে ভাঙনের ঘটনা যেন তিন উপজেলার তীরবর্তী মানুষের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা মহুরী নদীর বাঁধকে তাদের দুঃখ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের অভিযোগÑ দায়সারা বাঁধ মেরামতের কারণেই তিন উপজেলার লাখ লাখ মানুষ আর্থিক ও মানসিকভাবে প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। অনেকে ভবিষ্যতে মুহুরী নদীর বাঁধ মেরামতের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদারকিতে করানোর দাবি তুলেছেন।

[৫] কুড়িগ্রামে হু হু শব্দে পানি বাড়ছে

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্রথম দফার তুলনায় দুই দফায় ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চার শতাধিক চর ও নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় অনেকেই রাস্তা ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। এ দিকে পানি বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিতীয়বার বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছে চরাঞ্চল ও নদনদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ। প্রথম দফা বন্যার পানি নেমে যেতে না যেতেই আবারো বন্যার কবলে পড়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে তারা।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম সদর পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া, ৪৭ এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পয়েন্টে চিলমারী ৪৫ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

[৬] এ দিকে ধরলার পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ার চর ও সদর উপজেলার সারডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। একইভাবে তিস্তার ভাঙনে দলদলিয়া ইউনিয়নের সরদারপাড়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের কবলে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলায় ১৯টি পয়েন্টে ভাঙন তীব্ররূপ নিয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। জেলা প্রশাসক মো: রেজাউল করিম জানান, ৪ লাখ ২৮ হাজার ৫২৫টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল ও শুকনো খাবার ২ হাজার প্যাকেট বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নগদ ৮ লাখ টাকা জেলার সব ক’টি উপজেলার মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

[৭] ইসলামপুরে পরিস্থিতির অবনতি

ইসলামপুর (জামালপুর) সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের ইসলামপুরে আবারো বন্যা পরিস্থতির অবনতি ঘটেছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে পানিবন্দী মানুষ নতুন করে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। যমুুনা-ব্রহ্মপুত্র, দশআনীসহ উপজেলার সব নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল সোমবার দুপুরে যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিতে হয়। সম্প্রতি বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির পর বানভাসী মানুষ ঘরে ফিরতে না ফিরতেই আবার বন্যা জেলার অসহায় মানুষকে নতুন করে দুর্ভোগে ফেলেছে।

বন্যা পূর্বাভাসকেন্দ্র সূত্র জানায়, ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জামালপুরের সাত উপজেলায় দ্বিতীয়বারের মতো বন্যা দেখা দিয়েছে। সূত্র জানায়, গত বন্যার চেয়ে পানি এবার বিপদসীমার আরো ওপরে উঠতে পারে এবং বন্যা এক সপ্তাহের বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। এ দিকে বন্যাকবলিত মানুষ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে খাদ্য, চিকিৎসা ও খাবার পানি সঙ্কটে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

[৮] ধোবাউড়ায় অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে পাঁচ ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নেতাই নদীর ভাঙনে গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বসতবাড়িতে বন্যার পানি ওঠায় পানিবন্দী হয়ে অনেকেইে তাদের পরিবারের শিশু-বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে রয়েছেন বিপাকে। বানের পানিতে ভেসে গেছে শত শত মৎস্যচাষির রুপালি স্বপ্ন। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৪১ হেক্টর জমির ফিসারি ও পুকুর তলিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কর্মহীন হয়ে চরম দুর্ভোগে পানিবন্দী অসহায় সাধারণ মানুষ। অন্য দিকে করোনার কারণে সাধারণ শ্রমজীবী পেশার মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আবার ঘরের ভেতর ঢুকছে পানি। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও গোখাদ্যের সঙ্কট।

সরেজমিন দেখা যায়, রণসিংহপুর, রানীপুর, গৌরিপুর, বহরভিটা, বেতগাছিয়া, উদয়পুর, ঘুঙ্গিয়াজুড়ি, রাউতিসহ প্লাবিত অর্ধশতাধিক গ্রামে চৌকির ওপর মাচাং বানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পানিবন্দী অসহায় মানুষেরা। উপজেলা চেয়ারম্যান ডেভিড রানা চিসিম বলেন, ধোবাউড়া উপজেলার পানিবন্দী মানুষদের জন্য আমরা খাবারের ব্যবস্থা করেছি এবং বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাফিকুজ্জামান বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।

[৯] তিস্তায় রেড অ্যালার্ট প্রত্যাহার

নীলফামারী সংবাদদাতা জানান, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পাহাড়ি ঢলের পানি হু হু করে প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। এতে তিস্তা নদী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ বছর বর্ষা মৌসুমে তিস্তার এটাই সর্বোচ্চ বিপদসীমা বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে রোববার রাতে তিস্তায় লাল সঙ্কেত জারি করা হয়। তবে গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে পানি কমতে থাকায় রেড অ্যালার্ট প্রত্যাহার করে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। বেলা ৩টায় পর থেকে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি স্লুইস গেট খুলে রাখা হয়েছে।

নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সব ক’টি গেট খুলে দেয়ায় সেই পানি হু হু করে ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের তিস্তা নদীতে। এতে তিস্তা নদী ফুলে ফেঁপে অশান্ত হয়ে উঠছে। বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ। ২টি উপজেলার ব্যাপক আমনের বীজতলা ও রোপিত আমন চারা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে অসংখ্যক পুকুরের মাছ। এ দিকে প্রতিনিয়ত তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে দু’টি উপজেলার মানুষজন।

[১০] পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারীর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রাতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। তিনি জানান, রোববার রাতে মাইকিং করে তিস্তা নদীর উজান ও ভাটি এলাকার লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া হয়। ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে আমরা মনিটরিং টিম গঠন করেছি। বন্যাকবলিত মানুষজনের মাঝে শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে।

[১১] জগন্নাথপুরে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে উপজেলার প্রায় ১৩ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। জগন্নাথপুর পৌরসভাসহ আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন হাটবাজার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দী লোকজন তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তা ছাড়া নিম্নাঞ্চলের অধিকাংশ কাঁচা ও পাকা রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার হাজার হাজার মানুষ নৌকা দিয়ে চলাচল করছেন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যানুযায়ী কলকলিয়া ইউনিয়নে তিন হাজার ৫০০, চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নে ৮০০, রানীগঞ্জ ইউনিয়নে ৮০০, সৈয়দপুর শাহারপাড়া ইউনিয়নে এক হাজার ৬০০, আশারকান্দি ইউনিয়নের ৪৫০, পাইলগাঁও ইউনিয়নে ৩৫০ ও জগন্নাথপুর পৌরসভায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই বন্যায় গৃহহীন হয়ে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে ও আত্মীয়স্বজনদের বাড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যায় সরকারের ত্রাণসামগ্রী পর্যাপ্ত না হওয়ায় পানিবন্দী লোকজন ত্রাণের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। বন্যায় স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (অস্থায়ী আশ্রয়) কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো কর্মহীন থাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্যসঙ্কট। জরুরি ভিত্তিতে বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণসামগ্রীর বরাদ্দের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা।

[১২] রৌমারীতে পানিবন্দী মানুষের হাহাকার

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রৌমারী-রাজীবপুরে কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে ব্রহ্মপুত্র ও জিঞ্জিরাম নদের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপর দিকে ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবরী জেলার মানকারচর থানাধীন কালো নদী দিয়ে পাহাড়ি ঢল বাংলাদেশ অভ্যন্তরে রৌমারীর বড়াইবাড়ী সীমান্ত ঘেঁষা জিঞ্জিরাম নদীতে মিলিত হয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কৃষকের আউশ ধান, পাট, সবজি ক্ষেতসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বানের পানির তোড়ে গ্রামীণ সড়ক ও ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। হাঁস মুরগি গরু ছাগল নিয়ে বন্যাদুর্গতরা পড়েছে বিপাকে। শতাধিক গ্রামের মানুষ হাটবাজার করতে পারছে না। বাঁধের পশ্চিম পাশের চরাঞ্চলীয় নদী পারের মানুষ আশ্রয় নিয়েছে অরক্ষিত উঁচু জায়গা ও রাস্তার স্লাভে নানা উপায়ে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সমস্যায় পড়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন জানান, আগের বন্যার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় রোপা আমন বীজতলা করা হয়েছিল। কিন্তু আবারো নতুন করে বন্যার পানি বৃদ্ধি হওয়ায় কৃষকদের অনেক ক্ষতি হবে।

[১৩] তিস্তায় বাড়ছে পানি ভাঙছে বসতবাড়ি

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, অবিরাম বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তার পানি দ্বিতীয় দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি ও টানা ভাঙনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর পুঁটিমারী, ভাটি কাপাসিয়া বাদামের চর, মাদারিপাড়া, লালচামার, হরিপুর ইউনিয়নের মাদারিপাড়া, পাড়া সাধুয়া, বাংলা বাজার, কানিচরিতা বাড়ি গ্রামে হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও হাজারও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে কয়েক হাজার একর ফসলি জমি ও বসতবাড়ি। ভাঙনকবলিত পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। একদিকে করোনাভাইরাস অন্যদিকে তিস্তার পানিবৃদ্ধি এবং ভাঙন অব্যাহত থাকায় নাকাল তিস্তা পারের মানুষজন।

উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চণ্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের উপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর বিভিন্ন চরে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী লুৎফুল হাসান জানান, অবিরাম বর্ষণের কারণে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। নতুন করে ১০ মেট্রিকটনসহ মোট ৬০ টন চাল ও এক লাখ ৭৫ হাজার টাকার চাল বিতরণ করা হয়েছে।

[১৪] জামালপুরে যমুনা বিপদসীমার ৭১ সেন্টিমিটার উপরে

জামালপুর সংবাদদাতা জানান, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদীর পানি জামালপুরে পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৭১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা বন্যায় বিশেষ করে যমুনা নদীর তীরবর্তী এলাকায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে এবং বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আবারো পানিবন্দী হয়ে পড়েছে জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ২৫টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক বন্যার্ত মানুষ। এদিকে জেলার মাদারগঞ্জ পৌরসভার চর চাঁদপুর গ্রামে পাট কাটতে গিয়ে বন্যার পানিতে ডুবে মুরাদুজ্জামান (৬৫) নামে একজন কৃষি শ্রমিক মারা গেছেন। গত রোববার দুপুরে বন্যার পানিতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার পর বিকেলে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।নয়া দিগন্ত , প্রিয়ডটকম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়