প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আহমেদ মূসা: বাংলাদেশকে কসাইখানার দিকে নিয়ে যায় কারা, কেন?

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় কারো কারো কাছে প্রতীয়মান হতে পারে, যেন বা দুনিয়ার চোখে বাংলাদেশ আজ এক প্রতারকের দেশ, জালিয়াতের দেশ, চালিয়াতের দেশ। বাংলাদেশের মূলধারা আজ পথচ্যুত, অপধারা দিক-নির্দেশক। এই বাংলাদেশ মুক্তিুদ্ধের বাংলাদেশ নয়, সে যুদ্ধের মহান চেতনার বাংলাদেশ নয়। এই বাংলদেশে এখন শাহেদ, পাপিয়া, পাপুল, সম্রাট, জিকে শামীম, খালেদ, সাবরিনা, আরিফ, ইমদু, এরশাদ, ম্যানছেরু মিয়া প্রভৃতির বাংলাদেশ। ওদের মদদদাতাদের বাংলাদেশ।

এই বাংলাদেশ যাদের কাছে দোহনের যন্ত্রমাত্র, তাদের বাংলাদেশ। গত ৪৯ বছর ধরে বাংলাদেশকে যে আগুন গেলানো হয়েছে, এরা হচ্ছে তার ‘আংরা।’ আগুন কমবেশি সবাই গিলিয়েছে। এরা অন্যায়-অপরাধ-পাপ করে দেশ ছেড়ে পালায় চার্টার্ড বিমানে। ১১ ঠিকাদারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সতের কোটি মানুষের স্বাস্থ্য গিলে খেয়েছে এরা। জাতির চরম দুর্দিনেও করোনাযোদ্ধাদের নকল পণ্য সরবরাহ করে ঠেলে দিয়েছে গণহত্যার দিকে। সরকার দিনের পর দিন বৃথা কালক্ষেপণের মাধ্যমে করোনাকে হৃষ্ট-পুষ্ট ও সর্বত্রগামী করে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাঠায় রণাঙ্গনে। এ যেন হাত-পা বেধে সাঁতার কাটতে নির্দেশ দেওয়া। তাই এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক ডাক্তার স্বাস্থকর্মীসহ অন্যরা অনাকাঙ্ক্ষিত হারে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত হচ্ছে করুণ ব্যর্থতার জন্য।

এই বাংলাদেশের আরো ক্লাসিক্যাল উদাহরণ হলো প্রয়াত হোসেন মুহম্মদ এরশাদ। তার বিরুদ্ধে একদিন গোটা বাংলাদেশ লড়াই করেছে। কিন্তু, শুধুমাত্র ক্ষমতার জন্য, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমাদের নেতৃত্বের উভয়অংশ মিলেমিশে কেউ এরশাদের ময়লা শার্ট, কেউ বা ময়লাগেঞ্জি ধুয়ে সাফসুতরো করে দিয়েছেন। আজকের প্রচলিত রাজনীতির দিক-নির্দেশক ‘মহানগুরু এরশাদ।’ এরা মুখে যাই বলুন না কেন, এটাই তাদের অন্তর্স্রোত। এই বাস্তবতাই বাংলাদেশের বর্তমান লানতের বড় কারণ। যেন বা বাংলাদেশের সামনে আর কোনো প্রশ্ন নেই, স্বপ্ন নেই। তাই আমি একটি দেয়ালের কথা বলেছি গত ৯ জুলাই।

দেয়ালের স্বরূপ সম্পর্কে
কয়েকজন আমাকে প্রশ্ন করেছেন, সামনের দেয়ালের স্বরূপ সম্পর্কে। আসলে ব্যাপরটি কাকতালীয়। দুই বছর আগে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়ে কিছু সম্ভাবনা ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে, যদিও সম্ভাবনা সত্য হলে খুশী হতাম। আমার দ্বিতীয় স্ট্যাটাসটি দেওয়ার একদিন পর প্রথমটি হাজির হয় মেমোরি আকারে। একটু চমকেও উঠি। কারণ, ব্যাপারটা এমন নয়, যে দুইবছর আগের মেমোরিটি আসার একদিন আগে দিন গুণে আমি আগের দিন দ্বিতীয়টি প্রচার করেছি। মোমোরির স্ট্যাটাসটির কথা আমার স্মরণেই ছিল না। ব্যাপরটি কাকতালীয়। যাহোক, কিছু জটিলতার কারণে এর আগেই প্রথমটি আমি ‘ওনলি ফর মি’ করে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু মেমোরি হাজির হওয়ার পর মেমোরির পাশাপাশি এটিকেও প্রচারের গরজ অনুভব করি। স্থগিত করে রাখা স্ট্যাটাস নতুন ডিজাইনে আবার প্রকাশ করি। যেহেতু আবার ময়দানে আসতে হয়েছে, সে কারণে দেয়াল সম্পর্কে আমার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন মনে করছি।
কারো কারো ধারণা, সামনের দেয়াল বলতে আমি বর্তমান সরকারকে বুঝিয়েছি। মোটেও তা নয়। আমার কথিত দেয়ালের পরিধি এতা বড়, যে তাতে বর্তমান সরকার সেই দেয়ালের কিছু ইট-সুরকি মাত্র।

দেয়ালের পরিধি
এই দেয়াল অমিত সম্ভাবনার বাংলাদেশকে রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠার প্রধান প্রতিবন্ধক। এই দেয়ালে হেলান দিয়ে, বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বপ্ন ও প্রগতির শত্রুরা। এই দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে আছে আমাদেও স্বপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ। এই দেয়ালের ওপাশে বয়ে চলেছে, ‘বীরের রক্তস্রোত, মায়ের অশ্রুধারা ।’
এই দেয়ালের এককোণে রাজনীতির পশরা সাজিয়ে বসে আছে ধর্মব্যবসায়ীরা। জাতির চোখে ধার্মিকেরা সম্মানিত। এই সম্মান ব্যাহত করছে ধর্মব্যাবসায়ী ও ধর্মান্ধরা। কারণ, ধর্ম-ব্যবসায়ীরা অলস ও ফেরেববাজ, যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। আর, ধর্মান্ধরা হচ্ছে মানসিক প্রতিবন্ধী।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন আমাদের এ-যাবতকালের সেরা অর্জন। কিন্তু কেউ কেউ স্রেফ ব্যবসা করছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। ধর্মব্যবসায়ীদের উল্টোকোণে রাজনীতির পশরা সাজিয়ে বসেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ বেপারীরা।’ এই দুইপক্ষ-ঘরানা আবার পরস্পরের মধ্যে এই দুইপণ্য চালাচালি করে। ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ ওদের ক্ষমতার নাদুস-নুদুস চেহারা বজায় রাখার স্বাস্থ্যকর টনিকমাত্র- খাবার পরে দুইচামচ, শোবার আগে দুইচামচ। অথবা প্রয়োজন মতো। হায়রে বাংলাদেশ!

এই দেয়ালের উপরের এককোণায় ‘র’ ও অন্যকোনায় ঝুলছে ‘আইএসআই’-এর ব্যানার- হীনমণ্যতার স্মারক হয়ে। এই দেয়াল আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশপন্থী হতে দিল না। দেউলিয়া রাজনীতিকরাই বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণের ওপর ভারতপন্থী-পাকিস্তানপন্থী ইত্যাদির বাহুল্য ছাপমেরে ক্ষমতায় যেতে বা ক্ষমতায় গিয়ে সেটাকে চিরস্থায়ী করার কাজে লাগাতে অপচেষ্টা চালায়। মানুষের সম্ভাবনা, সৃজনশীলতা ও বিবেচনা-শক্তি উপলব্ধিতে অক্ষম একশ্রেণীর হোয়াইট-কালার ভদ্রলোকও ফেরুপালের মতো দেউলিয়াদের সঙ্গে গলামেলায়। এটা তারা উচ্ছিষ্টের লোভে করে। একটি সরকারের হাতে প্রচুর উচ্ছিষ্ট থাকে।

অবস্থা দেখে, প্রতীকিভাবে একথা বলা চলে যে, আওয়ামী লীগ ভোটে জিতলে যেন বা ক্ষমতায় আসে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, আর বিএনপি ভোটে জিতলে যেন বা ক্ষমতায় আসে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা `আইএসআই।` তারা লোম বাছতে গিয়ে ইতোমধ্যেই কম্বল উজার করে ফেলেছেন। জনগণ রাজনীতিকদের তরফ থেকে এমন ধারণাই পাচ্ছে।

এই বুদ্ধিজীবীরা জীবনজগৎকে দেখেন কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে। গতিক সুবিধার দেখলে ঘাড়টা ভালো করে বের করেন; দুর্যোগ দেখলে গলাটি সেঁটিয়ে ফেলেন শক্ত খোলসের ভেতর। জনগণের স্পন্দনে-সংগ্রামে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুবই অল্প। নিজের অবস্থানটি পোক্ত রেখে যা করার তা করেন। চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এসেছেন এমন নজির বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে বিরল। অথচ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের প্রাক-পরিবেশটি বুদ্ধিজীবীদেরই তৈরি করার কথা।
উপমহাদেশে বাংলাদেশ সবচেয়ে প্রগতিশীল রাষ্ট্র, যার সৃষ্টি হয়েছে রক্তস্নাত স্বাধীনতা-যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। অন্য দু’টি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে আলোচনার টেবিলে, যে দুই দেশে এখন চলছে মৌলবাদী ও মিলিটারি-কবলিত শাসন। স্বাধীন-স্বাভাবিক বিকাশের রাজনীতি ও নেতৃত্ব পেলে বাংলাদেশের যে সরব-উত্থান ঘটবে তাতে বাকী দুই দেশকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। কিন্তু এই দেওয়াল তার আরেক প্রতিবন্ধক। এরা বাংলাদেশকে বানাতে চায় অন্যদেশের গাদাবোট।

এই দেওয়াল-বরকন্দাজরা গণতন্ত্রের নাম নিয়ে ক্ষমতায় এসে প্রথম চেষ্টা করেন গণতন্ত্রকে হত্যার জন্য মানুষের ভোটাধিকারকে হরণ করে মন্ত্রীসভার আজীবন সদস্য হতে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য ছিল যে, কোনো সুজাতা মেহেতা উড়ে এসে সেই জালিয়াতিকে ‘এন্ড্রাস’ করে যায়নি; যে আশির্বাদ এই বেলার বরকন্দাজরা পেয়েছে। হাঁটিহাঁটি পা পা করেও, যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আগাচ্ছিল তা ১৯৯৬, ২০০৭, ২০১৪ ও ২০১৯-এ খোঁড়া করে ফেলল ওরা। আর, শেষ দুইটি চালিয়াতি-জালিয়াতির নির্বাচন প্রমাণ করে দিল এদেশে ভোটারের আর কোনো দরকার নেই। এই পাপ-অপরাধে যুক্ত করা হলো দেশের সব প্রথা-প্রতিষ্ঠান, আমলা-মহাজনদের। নির্বাচনের রাত্রি-সংস্করণজাত পাপাচারে জনগণের কাঁধে চড়ে জুলুম-লুন্ঠন-চালাকিতে সব ধরনের বাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে সেসবের ফাইফরমাশ খাটানোর যন্ত্রেমাত্র পরিণত করা হয়। সেই কালোথাবার স্বৈর-থলি থেকে এখন বের হতে শুরু হয়েছে আংরাজাত বিষ্ঠার দুর্গন্ধ।

বাংলাদেশ ব্যক্তির শাসন দেখেছে, সামরিক শাসন দেখেছে, পরিবারের শাসন দেখেছে; দেখে চলেছে জনগণকে প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল-উত্তর স্বৈরতান্ত্রিক শাসন-দুঃশাসন। শুধু আইনের শাসনটাই এখনো দেখার বাকি, যেটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রাথমিক অঙ্গীকার। এই দেয়াল সেই পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে।
একারণে আজকে প্রবল দুর্বৃত্তায়-পাপের মুখেও চলতি-পর্বের শাসকেরা কাউকে আইনানুগ আদেশ দেওয়ার বৈধতাতো বটেই, চক্ষুলজ্জাও হারিয়েছে। শাসকেরা নির্লজ্ঝভাবে আত্মসমর্পণ করেছে তাদেরই ফ্রাংকেনস্টাইনের হাতে। আংরারা আজ আগুন। প্রকৃতপক্ষে শাসকেরা শুভ, সুন্দর ও বিধানসম্মত কিছু করার নৈকিত অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে। অধিকারের নৈতিক ভিত্তি না থাকলে রাজনৈতিক ভিত্তিও থাকে না। কারণ, কিছু মানুষ চালবাজ-প্রতারক হলেও গোটা জাতি তা নয়। একটি জাতি দাঁড়িয়ে থাকে তার নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর। আমাদের পূর্বসুরী নেতারা আন্দোলনের মাধ্যমে সেই প্রমাণ রেখে গেছেন।

কিন্তু ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি। নৈতিকতার গোড়ায় সার-পানি না দিয়ে শুধু না-হোক ফসল তুলে গেল ওরা। সে কারণে বাংলাদেশের প্রধান-প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের সব সময়ই একটা চালাকির মধ্যে থাকতে হয়। এটাই তারা ভালো রপ্ত করেছেন। নিজের বা দলের ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষায় চালাকির সুযোগ পেলে সেটা তারা ছাড়েন না। এই চালাকি তারা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই করেন না, এটা তারা জনগণের বিরুদ্ধেও করে চলেছেন। কলুষিত রাজনীতিতে চতুরদের কাছে নির্বোধদের বাজার-দর বেশি। অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃতের কবলে-পড়া রাজনীতি দিতে পারে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রচার, মানবজীবনের এই তিন মহার্ঘ-মোক্ষ। অন্য কোনো কর্মকান্ডে এসাথে এগুলি পাওয়া যায় না।

এ-কারণেই সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনীতিতে চাটুকার ও ফেরেববাজদের ভিড় বেশি। এই দেয়াল আড়াল করে রেখেছে দর্বৃত্ত ও দুর্বৃত্তায়নকে। এই দেয়ালেরই ছায়াতলে দেশের সম্পদ একশ্রেণীর মানুষ লুন্ঠন করে আসছে বর্গীর মতো, দুর্নীতির সকল সীমা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। নৈরাজ্য, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা-পরায়ণতা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি চরমে। মহৎ পেশাগুলিও কলুষিত । সর্বোপরি রাজনীতি এখন মেধা-মনীষা ও অঙ্গীকার-শূন্যপ্রায়। সৎ ও নিবেদিতরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, মন্দ লোকেরা দখল করছে বড় স্থান, যেভাবে নিকৃষ্ট মুদ্রা উৎকৃষ্ট মুদ্রাকে বিতারণ করে। ভুল লোক বসে পড়েছে অনেক শুদ্ধ জায়গায়। এই দখল অপ-দখল অব্যাহত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন অসৎ, ধূর্ত, সুবিধাবাদী, ডিগবাজ, পেশীবাজ, স্তাবক ও সন্ত্রাসীদের প্রাধান্য।
একই কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অসৎ অংশ হয়ে পড়েছে পার্টটাইম দস্যু, আর আমলা-বণিকদের অসৎ অংশ হয়েছে ফুলটাইম তস্কর।

সাংবাদিকদের অসৎ অংশ ব্ল্যাক-মেইলিং ও হলুদ সাংবাদিকতা করছে । শিক্ষকদের অসৎ অংশ প্রশ্নপত্র ফাঁস করছে। অসৎদের এসবই করার কথা। কিন্ত তারাই বাংলাদেশ নয়। তাদের মোকাবেলায় বাংলাদেশের সরকারগুলি সোচ্চার-আন্তরিক হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে। এরা তাদেরই সৃষ্টি।

আরো দুর্ভাগ্য ও পরিহাসের বিষয় হলো, এইসব অপকর্ম করে খুচরা চালাক রাজনীতিকেরা সেগুলিকে চালিয়ে দিতে চায় সংবিধানের নামে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে ২০১৯ সালের নির্বাচনের কোনো পার্থক্য আছে কী? দু’বার দু’দলই সংবিধান ঠিকা নিয়েছিল। ঠিকা একজন টিকাতে পেরেছে আরেকজন পারে নি। কিন্তু জনগণ কারো কাছেই সংবিধান ঠিকা দেয়নি। কারণ, সংবিধান জনগণের জন্য, জনগণ সংবিধানের জন্য নয়। এরশাদ প্রকৃত ক্ষমতা হারাবার প্রায় এক সপ্তাহ পর সাহাবুদ্দীন সাহেবের হাতে যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, তখন এরশাদ তা-ই হস্তান্তর করেন যা তার হাতে তখন ছিল না, ছিল জনগণের হাতে। এ ক’দিন সংবিধান বরং জনগণের পেছনে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করেছিল ‘আমাকে এডজাস্ট করো, আমাকে এডজাস্ট করো।’

বাংলাদেশের লোকজন গণতন্ত্রের নামে কোনো চালাকি মোটেই পছন্দ করে না। পাকিস্তানীদের এহেন চালাকি আমাদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে স্বাধীনতার যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি যদি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিত, নিদেনপক্ষে শিক্ষা নিত ১৯৮৬ ও ৮৮‘র নিরর্থক ও প্রহসনের নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা-হাস্যকর নির্বাচন এবং ২০০৭ সালের হাস্যকর-একতরফা-নির্বাচনী প্রচেষ্টার করুণ পরিণতি থেকে, তাহলেও এই সংকট তৈরি হতো না। তারা ভুলে গেছেনে যে, এ ধরনের নির্বাচন সব সময়ই নির্বাচনকে পরিণত করে প্রহসনে, প্রার্থীদের পরিণত করে ফেলে ডাস্টবিনে এবং ভোটকে পরিণত করে আবর্জনায়।
রাজনীতি ও নেতৃত্বের স্বাধীন-স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হলে প্রচলিত বা কথিত শুভ প্রতিষ্ঠানগুলিকেও গ্রাস করে বিকৃতি। আজ তা-ই ঘটে চলেছে বাংলাদেশের ভাগ্যে। প্রতিক্রিয়া-পাপাচারে-পূর্ণ এই দেয়ালে হেলান দিয়ে ওরা আবার জাহির করেন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ‘রক্ষক‘ বা উন্নয়নের পরাকাষ্ঠা বলে। কথিত উন্নয়ন ঘুষের টাকায় মসজিদ-মন্দির বানিয়ে তার কমিটি দখলের মতো নয় কি!

এই দেয়ালে জনতার কেউ তাদের দাবির কথা লিখতে গেলে, দেয়াল পর্যন্ত যাওয়ার আগেই সে গুম হয়ে যায় কিংবা তাকে ঠেলে দেওয়া হয় ফাটকে। নিজেদের গুটিয়ে, এই দেয়ালেরই অন্য-পাশের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে সমাজের ভালোমানুষ বলে কথিতরা; আতঙ্কে-আক্ষেপে।

রাজনীতিতে আগে নেতৃত্ব আসতো বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, গণসংগঠন, অঙ্গসংগঠন ত্যাগী ও পোড়খাওয়া ব্যাকগ্রাউন্ডের সৎ-অঙ্গীকারবদ্ধদের মধ্যে থেকে। এখন আসে সামরিক-বেসামরিক আমলাপল্লী, ব্যবসায়ী, বিশেষ-বিশেষ পরিবার, পেশীবাজ, তেলবাজ, লুটেরা প্রভৃতির কাতার থেকে। এই দেয়াল তাদের বড় রক্ষক।
বহু রাজনীতিক আছে যারা ক্ষমতায় যাওয়া বা উপরে ওঠার জন্য সিড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন মানুষের লাশ। সেই সিড়িকে আলপনা করেন রক্ত দিয়ে। শিশুরা যেমন ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখার জন্য অপেক্ষা করে, তেমনি এ-সব রাজনীতিকও লাশের জন্য অপেক্ষা করেন। এটাই এই দেয়ালের শিক্ষা।

\নেতৃত্বের স্বাধীন-স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হলে প্রচলিত বা কথিত শুভ প্রতিষ্ঠানগুলিকেও গ্রাস করে বিকৃতি। তাই বলেছি, বাংলাদেশকে রাজপথ থেকে কানাগলিতে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে, যার দুইপাশে কসাইখানা । আগে বাড়তে হলে সামনের দেয়াল ভাঙতে হবে। এই দেয়াল বাংলাদেশের মূলসুর নয়। বাংলাদেশের আত্মাকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার বিরামহীন সংগ্রামে হাজির থাকাটাই জরুরী। জরুরী নিজের অবস্থানে থেকে সাধ্যমতো কিছু করা। সেই জন্য এই দেয়ালে ধাক্কা প্রয়োজন সর্বশক্তি দিয়ে। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল বাইশ পরিবারের বদলে প্রতিটি পরিবারের জন্য, কিন্তু এটি এখন হাল-আমলের পৌত্তলিকতায় আচ্ছন্ন কয়েকটি নব্য-জমিদার পরিবারের দখলে।

আবার ক্ষমতা অর্জন ও রক্ষার সংগ্রামে নিয়োজিতরা তাদের প্রস্থান আসন্ন দেখে রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকারও গড়ার চেষ্টা করেন। তাদের এবং আমাদের সবারই পূর্ণ উপলব্ধিতে আসতে হবে যে, ইতিহসের সঙ্গে এরমধ্যেই অনেক বেশি রসিকতা করা হয়ে গেছে, আর নয়। অপরাজনীতির ভারে দেশের মানুষের মেরুদন্ড এমনিতেই ন্যূব্জ, তাদের ঘাড়ে আরো ভার চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। অথচ, উদাহরণ আছে যে, চাপিয়ে দিলে জনগণ গ্রহণ করে না। সঞ্জয় গান্ধীকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী ব্যর্থ হয়েছেন। আবার তার মৃত্যুর পর মানুষ খুঁজে এনে ক্ষমতায় বসায় সেই সজীব গান্ধীকে, যিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, যে তিনি রাজনীতিকে ঘৃণা করেন। পাইলট সজীব গান্ধীও হত্যাকান্ডের শিকার হলেন অপছন্দের রাজনীতি করতে এসে। ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে, অথবা হতে পারে দুর্জ্ঞেয় রহস্যময়ও।

দুর্ভাগ্য বাংলাদেশ ও তার প্রয়াত নায়কদের। তাদের রেখে যাওয়া দলগুলি ক্রমশ দেউলিয়া হয়ে পড়ায় ক্ষমতার প্রাণ-ভোমরা হিসেবে প্রয়াত দুই নেতাকে এচ্ছত্রভাবে হাজির করতে গিয়ে দু’ জনকেই গালিগালাজের লক্ষ্যবস্তুওে পরিণত করে চলেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বিকৃতি হচ্ছে ক্ষমতাসীন সরকার ও দলগুলি বিরোধী দলগুলিকে কখনো আস্থায় না নিয়ে উচ্ছেদের বার্থ চেষ্টা চালানো। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। বর্তমান সরকার যদি ভোট ও প্রকৃত বিরোধী দলের পেছনে এভাবে লেগেই থাকে, তাহলে বাংলাদেশে মৌলবাদীদের উত্থানের আশংকা প্রবল। হতে পারে সেটা অল্পকালের জন্য, কিন্তু তার কোলেটারেল ড্যামেজ হবে সীমাহীন। আমাদের বীরদের আমরা খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছি। এমনকি স্বপরিবারেও। হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, শহীদ জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশাররফ, জেনারেল মঞ্জুর, ক্যাপ্টেন হায়দার, সিরাজ শিকদার, ন্যাভাল শিরাজ, সিদ্দিক মাস্টার, মোশাররফ হোসেন, কামেল বখত্ ও মোফাখ্খারসহ অসংখ্য বীর-বিপ্লবী। কর্ণেল তাহের হয়েছেন জুডিশিয়াল কিলিং-এর শিকার। দেশপ্রেমিকদের আমরা আখ্যা দিয়েছি তাঁবেদার; বিপ্লবীদের অপবাদ দিয়েছি সন্ত্রাসীর।

বাংলাদেশের ইতিহাসে যাদের স্থান নায়ক-মহানায়কের, আমরা তাদের অনেকের লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি অত্যন্ত অসম্মানজনক অবস্থায়। কারো কারো লাশ আমরা দেখেতে পেয়েছি সিঁড়িতে, খোলা মাঠে, সার্কিট হাউজের রক্তে ভাসমান কক্ষে, সিএমএইচে, সেনানিবাসের রাস্তায় কিংবা পিলখানার দরবার হলে। তাঁদের জীবদ্দশার শেষ মুহূর্তে তারা প্রাপ্য সম্মান পাননি। হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার পরও না। অথচ তাদের মৃত্যুতে বেজে ওঠার কথা বিউগলের করুণধ্বনি, অন্তিম সুর; অভিবাদন পাওয়ার কথা তাদের ফুলসজ্জিত কফিন। তা হয়নি। একি আমাদের অজ্ঞতা, অকৃতজ্ঞতা নাকি নিয়তি। সব রক্তই কথা বলে একদিন এবং কথা বলে চলেছে। ভবিষ্যতেও বলবে।

আমাদের কালের রাজনীতির পচন সম্ভাবিত করেছে অন্যক্ষেত্রগুলির পচনকে। দলান্ধ হলে দুই লাইন লিখে, দুই পঙক্তি গেয়ে, দুই কদম নেচে, দুই পোচ এঁকে বা দুই হাঁক দিয়েই অতি বিখ্যাত ও বিত্তবান হওয়া যায়। যারা কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেননি বা জীবনে উদ্ধৃতিযোগ্য দু’টি লাইনও লেখেননি, তারাও বিভিন্ন পদক ভাগাভাগির কারণে ‘বিরাট প্রতিভা।’ এবং সেটা বরকন্দাজীর জন্য। দলের চশমায় তারা সবকিছু দেখেন। সে কারণে আমাদের সৃজনকাল অনেকটাই বন্ধ্যা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের দলান্ধ ও ধারান্ধ সৃজনশীলরা অঙ্গীকার ও প্রতিভার সংজ্ঞায় ঊন-মানুষে পরিণত হয়ে এই দেয়ালেরই পক্ষেই নির্মাণ করছেন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ললিতকলার বিভিন্ন চিত্র। সরস্বতীর বরপুত্র আমাদের সৃজনকালের প্রতিভাবানরা তাদের নিজেদেরকে কেউ ভাবেন বাঙালি, কেউ ভাবেন বাংলাদেশি। কেউ ভাবেন তারা অমুকের সৈনিক, কেউ ভাবেন তমুকের সৈনিক, কিন্তু নিজেকে পূর্ণ মানুষ ভাবেন না। তারা কিছু দেখেন কিছু দেখেন না, কিছু লেখেন কিছু লেখেন না, কিছু বলেন কিছু বলেন না। মনে-মনে অবশ্য ভাবেন সবই। কিন্তু প্রকাশে তারা অর্ধ-মানব, কেউ বা সিকি মানব। চিন্তার এই বামুনত্বের জন্যও আমাদের কেনো কিছুই বিশ্ব-মাপের হয়ে ওঠে না, এমন কি হয়ে ওঠে না মানসম্মত বা রুচিসম্মতও। এবং অভিন্ন কারণেই দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের প্রপঞ্চগুলি নির্মোহভাবে তুলে ধরার কাউকে আমরা দেখি না।

আমাদের লিখিয়ে-আঁকিয়ে-গাইয়ে-নাচিয়ে-চিত্রতুলিয়ে মায় সাংবাদিকতার জগৎ এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে দলমন্য, ধারামন্য ও উচ্ছিষ্টের অনুগামিতায়। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জগতে দেখছি বাল্মীকীকে নারদ মুণির আশ্বস্ত করার আপ্তবাক্য, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি/ ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’ (রবীন্দ্রনাথ : ভাষা ও ছন্দ)। অথচ উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলিতে একসময় বলিদান ও আত্মত্যাগের সুমহান নজিরও রয়েছে। অভিন্ন কারণে সংবাদমাধ্যমগুলির স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে, বাড়ছে হলুদ সাংবাদিকতা ও আগাছা। হ্রাস পেয়েছে জনগণের কাছে সংবাদমাধ্যমগুলির জবাবদিহিতার অনিবার্য তাগিদ। এখন দলমত নির্বিশেষের সাংবাদিকদের স্বার্থ ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে সংগ্রাম করারও কেউ নেই। এমনকি সাংবাদিক-হত্যার বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর পর। সংবাদ মাধ্যমের সম্মান ও আস্থা তলিয়ে গেছে এই দেয়ালের গা-ঝরা পানিতে।

আওয়ামী লীগ দল ও সরকার কোনো কিছু না করেই মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির নজিরবিহীন সমর্থন লাভের একটা যুগান্তকারী নজির উপভোগ করে চলেছে। মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির সামনে বিকল্প না থাকাতেই এটা ঘটছে। শেখ হাসিনা ওদেরকে একটা বিকল্পহীন রামকুন্ডলির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।  সৃজনশীলতাকে অবশ্যই রাজনীতিমনষ্ক হতে হবে, কারণ কিছুই রাজনীতির বাইরে নয়। কিন্তু সৃজনশীলতা দলমন্য হলেই বিপজ্জনক এবং আরো বিপজ্জনক এটা উচ্ছিষ্টের অনুগামী হলে। বাংলাদেশে সেই বিপদই হয়ে পড়েছে স্বাগতিক। এর অন্যতম কারণ, দলকানা সৃজনশীলদের অনেক সুবিধা। এতে কড়ির সঙ্গে আসে প্রচার, ভ্রমণ, পদক প্রভৃতি।

যেখানে দ্ব›দ্ব রয়েছে সত্যের সঙ্গে মিথ্যার, ভালোর সাথে মন্দের, ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের, শুভর সঙ্গে অশুভের এবং প্রগতির সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীলতার, সেখানে একজন মানুষ কখনো নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। তার কর্ম ও বক্তব্য কারো না কারো পক্ষে যাবেই। এমন কি কোনো ইস্যুতে সে যদি নিষ্কর্ম অবস্থায় এবং নিঃশব্দেও বসে থাকে, তখনো তার নিষ্ক্রিয়তা ও নৈঃশব্দ কারো না কারো কিংবা কোনো না কেনো পক্ষে যাবে। একজন মানুষ অবশ্যই নির্দলীয় থাকতে পারে। কিন্তু নিরপেক্ষ কোনোভাবেই নয়।

শুধু মানুষ কেন, বুদ্ধিমান কোনো প্রাণীও তথাকথিত নিরপেক্ষ নয়। একটি কাককে হত্যা করা হলে অসংখ্য কাক জড়ো হয়ে বিকট স্বরে প্রতিবাদ করে। একটি পিঁপড়ে মরলে অনেক পিঁপড়ে তাকে বহন করে নিয়ে যায়। কিন্তু স্বল্পবুদ্ধির পশু একটি গরুকে যখন জবাই করা হয় তখন আরেকটি গরু দিব্যি ঘাস খেতে থাকে।
আরেক অর্থে নিরপেক্ষ মানে মীরজাফর, পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ বা ক্লাইভের পক্ষে না গিয়ে হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ঘটনা যা ঘটার ঘটে যায়। সেটা ছিল একটি পক্ষেরই পক্ষের নিরপেক্ষতা।

স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ বাহাত্তরের মানসম্মত একটি সংবিধান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল সুস্থভাবেই। কিন্তু সংবিধানের মলাট শুকোবার আগেই শুরু হয় বিকৃতি। দ্বিতীয় , চতুর্থ, পঞ্চম, অষ্টম প্রভৃতি সংশোধনী বাংলাদেশের সৃষ্টি-পর্বের আদর্শ- অঙ্গীকারের বিচ্যুতি। সামরিক শাসনও বড় ধরনের বিকৃতি। আবার নির্বাচিত স্বৈর-শাসনও বিকৃতিরই নামান্তর । এতোগুলি এবং এতো ধরনের বিকৃতি মোকাবেলা করতে হয়েছে, হচ্ছে বাংলাদেশ ও তার জনগণকে, যার সবগুলিই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনার প্রতিপক্ষ। সে কারণে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে গিয়ে বার বার খাবি খাচ্ছে।

বাকশাল-বামনিধন-দুর্ভিক্ষ-লুন্ঠন প্রভৃতির চেয়েও আওয়ামী লীগ ইতিহাসে অধিকতর নিন্দিত হবে জনগণকে ভোটবঞ্চিত করে ক্ষমতা দখল ও ভোগ করার জন্য । ভোট দিতে না পারার অপমান জনগণ কখনো ক্ষমা করে না। ভোটের রায় অসম্মান করায় একাত্তরে এদেশের মানুষ পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে, এবং সেটা আওয়ামী লীগেরই রাজনৈতিক নেতৃত্বে। ৩০ ডিসেম্বর-কিসিমের প্রহসন আওয়ামী লীগের প্রয়োজন ছিলো না।
সামরিক শাসকরা জনগণের ওপর জবরদস্তি করে সেনাবাহিনী দিয়ে। আজকের শাসকেরা করছে সবগুলি বাহিনী, প্রতিষ্ঠান ও দলীয় সন্ত্রাসী-ক্যাডার দিয়ে। সব উজাড় করে দিয়ে দেওয়া বর্তমান পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মৌলবাদী-ধর্মান্ধ শাসিত প্রতিবেশীর জুজুর ভয়তো রাখছেই ।

যারা সরকার, সরকারি দল ও ক্ষমতাগামী বিরোধী দলের কাজ-কর্ম খুব কাছে থেকে দেখেননি, তারা জানেন না, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রাজনীতিবিদেরা মাঠে-ময়দানে-সংসদে যেসব কথা বলেন তার প্রায় সবগুলোই ধাপ্পা-মশকরা। এমন কি এমপি-মন্ত্রীরাও নয়, দেশ চলে কিচেন কেবিনেটের সিদ্ধান্তে। বিশেষ করে কিচেন কেবিনেটের হেড বাবুর্চি যা রান্না করেন, সারা দেশের মানুষ তাই গোগ্রাসে গেলে, বাঙালি বা কাঙালি ভোজের বিরিয়ানির মতো।
আওয়ামী লীগ খুবই ভালো কাজ করবে, যদি ক্ষমতায় থাকতেই তাদের পাপ-পরিতাপের প্রায়শ্চিত্ত করে যায়; একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে, যে নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারবে। জনগণ ভোট দিলে আবার আসবে। না দিলে মেনে নিতে হবে। রাজপথে থেকেও দেশ-জাতির সেবা করা যায়।  মনীষী আহমদ ছফা আওয়ামী লীগকে ‘রাজপথের উত্তাপ থেকে জন্ম-নেওয়া’ দল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আজকের আওয়ামী ভয় পাচ্ছে সেই রাজপথকেই।

বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয় সরকারকেও চারবছর পর মানুষ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। ভোটের মাধ্যমে পরপর দুইবার ক্ষমতায় আসার পরিবেশ-সংস্কৃতি বাংলাদেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। সামরিক বা স্বৈর-শাসনের দীর্ঘসূত্রিতা মেনে নেয় বাধ্য হয়ে। তবে সময়-সুযোগ পেলেই অবস্থান নেয়। সেখানে আওয়ামী লীগের এখন প্রায় একযুগ। তা-ও এর বেশিরভাগ সময় জালিয়াতি -চালিয়াতির নির্বাচনের। এটা রীতিমত ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
একটি সরকার শপথ নিয়ে বঙ্গভবন ছাড়ার সময়ই দশভাগ সমর্থন বিয়োগ হতে শুরু করে। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে বলে তাদের হিসাব-ধারণা, যে পরখ করার সাহসও হারিয়ে ফেলেছে। মুখে অবশ্য বলবে অন্য কথা।
অবশ্য এই ক্ষেত্রে কোনো বিরোধী দলের একপয়সার ভূমিকাও নেই। একুশ বছর এ সুযোগ আওয়ামী লীগেরও ছিল না। দুই দলই ক্ষমতায় থাকতে অপকর্মের কারণে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অপেক্ষা করে বিস্মৃতিপরায়ণ বাংলাদেশের মানুষ সেগুলি কখন ভুলবে। দল নামক দোকানটাকে কোনো রকম খুলে রেখে ওৎপেতে থাকে ‘সুদিনের জন্য।’ তাই ভোটাররাও তাদের কাছে ভালো কিছু শেখে না।
অবস্থান নেয় আমলা-ব্যবসায়ী প্রভৃতিসহ কিংমেকাররাও। ২০১৪ সালের নির্বচনে বিএনপি অংশ নেয়নি বলে তারা আর অবস্থানের দিকে যায়নি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের আমলারা একটি সরকারের তিন-সাড়েতিন বছরের পর থেকেই পরবর্তী সরকারের পক্ষে কাজ করতে থাকে। তারা মন্ত্রীদের অভিজ্ঞ হয়ে ওঠার আগেই সরকারকে বিদায় করে দিয়ে প্রাধান্য বজায় রাখে। এবার বিএনপির ভুল ও ভারতের এন্ড্রোসমেন্ট প্রভৃতির কারণে ঘেরাও হয়ে আমলারা আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের মুখে কাজ করে যাচ্ছে এবং বড় বড় সুবিধাও তারা নিচ্ছে। তাই কোনো প্রভাবশালী আমলা বড় চোর হিসাবে ধরা পড়লেও আওয়ামী লীগের কিছুই করার থাকে না। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অসৎ-অংশ হচ্ছে পার্টটাইম দস্যু, আর আমলা-বণিকদের অসৎ-অংশ হচ্ছে ফুলটাইম তস্কর।

২০১৩ সালের পর থেকে লিখে আসছিলাম, যে বিএনপি সৃষ্টি হয়েছিল আওয়ামী লীগ বহির্ভূত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে, মওলানা ভাসানীর লোকদের হাতে। বিএনপির গঠনতন্ত্র শুরুই হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি দিয়ে। রণাঙ্গনের বহু উজ্জ্বল মুক্তিযোদ্ধা এই দলে ছিলেন। জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে মওলানা ভাসানীর লোকেরাই বিএনপিকে মানুষের ঘরে ঘরে নিয়ে গেছেন। এমন কি মওলানা ভাসানীর ন্যাপের প্রতীক ধানের শীষও তুলে দেওয়া হয়েছিল বিএনপির হাতে। এরাই বিএনপির মূলধারা। জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামী ছাড়া অন্যদলের কিছু রাজাকার ও স্বাধীনতা-বিরোধী ব্যক্তি বিএনপিতে এলেও এরা সব সময়ই ছিল বিচ্ছিন্ন শক্তি। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নরাই জোটের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবং তদজাতীয় কতিপয়ের সঙ্গে মিলে বিএনপিকে মূল জায়গা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটা সফল হয়।

বিএনপি আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা-স্ববিরোধ প্রভৃতির কোনো খিছুই কাজে লাগাতে পারেনি ঐতিহাসিকই কারণে। জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে পথে বসিয়ে দেওয়ায় ইতিহাস এই দলকে ছেড়ে অনেক দূর চলে গেছে। আমার ধারণা, ২০০৯ সালের নির্বচনে বিএনপির এভাবে যাওয়া উচিত হয়নি। গেলেও উচিত ছিল আরো সময় নেওয়া, দলের জেলে থাকা নেতাদের মুক্তি ও পালিয়ে থাকা নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আদায় করে নেওয়া। আবার ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু যায়নি। গেলে ক্ষমতায় আসতে পারলে ভাল, না আসলেও এই করুণ অবস্থা হতো না। এই দুই সিদ্ধান্তের পেছনেই জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির অভ্যন্তরের জামায়াত-পন্থীদের বড় ভূমিকা রয়েছে।

এরা বেগম খালেদা জিয়ার হাতের শেষ ভরসার লাল পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে সবুজ পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়েছে। এদের বড় অংশ দলের অবস্থানের চেয়ে মনোনয়ন ও পদবাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন ও আছেন। মুড়ি-মুড়কির মতো কেন্দ্রীয় ও সম্পাদকীয় মন্ডলীর কমিটিতে কয়েকগুন বেড়েছে নেতার সংখ্যা। কাজে আসেনি।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তখন উপজেলা নির্বাচন হচ্ছিল। ভুলের দিকে ইঙ্গিত করায় তিনি একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, কিসের অবস্থান নেবে! এই যে উপজেলা নির্বচনের সব আসন আওয়ামী জোর করে নিয়ে নিচ্ছে, কই কেউতো অবস্থান নিলো না। আমি চুপ করে গেলাম। মনে মনে বললাম, জাতীয় নির্বাচনে না গিয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতাকে প্যাকেট করে সূধা সদনে দিয়ে এলেন, আর এখন আমলা, ব্যবসায়ী এমনকি দলীয় কর্মীরা যাবে স্থানীয় নির্বচনে অবস্থান নিতে!

বিএনপির ভালো করবে, যদি সেই দুটি নির্বাচনী সিদ্ধান্তে কারা মরিয়া ছিল সেটা ও তাদের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে দেখে। উদ্দেশ্য ও অযোগ্যতা দুটিই সমভাবে কাজ করে থাকতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের অনেকগুলি বায়াদলিল বিএনপির হাতে থাকা সত্ত্বেও সে এই মহান প্রত্যয় ও মুক্তিযুদ্ধের গোটা জমিন ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগকে। একই সঙ্গে জামায়াতের লিগেসি বৈধ করায় আওয়ামী লীগ জামায়াত-বিএনপিকে নিয়ে দড়ি পাকাবার সুযোগ পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয়-চেতনাকে নিজেদের করে নিয়ে এবং সেই গর্ব-অহংকারেরই জমিনে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিতর্ক-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়ার যে সুযোগ বিএনপির রয়েছে, সেখানে বিএনপি নিজের জমিনই বন্ধক দিয়ে চলেছে জামায়াতসহ অন্য ধর্ম-ব্যবসায়ীদের কাছে। তাদের জোটের মিত্র ধর্মব্যবসায়ী ও দলের ভেতরকার প্রচ্ছন্ন ধর্মব্যবসায়ীরা অনেক পরিকল্পনা করে বিএনপিকে রাজপথ থেকে টেনে অন্ধগলিতে ঢুকিয়েছে, সামনে যার চোরাবালি। এই চক্র বিএনপির আওয়ামী লীগ-বিরোধিতাকে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধিতায় পর্যবসিত করেছে। তাদের লক্ষ্য বিএনপিকে কাবু করে দ্বিতীয় শক্তিশালী দল হিসেবে জামায়াতপন্থীদের প্রতিস্থপন। এ পরিকল্পনা আওয়ামী লীগেরও। কারণ, তাতে তাদের বিরাট লাভ। দেশ-বিদেশকে তারা দেখাতে পারবে, তাদের বিকল্প হচ্ছে ঘাতক-জঙ্গীরা। পরিকল্পনা চলছে সমান্তরালভাবে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, বিএনপি কানে হাত দিলে দেখতে পাবে, তার কী প্রিন্ট, কী ইলেকট্রোনিক, সবগুলি মিডিয়াই চিলে নিয়ে গেছে।

এবার আমি বিএনপির জন্য খুব দরকারী ও বিব্রতকর একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করবো। প্রায় একযুগ আগে আমি একটা সময় অনেক কিছুর সাক্ষী। আমার কাছে কখনো মনে হয়নি ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালনে বেগম খালেদা জিয়া খুব একটা উৎসাহী বা অনড় ছিলেন। কিন্তু জাতীয় শোক দিবসের সেই তারিখের বিকেলের দিকে কিছু নেতা হাজির হয়ে যেতেন দলবলসহ বিশাল কেক নিয়ে। কখনো প্রধানমন্ত্রীর অফিসে, না হয় বাসায়। হতে পারে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে গেছেন। সে অনুষ্ঠানে নেতাদের যাওয়ার কোনো ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা ছিল না। একবার অনুষ্ঠান চলাকালে আমি অন্য এক জায়গায় এক গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে বাসায় দেখে ইঙ্গিত করায় তিনি বলেন, এ অনুষ্ঠানে আমি কখনো যাই না। ম্যাডামকে এ ব্যাপারে উৎসাহী দেখলে তো যাওয়াই লাগতো!

বিএনপির আজ এই ব্যাপারটাও খতিয়ে দেখা উচিত, কারা কেন সেদিন অতি উৎসাহীর ভূমিকা পালন করেছেন। এই একটি ‘কেক-কর্তন’ বাংলাদেশে বড় দুটি দলের ন্যূনতম সৌহার্দকে কেটেকুটে সাফ করে দিয়েছে। এমন কি সরকারী ও বিরোধী দলের ওয়ার্কিং রিলেশনের নিদেনপক্ষের ভিত্তির মধ্যখানে তুলে দিয়েছে দুর্গম প্রাচীর। অনুসন্ধানীরা যদি দুই দল বা দুই নেত্রীর কেকের আগে-পরের সম্পর্ক মিলিয়ে দেখেন, নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন। এই ঘটনা বাংলাদেশ, বিএনপি বা জিয়া পরিবারের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে বলে আমার মনে হয়। সে কারণে অনেক ঝুঁকি নিয়েও কথাটা বললাম। এর একটি প্রতীকি ভাবার্থও রয়েছে আমার দৃষ্টিতে।

স্বদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা আর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যে তফাত আকাশ-পাতাল। বাংলাদেশে কেউ গণতন্ত্র চান, কেউ সমাজতন্ত্র চাইতে পারেন, কেউ ইসলামী ব্যবস্থাও দাবি করতে পারেন। এগুলি রাজনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক মতপার্থক্য। কিন্তু একাত্তরে যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে বেঈমানী করেছে, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা-লুটতরাজ-ধর্ষণে শত্রুবাহিনীকে সহায়তা করেছে বা নিজেরা সে-সব অপকর্ম করেছে, তারা গুরুতর অপরাধী। কিন্তু এখন বিষয় দুটিকে গুলিয়ে ফেলার একটা প্রচারণা চলছে দেশে-বিদেশে। এই প্রচারণা বিশেষ করে চলছে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বিতর্কিত ও লঘু করে দেখানোর জন্য। কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীও কৌশলে এহেন মতলবপূর্ণ প্রচারণা চালাচ্ছেন। কেউ কেউ ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, ওরা ‘আদর্শিক কারণে পাকিস্তান রক্ষা’ করতে চেয়েছে ইত্যাদি।

জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দেশে দোর্দন্ড-প্রতাপে বিরাজ করছে যে দেশটি তারা চায়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-বিরোধীদের অন্যতম পুরোধা হয়েও জামায়াতে ইসলামী এদেশে রাজনীতি করছে, প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে এনজিও-ওর মতো, অবাধে ব্যবসা করছে, দায়ে পড়লে বিদেশি লবিস্টও নিয়োগ করছে। কিন্তু আপত্তি তাদের একটামাত্র জায়গায়, একাত্তরে তাদের কৃতকর্মের জন্য, অন্যায়-অপরাধ-পাপ ও ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় ও ভুল স্বীকারে। জনগণের কাছে ভোট চাইতে তাদের লজ্জা করে না, লজ্জাটা শুধু ভুলের প্রায়শ্চিত্র বা ক্ষমার মাধ্যমে মুমিন বান্দা হওয়ার ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের মানুষ ক্ষমা করুক আর না করুক, দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া ছিল অত্যাবশ্যকীয়। দেরিতে হলেও দলের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতা ড. রাজ্জাক এবং তার অনুসারীরা বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন, কেউ কেউ দলত্যাগও শুরু করেছেন। দুইজনের কথা প্রকাশ্যে এলেও তৃণমূল পর্যায়ে দলত্যাগ ও নিষ্ক্রিয়তা শুরু হয়েছে অনেক আগেই।

একাত্তরে তাদের কৃতকর্মের জন্য জামায়াতে ইসলামীর ভুল স্বীকার না করার সরল অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের তখনকার অবস্থানকেই সঠিক মনে করে। এর আরো সরল অর্থ হচ্ছে, সুযোগ পেলে বা ক্ষমতায় যেতে পারলে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে আবার একীভূত হবে বা বাংলাদেশকেই পাকিস্তান-আদলের আরেকটি দেশে রূপান্তরিত করবে। অবশ্য বাংলাদেশে জামায়তে ইসলামীর ক্ষমতায় যাওয়ার আশঙ্কা শূন্যের কোঠায়, যদিও জামায়াত মনে করে সেটা সম্ভব। এমন কি ২০০৮ সালে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ঘোষণাও দিয়েছিলেন, যে ১৫ বছরের মধ্যে তারা ক্ষমতায় আসবেন। এসবেরও সরলতম অর্থ হচ্ছে, তারা বাংলাদেশের মানুষকে বোকা ছাড়া আর কিছু ভাবেন না। অথচ, জন্মের পর থেকে এই দলটিই চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা, নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা, হঠকারিতা ও গোয়ার্তুমির পরিচয় দিয়ে আসছে।

অন্যদিকে, পৃথিবীতে বাংলাদেশের জনগণকেও একটা নজিরবিহীন দুর্ভাগ্য বহন করতে হচ্ছে। বলীয়ান ত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ করেও পরাজিত-বিশ্বাসঘাতক-শত্রুদের দম্ভ সহ্য করতে হয় তাদের। করতে হয় এদের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম। আরো দুর্ভাগ্য, দলীয় স্বার্থের কারণে সেই পরাজিতদের সঙ্গে প্রকাশ্য বা গোপন সমঝোতা করতে হয় মূলধারার দলগুলিকে, পেশাজীবী সংগঠনগুলিকে। স্বাধীন দেশের পাতাকাও ওড়ে তাদের গাড়ি-বাড়িতে। কখনো কখনো তাদের দম্ভ আকাশচুম্বীও হয়ে ওঠে, ছাড়িয়ে যায় সহ্যের মাত্রা।

স্বাধীনতার পর জামায়াতসহ ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে প্রথম নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু একসময় সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল গঠন করায় ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে নিষিদ্ধের আলাদা-গুরুত্ব হারিয়ে যায়। জিয়াউর রহমানের আমলে পিপিআর-এর আওতায় আবার সবগুলি দল পুনরুজ্জীবিত হয়। জামায়াত তখন বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের লেবাস নিয়ে কাজ শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলি থেকে আসা অঢেল অর্থ ব্যয় করে তারা গ্রহণ করে সুদূর-প্রসারী কর্মসূচি। দরিদ্রের মেধাবী সন্তানদের স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য করে সামরিক-বেসামরিক অনেক উচ্চ ও অন্যান্য পদে অনুপ্রবেশ ঘটায়। আজকে আমরা শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল প্রভৃতির মধ্যে বিপুল-সংখ্যক জামায়াত-শিবির করার যে চিত্র বিষ্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, এটা জামায়াতের সুদূর-প্রসারী কর্মসূচির পেকে-যাওয়া ফল। বিশাল মূলধনের অংশ-বিশেষ দিয়ে তারা কব্জা করে সেবাখাতগুলিও। তাদের কর্জে হাসানার সূক্ষè বেড়াজাল ঘিরে ফেলে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। এরসঙ্গে মিশেল দেওয়া ধর্ম-ব্যবসাতো আছেই।

জামায়াত ধরে নিয়েছিল, প্রচুর অর্থ ছিটানোর পাশাপাশি মূলধারার দলগুলির সঙ্গে সখ্যতা সৃষ্টি বা তার রদবদল করে ও পর্যায়ক্রমে কর্মসূচি অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। তারপর একসময় বড় জায়গা করে নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতায় চলে আসবে। এই চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির ওপর জামায়াত খুব বেশি নির্ভর করায় একাত্তরের ভূমিকার জন্য ভুল স্বীকার বা ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। গোটা এরশাদ আমল ও ছিয়ানব্বইয়ে বিএনপি-বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগকে অনুসরণ করায় তাদের নৈতিক বা রাজনৈতিক সঙ্কট তেমনভাবে দেখা যায়নি। চলতি পর্বে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করার পাশাপাশি তাদের প্রাণ-ভোমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলি থেকে একপ্রকার উচ্ছেদ করে প্রায়-মিসকিনে পরিণত করেছে। জান-মাল ধরে একসাথে টান দিয়ে খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে। এ কাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায়-একক উদ্যোগ-সাহসের জন্য সম্ভব হতে পেরেছেন। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে এটা সম্ভব ছিল না। এতে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবেও বিপুল লাভের মুখ দেখেছে। দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, বিএনপি ও জামায়াতকে পাটের একগাছিতে মুড়ে কঠিন এক দড়ি পাকিয়ে বিএনপিকেও ফেলেছে ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আছে দুটিরই বিরোধ। জামায়াত ধর্মকে ব্যবহার করে, আওয়ামী লীগ চতুরতার সঙ্গে জামায়াতকে ব্যবহার করে। আর বিএনপি ব্যবহৃত হয়।
আমাদের কালের রাজনীতির পচন সম্ভাবিত করেছে অন্যক্ষেত্রগুলির পচনকে। দলান্ধ হলে দুই লাইন লিখে, দুই পঙক্তি গেয়ে, দুই কদম নেচে, দুই পোচ এঁকে বা দুই হাঁক দিয়েই অতি বিখ্যাত ও বিত্তবান হওয়া যায়। যারা কোনো উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেননি বা জীবনে উদ্ধৃতিযোগ্য দু’টি লাইনও লেখেননি, তারাও বিভিন্ন পদক ভাগাভাগির কারণে ‘বিরাট প্রতিভা।’ এবং সেটা বরকন্দাজীর জন্য। দলের চশমায় তারা সবকিছু দেখেন। সে কারণে আমাদের সৃজনকাল অনেকটাই বন্ধ্যা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমাদের দলান্ধ ও ধারান্ধ সৃজনশীলরা অঙ্গীকার ও প্রতিভার সংজ্ঞায় ঊন-মানুষে পরিণত হয়ে এই দেয়ালেরই পক্ষেই নির্মাণ করছেন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ললিতকলার বিভিন্ন চিত্র। সরস্বতীর বরপুত্র আমাদের সৃজনকালের প্রতিভাবানরা তাদের নিজেদেরকে কেউ ভাবেন বাঙালি, কেউ ভাবেন বাংলাদেশি। কেউ ভাবেন তারা অমুকের সৈনিক, কেউ ভাবেন তমুকের সৈনিক, কিন্ত‘ নিজেকে পূর্ণ মানুষ ভাবেন না। তারা কিছু দেখেন কিছু দেখেন না, কিছু লেখেন কিছু লেখেন না, কিছু বলেন কিছু বলেন না। মনে-মনে অবশ্য ভাবেন সবই। কিন্ত‘ প্রকাশে তারা অর্ধ-মানব, কেউ বা সিকি মানব। চিন্তার এই বামুনত্বের জন্যও আমাদের কেনো কিছুই বিশ্ব-মাপের হয়ে ওঠে না, এমন কি হয়ে ওঠে না মানসম্মত বা রুচিসম্মতও। এবং অভিন্ন কারণেই দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের প্রপঞ্চগুলি নির্মোহভাবে তুলে ধরার কাউকে আমরা দেখি না।

আমাদের লিখিয়ে-আঁকিয়ে-গাইয়ে-নাচিয়ে-চিত্রতুলিয়ে মায় সাংবাদিকতার জগৎ এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে দলমন্য, ধারামন্য ও উচ্ছিষ্টের অনুগামিতায়। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের জগতে দেখছি বাল্মীকীকে নারদ মুণির আশ্বস্ত করার আপ্তবাক্য, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি/ ঘটে যা তা সব সত্য নহে।’ (রবীন্দ্রনাথ : ভাষা ও ছন্দ)। অথচ উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলিতে একসময় বলিদান ও আত্মত্যাগের সুমহান নজিরও রয়েছে।
অভিন্ন কারণে সংবাদমাধ্যমগুলির স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে, বাড়ছে হলুদ সাংবাদিকতা ও আগাছা। হ্রাস পেয়েছে জনগণের কাছে সংবাদমাধ্যমগুলির জবাবদিহিতার অনিবার্য তাগিদ। এখন দলমত নির্বিশেষের সাংবাদিকদের স্বার্থ ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে সংগ্রাম করারও কেউ নেই। এমনকি সাংবাদিক-হত্যার বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর পর। সংবাদ মাধ্যমের সম্মান ও আস্থা তলিয়ে গেছে এই দেয়ালের গা-ঝরা পানিতে।

আওয়ামী লীগ দল ও সরকার কোনো কিছু না করেই মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির নজিরবিহীন সমর্থন লাভের একটা যুগান্তকারী নজির উপভোগ করে চলেছে। মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তির সামনে বিকল্প না থাকাতেই এটা ঘটছে। শেখ হাসিনা ওদেরকে একটা বিকল্পহীন রামকুন্ডলির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন।
দূষণকালে কোনো পেশাই বিচ্ছিন্নভাবে ভালো থাকতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে দুর্বৃত্তরা মিলে যে বেনিফিসিয়ারি চক্র গড়ে তুলেছে, উপর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত, সেখানেও ধাক্কা আসবে । দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন বাংলাদেশের মূল সুর নয়। মূল সুর হচ্ছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবের ঐতিহ্য। বাংলাদেশের সংগ্রামী জনগণ সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব পেলে তারাই নির্মাণ করবে স্বপ্নের বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি এ সত্য উপলব্ধি করে না যে, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, শিক্ষক বা সাংবাদিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু কিছু পেশাজীবী রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হন এবং ব্যবহার করার রাস্তা নিজেরা করে দেন। আমাদের দেশের পেশাজীবী সংগঠনগুলির রাজনৈতিক অধপতনের যে গতি দেখা যাচ্ছে, সেটা তাদেরকেই রুখতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেউলিয়া হয়ে পড়ার কারণে ক্ষমতার জন্য তারা ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধ’র মতো প্রত্যয়গুলিও যখন ব্যবহার করেন তখন পেশাজীবীদেরতো ব্যবহার করবেনই। পেশাজীবী সংগঠন করায় দোষ নেই, দোষ হচ্ছে উগ্র দলমন্যতা। আমাদের অসংখ্য মেধাবী ও নিবেদিত-প্রাণ ডাক্তার প্রভৃতি রয়েছেন। কিন্তু তারা ম্লান ও মুখোপেক্ষি হয়ে আছেন দলকানাদের কাছে। অনেক বিষয় অনেক কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলি বললাম।

কৃষক, প্রবাসী, গার্মেন্টস-কর্মী এই তিন শক্তি কিন্তু মূলত একই শক্তি । কারণ গার্মেন্টস কর্মী এবং প্রবাসীরা মূলত কৃষক শ্রমিকের সন্তান যারা সবটুকু উপার্জন দেশে পাঠিয়ে দেয় । আমাদের মত প্রবাসীরা হয়তো ঘর সংসার করে যেটুকু থাকে তার অল্পই দেশে পাঠাই । বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ দেশের বাইরে। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে দেশে রেমিট্যান্স সবচেয়ে বেশি পাঠায় গরিব মানুষের ছেলেমেয়েরাই। আর দেশের লুটেরারা সেই সম্পদ পাচার করে বিদেশে জমাচ্ছে, ঘরবাড়ি করছে। সব শুভ ও সুন্দরের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে।
বাংলাদেশ তার নিজের দিকে তাকাতে শুরু করেছে। যারা পবিত্র ধর্ম ও মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভোট যুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সব সময় অস্ত্রে শান দিয়ে চলেছেন তাদের জন্যও দুঃসংবাদ আছে। এগুলি নির্বিচারে ব্যবহার করে আগের মতো ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। যারা ভারত-বন্দনা বা ভারত-বিরোধিতাকে বাংলাদেশের রাজনীতির নিয়ামক করতে চান, সামনের সময়গুলি তাদের জন্য ভালো ঠেকছে না।

এবার অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলতে চাই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র পর্ব চলেছে মাত্র পৌনে ৯ মাস। এতো অল্প সময়ের মধ্যে ত্রিশলাখ মানুষের জীবনদানসহ কোটি-কোটি মানুষের বলীয়ান আত্মত্যাগের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মায়ের গর্ভ থেকে একটি শিশুর জন্ম নিতে যেখানে ৯ মাসের বেশি সময় লাগে, সেখানে পৌনে ৯ মাসে একটি দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে সাফল্য লাভের নজিরও ইতিহাসে বিরল।

তবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র পর্বে ভারত সরাসরি সহায়তা না করলে এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ না হলে স্বাধীনতা অর্জনে আরো অনেক বেশি সময় লাগতো এবং জীবন ও সম্পদহানি হতে আরো অনেক বেশি।
যুদ্ধে ভারতের তিন হাজারেরও বেশি সেনা নিহত ও নিখোঁজ এবং প্রায় ১২ হাজার সেনা আহত হয়েছেন বলে আমরা জানতে পারি। প্রায় এককোটি মানুষকে দীর্ঘদিন লালন-পালন করেছে ভারত। এ ক্ষেত্রে ভারতের ত্যাগও সীমাহীন। সবচেয়ে বড় কথা, ভারত তখন একটি বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকিও নিয়েছিল, যা ভাগ্যক্রমে ঘটেনি। সপ্তম নৌবহর এসেও ফিরে গেছে, চীনারাও দিনাজপুর দিয়ে ঢোকেনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম আমরা সেদিন। পরবর্তী কালে আমরা জানতে পারি, আমেরিকা চীনকে অনুরোধ করেছিল ভারতের ভূ-খন্ড মাড়িয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে; তাহলে সপ্তম নৌবহর থেকে আক্রমণ চালাতো আমেরিকা। চীন পিছিয়ে যাওয়াতে আমেরিকাও পিছিয়ে যায়।

সমকালের স্নায়ু-যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ভারতের পাশে না থাকলে ভারতের সাহায্য খুব একটা কাজে আসতো না , যুদ্ধ আরো প্রলম্বিত হতো। একাত্তরে আমরা আমাদের দেশের স্বাধীনতা চেয়েছি আর ভারত তার চির-বৈরী পাকিস্তানকে ভাঙতে চেয়েছে। একাত্তরে আমাদের ও ভারতের স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলেছে। আমরা স্বার্থ উদ্ধারে ভারতকে সাহায্য করেছি আর ভারত পাকিস্তান ভাঙতে আমাদের সাহয্য নিয়েছে। এখানে দান-উদারতার তেমন কোনো ব্যাপার নেই। ভারত তাদের স্বার্থের কথা গোপনও রাখেনি। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন পরিচালক কে সুভ্রাম্মনিয়াম স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘ভারকে উপলব্ধি করতে হবে যে আমাদের স্বার্থেই পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দেয়া উচিত এবং এবারে আমরা যে সুযোগ পেয়েছি সে ধরনের সুযোগ আসার আসু আর কোনো সম্ভাবনা নেই।’

কিছু লোক আবার ভারত ও আওয়ামী লীগের উগ্রবিরোধিতা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও কথাবার্তা বলে ফেলেন। এটাকে আরো উষ্কে দেন তারা, স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি।
আবার কিছু লোক ‘ভারতের সবই মহান’ বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও করে আসছেন। ভারতের বাংলাদেশ-বিরোধী পদক্ষেপ বা ভারতীয় কিছু লোকের আপত্তিকর কথাবার্তা তাদের বিচলিত করে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের কোনো কোন মহলের ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যও তাদের গায়ে লাগে না বা তারা তার প্রতিবাদ করেন না।
আওয়ামী লীগ সরকার কিছু না পেয়েই ভারতকে যেভাবে ওয়াক-ওভার দিচ্ছে তার সঙ্গে একমত নই, অনেকেই নয়, সরকারের জোটের মিত্রদের অনেকেও নয়। কিন্তু বিনাস্বার্থে ভারতের হাতে তুরুপের তাস তুলে দেওয়ার পরও এই সরকার থই পাচ্ছে না। ডুবতে বসেছে ‘বন্ধু’দেরই জন্যে। এসব ঘটনা থেকে বাংলাদেশ-ভারতের প্রকৃত সুসম্পর্ক প্রত্যাশীদের অনেক কিছুই শেখার আছে।

বাংলাদেশে আরেকটি কৌতূহল-উদ্দীপক বিষয় লক্ষণীয় যে, ক্ষমতায় যখন কথিত ভারতপন্থিরা থাকে, সাধারণ মানুষ তখন ভারতের প্রতি থাকে সন্দিহান, আর যখন কথিত ভারত-বিরোধীরা ক্ষমতায় থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দেয় ভারতের প্রতি সহানুভূতি। এরও নিশ্চয়ই কারণ আছে। সুসম্পর্ক স্থয়ী ও সর্বব্যাপী করতে চাইলে এসবের কারণও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
ভারতের ভুল আচরণই তথাকথিত ‘এ্যন্টিইন্ডিয়ান’ রাজনীতির মূলধন হিসেবে জন্ম ও বিকাশ, যদিও এই বিকাশ বিকৃত বিকাশ। এতে দুই দেশেরই অনেক ক্ষতি হয়েছে। সামনে আরো সমূহক্ষতির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। অনেক অদূরদর্শিতার শরীকানা বাংলাদেশ ভোগ করেছে। ভবিষ্যতেও কেন ভোগ করতে হবে। এখন ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের এই আহবান জানানোর সময় এসেছে, আপনাদের নাকউঁচুদের সামলান, যথাযথ সমমর্যাদার আচরণ করুন।

নিরাসক্ত বাঙালির উপমা পলাশীর প্রান্তর? গর্জে-ওঠা বাঙালির রচনা ৫২-৬৯-৭১..। আবার গর্জে ওঠার সময় সমাগত। আপাতত সংক্ষিপ্ত কর্মসূচী নিয়ে, আইনের শাসনের মাধ্যমে একটি দুনীর্তিমুক্ত ও সন্ত্রাসবিহীন কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে। পুরোণোরা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। দেয়াল ভাঙতে এগিয়ে আসতে হবে নতুনদের, তরুণদের। এটা ওদের ভবিষ্যতের জন্যই বেশি প্রয়োজন।

খেলার সময় বাংলাদেশের পক্ষে ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতবাদ নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ এক কাতারে চলে আসে। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এই বন্ধন যেদিন টেকসই রূপ নেবে, সেদিন থেকে শুরু হবে বাংলাদেশের অকল্পনীয় ও অপ্রতিহত অগ্রযাত্রা। আমাদেরকে কোথাও না কোথাও থেকে নতুন করে শুরু করতে হবে। সেটা নতুন প্রজন্মকেই করতে হবে। সে কাজে আমার-আপনার সবারই সহযোগিতা করা দরকার ।

আমি এ লেখায় আমার আগের কিছু লেখার উদ্ধৃতি নিয়েছি। নিজের লেখা বলে সূত্র উল্লেখের প্রয়োজন মনে হয়নি। তবে লেখার চলতি পর্ব শেষ করবো দেয়ালের সঙ্গে খুব সংগতিপূর্ণ, প্রিয় লেখক শাসসুদ্দিন আহমেদের কয়েকটি লাইন দিয়ে, ‘গত পঞ্চাশ বছরে লুন্ঠনপটু ও জনবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল, বাস্তববর্জিত সংবিধান, ভেঙেপড়া নির্বাচন ব্যবস্থা, এক ব্যক্তির যথেচ্ছাচার, দলীয় নৈরাজ্য, ব্যবসায়ী অধ্যুষিত আইনসভা, নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, উপর মহলের লোমহর্ষক আর্থিক-দাপ্তরিক দুর্নীতি, লক্ষ্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থ, সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতা ও স্বজনপ্রীতি বাঙলাদেশের অগ্রগতি ও বিকাশের সকল সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। উন্নয়নের সব পথ চিরতরে রূদ্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাঙলাদেশ কোন দিনই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আপন শক্তিতে বড় হয়ে উঠতে পারবে না।’ ( ১০ জুলাই, ২০২০এর ফেসবুক স্ট্যাটাস)।
অসমাপ্ত।

টেম্পা, যুক্তরাষ্ট্র, ১২ জুলাই ২০২০, আহমেদ মূসা লেখক, সাংবাদিক, নাট্যকার। সম্পাদক, সৃজনকাল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত