প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. খন্দোকার মেহেদি আকরাম : করোনায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ডেক্সামেথাসন বয়ে আনতে পারে অপ্রত্যাশিত মৃত্যু?

ডা. খন্দোকার মেহেদি আকরাম ফেসবুক থেকে : আজ চারদিকে শুধু একই খবর। করোনা রোগের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পাওয়া গেছে। দেশী বিদেশী সব সংবাদ মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি হেড লাইন করে প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের রিকভারি ট্রায়ালের ঘোষিত ফলাফলে দেখা গেছে যে ডেক্সামেথাসন নামক খুব সাধারন এবং সহজলভ্য একটা ওষুধ ভেন্টিলেটরে চিকিৎসা দেয়া মারাত্মক কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুহার কমাতে পারে এক-তৃতীয়াংশ, এবং যেসব কোভিড রোগীর চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর লাগেনি কিন্তু শুধু অক্সিজেন লেগেছে তাদের মৃত্যুহার কমিয়ে ফেলে এক-পঞ্চমাংশ। তবে যে সকল কোভিড রোগীদের কোন প্রকার অক্সিজেন লাগেনি, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধটি তেমন কোন কাজ করেনি। এই RCT ট্রায়ালটা চালানো হয় যুক্তরাজ্যের ১২৫ টি হাসপাতালের ৬,৪০০ রোগীর উপর। এদের ভেতর প্রায় ২,১০০ জনকে দেয়া হয় ডেক্সামেথাসন ৬ মিলিগ্রাম সিংগেল ডোজ ১০ দিন, এবং কন্ট্রোল গ্রুপের ৪,৩০০ রোগীকে দেয়া হয় স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা। এটা বেশ বড় ধরনের একটা ট্রায়াল।

খবরটি নিঃসন্দেহে খুবই আশাব্যাঞ্জক, বিশেষত, সিভিয়ার বা মারাত্মক কভিডে ভোগা মৃত্যু পাথযাত্রী রোগীদের জন্য।

এই ফলাফল আজকেই প্রেস ব্রিফিঙের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। ট্র্যায়ালের রিপোর্টটা এখনও কোন জার্নালে প্রকাশিত হয়নি যদিও।

ডেক্সামেথাসন নতুন কোন ওষুধ নয়। বিশ্বব্যাপী ডাক্তারগন এই ওষুধটা ব্যাপক ভাবে বিভিন্ন অসুখে ব্যাবহার করে থাকেন। বাংলাদেশে ওরাডেক্সন এবং ডেকাসন নামে ট্যাবলেট এবং ইঞ্জেকশন হিসেবে পাওয়া যায়। ডেক্সামেথাসন হল এক ধরনের স্টেরয়েড (Corticosteroid) এবং শক্তিশালী এন্টি-ইনফ্লামেটরি এবং ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ড্রাগ। যেসব অসুখের প্রধান কারন অত্যাধিক প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এবং এবনরমাল ইমিউন রেস্পন্স সেসব রোগে এ ওষুধটি বেশ কার্যকরী। যেমন রিউম্যাটয়েড আরথ্রাইটিস, হাঁপানি, COPD এবং অন্যান্য আরো কিছু অটোইমিউন ডিজিজ। এ ওষুধটি মস্তিষ্কের ছেরিব্রাল ইডিমাও কমায়, আর এ কারনেই স্ট্রোকের পরে ওরাডেক্সন ইঞ্জেকশন দেয়া হয়।

তবে বাংলাদেশে ওরাডেক্সন বা ডেক্সামেথাসনের যথেচ্ছা ব্যাবহার রয়েছে কমিউনিটিতে। আর এটাই এখন একটা সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে।

আমাদের দেশে অনেকই স্বাস্থ্য ভাল করার জন্য বা একটু মোটা হওয়ার জন্য ওরাডেক্সন ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন! এদের ভেতরে বেশির ভাগই বিবাহ যোগ্য যুবতী মেয়ে। হ্যাঙলা-পাতলা মেয়েরা ভাবে স্বাস্থ্য ভাল হলে তাদের ভাল জায়গায় বিয়ে হবে! এই ধরনের প্রবনতা গ্রামের মেয়েদের ভেতরেই বেশি দেখা যায়। এই ধরনের স্টেরয়েড খেয়ে মোটা হওয়ার পরামর্শ তারা মূলত পান কোয়াক ডাক্তারদের কাছ থেকে।

এছাড়াও বাংলাদেশের পতিতালয় গুলোতে অল্প বয়স্ক পতিতা মেয়দের ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট নিয়মিত খাওয়ানো হয় যাতে করে ওদের শরীরের ওজন বাড়ে এবং দেখতে একটু বেশী বয়স্ক মনে হয়। এটা এসব জায়গার একটা নিয়মিত চিত্র। এর উপরে পূর্বে অনেক প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে খবের কাগজ গুলতে।

কোরবানী ঈদের আগে গরু হাটে যেসব মোটাতাজা গরু দেখা যায় তা বেশির ভাগই ওই ডেক্সামেথাসনেরই ফল!

ডেক্সামেথাসনের একটা সাইড ইফেক্ট হল সল্ট এবং ওয়াটার রিটেনশন। ওষুধ সেবনের কারনে শরীরে পানি জমে শরীরটা একটু নাদুস নুদুস দেখায়!

এত কিছু বলার পেছনে একটাই কারণ, আর তা হল, ডেক্সামেথাসনের ব্যাবহার বাংলাদেশে মুড়ির ব্যাবহারের মতই! কমিউনিটিতে এই ওষুধটা নিরাপদ ওষুধ হিসেবেই গণ্য হয়। অনেকে এটাকে স্বাস্থ্য ভাল হওয়ার ভিটামিনও মনে করে!

তো করোনা ভাইরাস ইনফেকশনে এই ওষুধটি খেলে সমস্যাটা কোথায়?

আছে, অনেক সমস্যা আছে।

আমাদের শরীরে যখন করোনা ভাইরাসটা প্রবেশ করে তখন তা প্রথমে সংক্রমণ করে ফুসফুসের কোষকে। ফুসফুসের কোষগুলো যখন আক্রান্ত হয় তখন তারা একধরনের প্রোটিন রিলিজ করে যা ফুসফুসে থাকা ইনফ্লামেটরি কোষ যেমন নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফেজ এবং ন্যাচারাল কিলার (NK) সেলগুলকে উজ্জিবিত করে। এই ইনফ্লামেটরি সেলগুলো তখন ভাইরাস আক্রান্ত কোষগুলোর কাছে আসে এবং আক্রান্ত কোষ থেকে ভাইরাস নিধনের চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়াটাকে বলা হয় ইনফ্লামেশন। এই অবস্থায়, ফুসফুসের ইনফ্লামেটরি সেলগুলো একধরনের সাইটোকাইন ও কেমোকাইন রিলিজ করে যা রক্ত থেকে টি-লিম্ফোসাইট (CD8+ T cells) এবং মনোসাইট ফুসফুসের আক্রান্ত স্থানে নিয়ে আসে। এই সবগুল ইনফ্লামেটরি সেল এক যোগ হয়ে ফুসফুসের করোনা ভাইরাসকে দূর করে এবং ফুসফুসের ইনজুরি সারিয়ে তুলে ৫ থেকে ৭ দিনের ভেতরেই। গোটা প্রক্রিয়াটাকে বলে ইমিউন রেসপন্স এবং হিলিং প্রসেস। এই পদ্ধতিতেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ১০০ জনের ভেতরে ৯৫ জনই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে কোন প্রকার ওষুধ ছাড়াই। শুধু মাত্র ৫ ভাগ রোগী খারাপের দিকে যায়, কারণ তাদের ইমিউন রেসপন্সটা অস্বাভাবিক রকম আচরণ করে।

এখন কেও যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের পর নিজ থেকে ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট কিনে খাওয়া শুরু করে দেয়ে, তাহলে কি হবে? ডেক্সামেথাসন অসুধটি শরীরের স্বাভাবিক ইনফ্লামেশন এবং ইমিউন রেসপন্সকে সাংঘাতিক ভাবে বাধাগ্রস্থ করবে। এতে করে আমাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা আর কাজ করবে না, ফলে ফুসফুসের ভাইরাসের সংক্রমন বাড়তেই থাকবে এবং এক সময় রোগী খারাপ হয়ে যাবে। পরিনতি হবে ওই দুর্ভাগা ৫ ভাগ সিভিয়ার কোভিড রোগীর মতই! অর্থাৎ করোনা ইনফেকশনের পরপই ডেক্সামেথাসন সেবনে অবস্থা হবে হিতে বিপরিত।

সিভিয়ার কোভিডে রোগী মারা যাওয়ার প্রধান কারন হল ARDS বা রেস্পিরেটরী ডিস্ট্রেস, হাইপার ইনফ্লামেশন এবং সাইটোকাইন স্টোর্ম রেসপন্স। এই অত্যাধিক মাত্রার ইনফ্লামেশনের কারনে ফুসফুস এবং রক্তনালীকা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে শ্বাসকষ্ট এবং রক্ত জমাট বেঁধে রোগী মারা যায়।

এমন অবস্থায় রোগীকে ডেক্সামেথাসন বা স্টেরয়েড চিকিৎসা দিলে রোগীর শরীরের ইনফ্লামেশন পক্রিয়া অনেকটা দমিত হয় এবং রোগীর অবস্থার উন্নতি হয়। কোভিডে এই স্টেরয়েড থেরাপী যে শুধু এই RECOVERY ট্রায়ালে দেওয়া হয়েছে তা নয়। বরং চীন এবং জাপানের পূর্ববর্তী সবগুলো ট্রায়ালেই অন্যান্য ওষুধের সাথে ডেক্সামেথাসন সহ বিভিন্ন ধরনের স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড থেরাপী হিসেবে।

তবে ঐসব ট্রায়েলে ব্রড স্পেক্ট্রাম এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে সেকেন্ডারি ইনফেকশন দমন করার জন্য।

ভাইরাস ইনফেকশনে স্টেরয়েড ব্যবহারে অত্যাধিক সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। পূর্ববর্তী গবেষনায় দেখা গেছে যে চিকেন পক্স বা হামে স্টেরয়েড প্রয়োগ করলে ভাইরাস ইনফেকশন অত্যাধিক রকমে বেড়ে যায়। সুতরাং করোনা ভাইরাসে ডেক্সামেথাসনের ব্যবহার সম্পূ্র্ন ভাবে চিকিৎসকের হাতে ছেড়ে দিতে হবে।

সার কথা হচ্ছে:

(১) সাধারন করোনায় আক্রান্ত রোগীরা কোন ভাবেই নিজে নিজে চিকিৎসা বা প্রতিরোধের জন্য ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট সেবন করবেন না। ডেক্সামেথাসন সেবন আপনার মৃত্যুর কারন হতে পারে।

(২) ডেক্সামেথাসন শুধু মাত্র সিভিয়ার কোভিড রোগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করতে হবে। যেসব ICU তে ভর্তি সিভিয়ার রোগীর ARDS ডেভেলপ করেছে ও সাইটোকাইন স্টোর্ম রেসপন্স দেখা দিয়েছে এই ওষুধটা তাদের ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র কর্যকরী এবং ব্যবহার্য্য।

খারাপ খবর হচ্ছে, মিডিয়াতে RECOVERY ট্রায়ালের খবর প্রচারিত হওয়ার মাত্র ১০ ঘন্টার মধ্যেই ঢাকার সব ওষুধের দোকান থেকে ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট হাওয়া! পাবলিক সব ওষুধ কিনে ফেলেছে। এই মহামারীতে এই ওষুধ খেয়ে মরার আগেই সরকারের উচিত ব্যাপক ভাবে প্রচার চালানো যাতে করে সাধারন মানুষ আইভারমেকটিনের মত ডেক্সামেথাসনও খাওয়া শুরু না করে।

লেখক : ডা. খন্দোকার মেহেদি আকরাম সিনিয়ার সহযোগী গবেষক শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

সর্বাধিক পঠিত