প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : কোভিড-১৯ এর সময় বাংলাদেশ বেতার

ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : বেতারের ব্যাপারে আমার ধারণা বরাবরই কিছুটা নেতিবাচক, বরং বলা উচিত নেতিবাচক ছিল। পঁচাত্তরের পনের আগস্ট ভোরে বেতারে প্রচারিত খুনির দম্ভোক্তি কিংবা একাত্তরের ছাব্বিশ মার্চ বেতারে একটি ঘোষণা পাঠের সূত্র ধরে পাঠকের ঘোষক বনে যাওয়া আর তা নিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যে অন্তহীন বিভ্রান্তি, সেসব থেকেই বোধ করি বেতার শুনলেই সেই কবে থেকেই ভেতরে-ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি হতো!

বেতারের সাথে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ অবশ্য খুবই সাম্প্রতিক। অনেকদিন ধরেই অনলাইন বা মূলধারার এই দুই ধরনের মিডিয়াতেই স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো বেশ জনপ্রিয়। আর করোনাকালেতো কথাই নেই। বেতারও তার ব্যতিক্রম নয়। ডাক্তারদের মিডিয়ায় বিচরণ তাই এখন নিত্যই। সেই সুবাদে আমিও মাঝেসাঝেই ডাক পাই মিডিয়ায় এবং ইদানীং বেতারেও। আর এই যাওয়ার সুবাদেই বেতারকে কাছ থেকে দেখার এবং সত্যিকারের বেতারকে চেনার সুযোগটা আমার হয়েছে।

বেতারে স্বাস্থ্যবিষয়ক যে অনুষ্ঠানটায় এখন আমার মাসে দু-একবার যাওয়া হয়েই যায়, অন্যান্য মিডিয়ার মতো এখানেও সুযোগ আছে শ্রোতাদের সংযুক্ত হওয়ার। টেলিভিশনে যেমন দর্শক যুক্ত হন ফোনে কিংবা ফেসবুক লাইভে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে এখানেও তেমনি আসতে থাকে আগ্রহী শ্রোতাদের ফোন। আসতেই পারে, আসারই কথা। প্রশ্নটা সেটা নয়। অবাক হই যখন শুনি ফোনগুলো কোথা থেকে আসছে।

ফোন আসে উড়িরচর থেকে, আসে পঞ্চগড়ের বোদা কিংবা নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকেও। এবং দেশের প্রত্যন্ততম অঞ্চলের মানুষগুলোর যে প্রশ্ন তাতেও থাকে অদ্ভুত সৃজনশীলতার ছোঁয়া আর চিন্তার গভীরতা। সর্বশেষ যেদিন বেতারে সংযুক্ত হলাম একজন জানতে চাইলেন, সাবানে হাত ধুয়ে করোনাভাইরাস যায় ভালো কথা, কিন্তু সাবান থেকে ভাইরাসটি ছড়ায় কিনা। আগে একদিন একজন প্রশ্ন করেছিলেন পুকুরে গোসল করার সময় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার উপায়টা কী? এমনি ধরনের প্রশ্ন আসলে উত্তর কী দেব, বিস্ময়বোধ কাটতেইতো কেটে যায় অনেকটা সময়।

আমার জানা ছিল না যে সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য বেতার শ্রোতা ক্লাব। এদেশের গ্রামে-গঞ্জে আছে এমনি সাত হাজারেরও বেশি ক্লাব আর একেকটি ক্লাবের সদস্য সংখ্যা কমপক্ষে পঞ্চাশ। ভাবা যায়? আর এসব ক্লাবের নামগুলোও অসাধারণ। আলোর দিশা, সোনার বাংলা থেকে শুরু করে অমুক বেকারত্ব বিমোচন সমিতি কিংবা তমুক স্বনির্ভরতা আন্দোলন ইত্যাদি। বেতার থেকে বের হতে-হতে এসব নিয়ে যখন ভাবি তখন বুঝি বেতারের ব্যাপ্তি আর আমাদের সমাজে এর গভীরতা। বুঝি কেন পনের আগস্টের ভোরে ঘাতকরা তাদের দম্ভোক্তি প্রচারের জন্য বেছে নিয়েছিল শাহবাগকে, রামপুরাকে না। আর কেনই বা বেতারের ঘোষণাকে বেছে নেয়া হয়েছিল জাতিকে বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার হিসেবে।

যত ভাবি ততই ধারণাটা স্বচ্ছ হয়। মনের ভেতরে আর কোনো খচখচানি থাকে না। বরং বেতারের প্রতি অসম্ভব ভালোলাগার একটা অনুভূতিতে মনটা ছেয়ে যায়। সাথে তাতে কিছুটা শ্রদ্ধাও। এই বেতারের কারণেই বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণ পৌঁছে গিয়েছিল লক্ষ বাঙালির ঘরে। পঁচিশ মার্চের কাল রাত্রিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটিও বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন এই বেতারের মাধ্যমেই।

আম্পানে যেদিন তছনচ হলো উপকূল, সেদিনও সংযুক্ত ছিলাম বাংলাদেশ বেতারে। একদিকে যখন উপকূলীয় জেলাগুলোর জেলা প্রশাসকরা জানাচ্ছিলেন তাদের প্রস্তুতির কথা, তেমনি পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফোনে সরাসরি সংযুক্ত হচ্ছিলেন শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো। বিষয়টি অন্তত আমার কাছে একেবারেই অভাবনীয় মনে হচ্ছিল। দেশের দুর্গমতম অঞ্চলের দুর্যোগ প্রস্তুতির এমন তাৎক্ষণিক চিত্র অন্য কোনোভাবে পাওয়া সম্ভব বলে সেই মুহূর্তে আমার কাছে মনে হয়নি।

কদিন আগেও ঢাকার অধুনালুপ্ত জ্যামে গাড়িতে বসে এফএম রেডিও শুনতে-শুনতে প্রায়ই ভাবতাম বোধহয় জ্যামের সময়টুকু পার করার জন্যই পৃথিবীতে এই এফএম রেডিওর জন্ম হয়েছে। ধারণাটা ধাম করে বদলে গেল করোনা আসার কদিন আগে কক্সবাজারে গিয়ে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে মাঠে কাজ করছেন এমনকিছু স্বেচ্ছাসেবকদের একটি ওয়ার্কশপে রিসোর্স পারসন হিসেবে যোগ দিতে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার আমন্ত্রণে সেবার আমার কক্সবাজার যাওয়া। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম এফএম রেডিওর অন্য চেহারা। রোহিঙ্গাদের মাঝে শিক্ষা-দীক্ষার প্রসার আর সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে এফএম রেডিও। আছে বাংলাদেশ বেতার, সাথে একাধিক বেসরকারি এফএম রেডিও-ও।

আজকে যখন মূলধারার ইলেকট্রনিক মিডিয়া আর ফেসবুকনির্ভর দেশের রাজধানী, তার আশপাশ আর দেশের প্রধান শহরগুলো একে-একে কোভিডের হটস্পট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, অথচ কোভিড নাই এফএম রেডিও নির্ভর কুতুপালং আর বালুখালিতে, ঢাকার মানুষের যখন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখায় প্রায়ই নিরাসক্তি, পঞ্চগড়ের জনৈক ব্যক্তির সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ তখন সাবান থেকে কোভিড সংক্রমণের শঙ্কায়।

এসব নিয়ে ঘাটতে গিয়ে মনে হয় অত্যাধুনিক সব গ্যাজেট নির্ভরতায় আমরা আমাদের সবচাইতে শক্তিশালী প্রচার মাধ্যমটাকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাতে ভুলে যাচ্ছি নাতো? প্রশ্নটা মাথায় আসে হঠাৎই! এবং তারপরই বুঝি কেন ‘ওদের’ হাতে পড়ে জয়বাংলা যখন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ বেতারও কেন তখন রেডিও বাংলাদেশ।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। এবং সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত