প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভুল পরিকল্পনায় নির্মাণ হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন

নিউজ ডেস্ক : সাধারণত ৫০ বা ১০০ বছরের চাহিদার কথা মাথায় রেখে গ্রহণ করা হয় পরিকল্পনা। আর বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার আশা। তবে বাংলাদেশে এ চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষেই ধরা পড়ে ত্রুটি। সেগুলো সংশোধনের জন্য আবার নেয়া হয় প্রকল্প। এতে অপচয় হয় সম্পদ ও সময়ের। এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ কয়েকটি অবকাঠামো নিয়ে অনুসন্ধান করে জানা গেছে বিভিন্ন বিভিন্ন তথ্য। শেয়ার বিজ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প নেয়া হয় ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। ২০১০ সালের মধ্যে তা শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয় ২০১৭ সালের জুনে, যদিও এক যুগ ধরে চলা এ প্রকল্পে রয়ে গেছে নানা ত্রুটি। আবার নির্মাণশেষেই এর উপরিভাগে দেখা দিয়েছে ফাটল। এজন্য মহাসড়কটি মেরামতে নেয়া হয়েছে নতুন প্রকল্প।

নির্মাণশেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষ হতে যাচ্ছে চার লেনের মহাসড়কটির সক্ষমতা। এজন্য ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে নির্মাণ করতে হবে এক্সপ্রেসওয়ে। এজন্য পৃথক প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণশেষে প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এতে বলা হয়, মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের সময় ডিজাইন ম্যানুয়ালে ট্রাফিক (যান চলাচল) গ্রোথ ধরা হয়েছে আট শতাংশ হারে। যদিও সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরে মহাসড়কের ডিজাইন গ্রোথ ১০ শতাংশ ধরার নির্দেশনা রয়েছে। আর ২০১৭ সালেই মহাসড়কটিতে ট্রাফিক গ্রোথ দাঁড়ায় ১১ শতাংশ।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প গ্রহণকালে মহাসড়কটিতে যানবাহন চলাচল করত দৈনিক গড়ে সাড়ে ১৬ হাজার, ২০৩০ সালে যা ৬০ হাজারে পৌঁছানোর কথা। এটিই মহাসড়টিতে যানবাহন চলাচলের সর্বোচ্চ সক্ষমতা।

যদিও ২০১১-১৫ সাল অর্থাৎ পাঁচ বছরে গড়ে আট-দশ শতাংশ হারে গাড়ি চলাচল বেড়েছে মহাসড়কটিতে। এতে ২০১৫ সালেই মহাসড়কটিতে যানবাহন চলাচল দৈনিক ৪০ হাজারে পৌঁছায়। আর ২০২০ সালে মহাসড়কটিতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা দৈনিক গড়ে ৬০ হাজার ছাড়াবে। অর্থাৎ চলতি বছরই মহাসড়কটির সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সওজ ম্যানুয়াল ও রোড নোট ৩১-এ মহাসড়কের ডিজাইন লাইন ২০ বছর নির্ধারণের পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ এড়ানোর জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ডিজাইন লাইফ ১০ বছর ধরা হয়েছিলো। এতে সড়কটির বিভিন্ন স্তরের পুরুত্ব কমিয়ে আনা হয়।

এদিকে মহাসড়কটিতে ২০১৬ সালের বার্ষিক গড় দৈনিক গাড়ি চলাচল মোতাবেক সিঙ্গেল এক্সেল লোডের মান ধরা হয়েছিলো ১৩ কোটি ৩০ লাখ। কিন্তু ২০১৭ সালে এর গড় ট্রাফিক গ্রোথ ১১ শতাংশ। এতে বার্ষিক গড় দৈনিক গাড়ি চলাচল মোতাবেক সিঙ্গেল এক্সেল লোডের মান দাঁড়ায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ। এছাড়া অনেক সময় মহাসড়কটিতে অতি ভারবহনকারী যানবাহন চলাচল করে।

আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, মহাসড়কটির প্রস্থ হার্ড শোল্ডার দেড় মিটার, পেভমেন্ট সাড়ে সাত মিটার ও আইল্যান্ড পাঁচ মিটার। সড়কের পেভমেন্ট থেকে হার্ড শোল্ডার দু-চার ইঞ্চি নিচু। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। সড়কের সারফেসে (উপরিভাগ) ফাটল আছে ও সারফেস উঁচুনিচু। আর মিডিয়ানে (সড়ক বিভাজক) আইল্যান্ড ভাঙা। বৃক্ষের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা হয় না।

এদিকে প্রকল্পটির মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয়নি, কারণ রাস্তার দু’পাশে জনগণের চলাচলের জন্য ফুটপাত নেই। ধীরগতির ও স্থানীয় গাড়ি চলাচলের জন্য পৃথক কোনো লেনের (সার্ভিস লেন) ব্যবস্থা নেই। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আন্ডারপাসের ব্যবস্থা নেই, পর্যাপ্ত রোড সাইনও নেই। এতে চালকদের অসতর্কতায় চার লেন হওয়ার পরও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, মহাসড়ক দুই থেকে চার, চার থেকে ছয় বা আট লেনে উন্নীতকরণ কখনোই সমাধান নয়। উপরন্তু এদেশে বিদ্যমান মহাসড়কের পাশে বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রভৃতি রয়েছে। দ্রুতগতি ও ধীরগতির যানবাহনকে চলতে হয় পাশাপাশি। এতে কখনোই যানবাহন কাক্সিক্ষত গতিতে চলাচল করতে পারে না। এজন্য টেকসই সমাধানের পথে যেতে হবে। মহাসড়কে লেনের সংখ্যা না বাড়িয়ে এক্সপ্রেসওয়ে বা এক্সেস কন্ট্রোলড সড়ক নির্মাণ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে রেলপথকেও দ্রুত উন্নত করতে হবে। এতে সড়কপথে যানবাহনের চাপ কমবে। ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ এখন তা-ই করছে।

মহাসড়কটির রক্ষণাবেক্ষণে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্পের স্থায়িত্বের জন্য রাস্তার দু’পাশে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা এবং যেসব জায়গায় ভেঙে গেছে তা সঠিকভাবে মেরামত করা, ভারী যান চলাচলের জন্য উপযোগী করে রাস্তা তৈরি করা, সড়কের গুণগত মান ঠিক রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা ও ধারণক্ষমতার অধিক ভারবাহী যান চলাচল নিষিদ্ধ করা। এছাড়া সড়কের এজিংগুলো যাতে সরে না যায় তা নিয়মিত তদারকি, সংযোগ সড়কগুলো ভালোভাবে পাকা ও কার্পেটিং করা এবং দুর্ঘটনা ও যানজট কমানোর জন্য রাস্তার উভয় পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণের সুপারিশও তুলে ধরা হয়।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে মেরামতের জন্য ৭৯৩ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। গত বছর অক্টোবরে এ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এর বাইরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ছয় লেন বিশিষ্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা করা হয়েছে।

এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ হাজার যানবাহন চলাচল করত। ২০২০ সালে তা ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ২০৩০ সালে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮৫ হাজার। এক্ষেত্রে বিদ্যমান মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা হলেও খুব বেশি দিন এর সুবিধা পাওয়া যাবে না। এছাড়া মহাসড়কটিতে মাসে গড়ে ২০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ মহাসড়কে রয়েছে ৯০টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট। এক্ষেত্রে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণই একমাত্র সমাধান।

এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা।

উল্লেখ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পরে তা তিন দফা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮১৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তবে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৩৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় কম করা হয়।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত