প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনায় আক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প

আমাদের সময় : করোনা ভাইরাসে দেশের কারও এ পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া না গেলেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে দেশের অনেক বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলোর মধ্যে সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্পও রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, চীনা প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারিতে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোয় ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এগুলোর প্রত্যাশিত অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা ভাইরাস। এভাবে চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যেই অগ্রগতির হারে উদ্বেগজনক মাত্রার পতন ঘটবে।

যদিও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, প্রকল্পগুলোয় এখনো করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের হুবেইপ্রদেশের রাজধানী উহানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি দেশটির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের সর্বাধিক মানুষের এ দেশটিতে সরকারের হিসাবেই করোনা ভাইরাসে ৪২৫ জন মারা গেছে, আক্রান্ত হয়েছে ২০ হাজার। শুধু তাই নয়, আফ্রিকা ছাড়া বিশ্বের সব মহাদেশ মিলিয়ে অন্তত ২৪টি রাষ্ট্রে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। এটি খুবই স্পর্শকাতর একটি ভাইরাস। এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা আছে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর নিরাময়ের ওষুধ এখনো পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।

পদ্মা সেতু, পদ্মা রেলসংযোগ, কক্সবাজার-দোহাজারি রেলরুট, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ দেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক প্রকল্পে চীনের ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও শ্রমিক যুক্ত আছেন। গত ২৫ জানুয়ারি শুরু হয় চৈনিক নববর্ষ বা বসন্ত উৎসব। এ উৎসব উদযাপনকালে চীনের প্রায় ২০টি শহরের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এ উৎসবে যোগ দিতে বাংলাদেশে কর্মরত চীনা নাগরিকদের অনেকেই ছুটি নিয়ে নিজ দেশে গিয়েছিলেন। তাদের ছুটির মেয়াদ শেষ হলেও কাজে যোগ দিতে পারছেন না। কারণ সে ক্ষেত্রে তাদের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের মধ্যেও করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে যায়। তাই তাদের ছুটির মেয়াদ বরং বাড়ানো হচ্ছে। আর যারা ছুটি কাটিয়ে ইতোমধ্যে ফিরে এসেছেন, তাদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পদ্মা সেতু। অগ্রাধিকারভিত্তিক এ প্রকল্পে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১১শ কর্মী নিয়োজিত পদ্মা সেতুর কাজে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীনা নাগরিকদের ওপর নজরদারি বেড়েছে। অনেককে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। ছুটিতে যাওয়া সে দেশের নাগরিকদের ছুটি আরও বাড়ানো হয়েছে। এটি তাদের দীর্ঘতম ছুটি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ছুটি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করছেন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের বলেন, পদ্মা প্রকল্পে কর্মরত ১১শ চীনা নাগরিকের মধ্যে কমপক্ষে আড়াইশ ছুটিতে আছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ৩ দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ হিসাবে ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ করার টার্গেট নিয়ে এগিয়ে চলছে এ প্রকল্পের কাজ। কিন্তু প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ২০২২ সালের আগে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব। এমন অবস্থায়ও করোনা ভাইরাসের কারণে চীনা নাগরিকদের অনেককে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে। ছুটিতে থাকা শ্রমিক-প্রকৌশলীদের আরও পরে দেশে ফিরতে বলা হয়। বর্তমানে পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল অবকাঠামোর অগ্রগতি ৮৫ দশমিক ৫০ শতাংশ বলা হলেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ের প্রতিবেদন বলছে ৭৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

এদিকে পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের কাজ এমনিতেই অনেক পিছিয়ে আছে। চীন সরকারের অর্থায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পে ৮৫৫ জন চীনা কর্মী যুক্ত। এর মধ্যে ৩৬৬ জন ছুটিতে গিয়েছিলেন চৈনিক নববর্ষ উদযাপনে। ১৬ জন ফিরে এসেছেন, আরও ৯৭ জন ফিরতে পারেন। কিন্তু ২৫০ জনকে বাংলাদেশে আপাতত ফেরার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে এ প্রকল্পের অগ্রগতি ২২ শতাংশ।

পদ্মা রেলসংযোগ প্রকল্পের পরিচালক গোলাম ফখরুদ্দিন এ. চৌধুরী বলেন, পদ্মা সড়ক সেতু যেদিন চালু হবে, সেদিন থেকে ট্রেনও চলবে। সেই লক্ষে এগিয়ে চলছে কাজ। তবে চৈনিক নববর্ষে চীনে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন যারা, তাদের আপাতত দেশে আনা হচ্ছে না।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনপর্ব। আগামী মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে উদ্বোধন করার কথা। প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম জানান, চীনা স্টাফরা এ প্রকল্পে যুক্ত। তবে ভাইরাসের প্রভাবে অনেক কর্মীকে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়। এর জেরে উদ্বোধনপর্ব পিছিয়ে যেতে পারে।

পটুয়াখালী জেলার পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে চীন থেকে ছুটি কাটিয়ে দেশে ফেরা ২০ চীনা নাগরিককে কোয়ারেন্টাইন করে রাখা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মী। তবে তাদের কারও মধ্যে এখন পর্যন্ত ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ নেই। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩২০ মেগাওয়াট বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, যা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে পরিচিত। সেখানে মোট ৬ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৭০০ জন চীনা প্রকৌশলী ও শ্রমিক। এর মধ্যে ৩ হাজারের অধিক কর্মী ছুটিতে রয়েছেন চীনে। সহসা তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার (রামু) রেললাইন প্রকল্পে অন্তত ৮০ চীনা নাগরিক সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ৩১ জন ছুটিতে গেছেন চীনে। তাদের আজ ৫ ফেব্রুয়ারি ছুটি শেষে ফেরার কথা। তার আগে প্রকল্প কার্যালয়ের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়, আপাতত দেশে না ফিরতে। তার মানে এসব কর্মীর অনুপস্থিতিতে কাজে কিছুটা প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। তবে সবার আগে দেশের স্বার্থ ও শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পটিও বাস্তবায়ন হচ্ছে চীনা অর্থায়নে দেশটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। স্বাভাবিক কারণে প্রকল্পেও কাজের প্রভাব দেখা দিয়েছে। সেখানেও অন্তত প্রায় আড়াইশো কর্মীর মধ্যে ৭০ জন ছুটিতে রয়েছেন। এ প্রকল্পের পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, সবার আগে দেশের স্বার্থ। ছুটিতে থাকা বা ছুটি বাড়ানোর কারণে হয়তো কাজে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবু চেষ্টা করা হচ্ছে কাজ এগিয়ে নিতে। চীনে ভাইরাস সংক্রমণের কারণে আমাদের প্রকল্পের কাজে আপাতত গতি কমতে পারে। যদিও এখনই এটি বলার সময় আসেনি।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন ঢাকা বাইপাস রোড উন্নয়ন প্রকল্পেও চীনা কর্মী রয়েছেন। এ প্রকল্পে কর্মরত ৫০ চীনা নাগরিকের মধ্যে মাত্র দুজন বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছেন। এ মাসের শুরুতে তাদের ফিরে আসার কথা ছিল। তবে এ পরিস্থিতিতে তাদের প্রত্যাবর্তন বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত