প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিল্লির ইতিহাস রক্তের উপর গড়া

শেখ মিরাজুল ইসলাম : ভারতে নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে বিজেপির যে সকল পা-ারা মসজিদে আগুন দিলো, জাফরাবাদ এলাকায় দাঙ্গা বাঁধিয়ে ১৩ জন মুসলমান নাগরিক হত্যা করলো, তাদের সঙ্গে আমাদের দেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর বা নাসিরনগরের মন্দির ভাঙা ধর্মান্ধ মুসলমানদের আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। ধর্মীয় সন্ত্রাসের চরিত্র অভিন্ন। হাজার বছর ধরে দিল্লি ধর্মের এই রক্তক্ষয়ী লড়াই দেখে আসছে। আগামীতেও দেখবে। দিল্লি শেষবার হিন্দু-শিখ দাঙ্গায় ক্ষত হয়েছিলো ১৯৮৪ সালে। কেবলমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস এই জন্য এককভাবে দায়ী নয়। ধর্ম এক্ষেত্রে রাজনীতির জ্বালানি।
আফগানিস্তানের বামিয়ানে বুদ্ধ মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, পাকিস্তানে খৃস্টান ও হিন্দুদের উৎখাত করে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, ভারতে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হলো, গুজরাট-সুরাটে চিহ্নিত করে মুসলমানদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো। একইভাবে বাংলাদেশেও প্রতি বছর পূজামন্ডপ ভাঙাভাঙ্গি হয়, হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করা হয়। মিডিয়াতে এক কলামে ছোট করে খবর আসে। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে রামুতে বৌদ্ধ মন্দির লুট করা হয়েছিলো।
এই ঘটনাগুলো প্রতিদিন ঘটে না। পরিকল্পনামাফিকভাবে এসব ঘটানো হয় এবং এর পেছনে থাকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। দিল্লিতে যা ঘটছে তার সঙ্গে অবশ্য আমাদের দেশের পরিস্থিতির বড় দাগে পার্থক্য রয়েছে। জানা গেছে, দিল্লির সাম্প্রতিক দাঙ্গায় মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আহত হয়েছেন এনডিটিভির পাঁচজন সাংবাদিক। দিল্লির উত্তর-পূর্ব অন্চলের দলিত হিন্দুরা পাহারা দিয়েছে আক্রান্ত মুসলমান এলাকা। মুঘল বাদশাহ আওরঙজেবের আমল থেকে চলে আসা মুসলমানদের সঙ্গে রেষারেষি ভুলে শিখ সম্প্রদায় তাদের প্রতিবেশী মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুলে দিয়েছে গুরুদুয়ারা। অবশ্য আমাদের দেশে কোথাও কোথাও নির্যাতিত হিন্দুদের রক্ষায় মাদ্রাসা শিক্ষক-ছাত্রদের এগিয়ে আসার নজিরবিহীন নমুনা রয়েছে। তবে দিল্লির দাঙ্গা রোধে সাধারণ ভারতীয়রা যা করছে তা কি আমরা অতীতে সম্মিলিতভাবে করতে পেরেছি? অথচ পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখবো অনেক ভালো উদহারণ দিল্লির সুশীল সমাজ স্থাপন করছে। দিল্লির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আম আদমি পার্টির কেজরী আগরওয়াল ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা। মোমবাতি জ্বালিয়ে শান্তির আহবান জানাচ্ছে সাধারণ দিল্লিওয়ালারা। এনডিটিভি দাঙ্গার সংবাদ টানা সম্প্রচার করে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। অন্যান্য মিডিয়াগুলো মনগড়া সংবাদ প্রচার না করে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরছে। সরকারের কঠোর সমালোচনায় মুখর হচ্ছে।
দিল্লির গোকলপুরীতে দাঙ্গায় যে ক’জন পুলিশ আন্তরিকভাবে দাঙ্গাবাজদের প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন তাদের মধ্যে নিহত হয়েছেন পুলিশ কনস্টেবল রতন লাল। পুলিশ বাহিনী অনুধাবন করছে সরকারের পেটোয়া বাহিনী হওয়ায় কোনো সম্মান নেই। এখন তারা দ্বিগুণ তৎপর হয়েছে এই ঘটনার পূণরাবৃত্তি রোধে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদী সরকার দাঙ্গা আরও উস্কে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করতে পারে সুরাটের দাঙ্গার মতো। কারণ দিল্লির গরিব মানুষের মহল্লা-গলিগুলোতে ধর্মীয় সম্প্রীতি মেঘ-বৃষ্টি-রোদের মতো। রাজনীতি তাদের জীবন যাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে নাগরিকত্ব আইন সুরাহা না হলে রক্ত আরো ঝরতে পারে। মোদী-অমিত শাহদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত এর সাফল্য-ব্যর্থতার উপর নির্ভর করবে। তারপরও দিল্লি তার বহুমাত্রিকতার জন্য এখনো টিকে আছে। অসুরের উত্থানে সেখানে সুরের উদ্ভব হয়। মুখে যাই বলি না কেন, ভারতীয় সুশীল সমাজের মতো আমরা এদেশে শক্তি রাখি কিনা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ঠেকাতে? কিংবা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরতে? ভাগ্য ভালো, এমন পরিস্থিতি আমাদের বড় দাগে মোকাবেলা করতে হয়নি। সম্ভবত আমরা দিল্লি-মুম্বাই থেকে অনেক বেশি শান্তিপ্রিয়। তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বাংলা কখনো দিল্লি- লাহোর-কাবুল’কে অনুসরণ করেনি। বরং রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মুঘল-পাঠান-আফগানদের। সুতরাং মনে-প্রাণে চাই দিল্লির ঘটনা দিল্লিতেই থাকুক। আমরা বরং ওদের ভুল থেকে কিছু শেখার চেষ্টা করি। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত