প্রভাষ আমিন : অনেকে বলছেন, বিএসএফ তো নিরীহ বাংলাদেশিদের গুলি করছে না। যারা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বা চোরাচালান করতে যায় বিএসএফ শুধু তাদেরই গুলি করে। কিন্তু অবৈধভাবে গেলেই গুলি করতে হবে কেন? বিএসএফ তো চাইলে তাদের আটক করতে পারে বা প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া শুধু গুলি করে নয়, বিএসএফের হাতে নির্যাতনে মৃত্যুর সংখ্যাও কম নয়। তার মানে বিএসএফের লক্ষ্য পরিষ্কার। তারা হত্যাই করতে চায়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। তার চেয়ে বড় কথা হলো চোরাচালান তো শুধু বাংলাদেশিরা একা করে না। ভারতীয়রা তো এতে জড়িত। ভারতের গরুগুলো তো একা একা হেঁটে হেঁটে সীমান্তে আসে না। নিশ্চয়ই ভারতের কেউ না কেউ গরু বা অন্যান্য পণ্য সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। বিএসএফ তাদের ধরে না কেন? বাংলাদেশের বাজারের জন্য ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় ফেনসিডিল কারখানা গড়ে উঠার খবরও তো সবার জানা। সীমান্তে পাখিরমতো গুলি করে বাংলাদেশিদের মারার আগে ভারত সরকারের উচিত তাদের দেশের চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
তবে সাধারণ মানুষের কথা ধরে লাভ কী? সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি নওগাঁর পোরশা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে তিন বাংলাদেশি নিহত হন। এই এলাকার সংসদ সদস্য খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। এই হত্যার ঘটনায় তার ক্ষোভে ফুঁসে উঠার কথা। নিজের এলাকার মানুষকে রক্ষা তার দায়িত্ব। কিন্তু ঘটেছে উল্টো ঘটনা। সাধন চন্দ্র মজুমদার বরং বিএসএফের হত্যার পক্ষেই যুক্তি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘আসলে আমাদের চরিত্র যদি ভালো না হয়, পরের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কেউ যদি জোর করে কাঁটাতারের বেড়া কেটে গরু আনতে যায় আর ইন্ডিয়ার গুলি খেয়ে মারা যায়, তার জন্য দায়-দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকার নেবে না’। তার বক্তব্য শুনে আমি বিস্ময়ে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলাম।
বিশ্বাসই হচ্ছিলো না সাধন চন্দ্র মজুমদার আসলে কোন দেশের মন্ত্রী। নিজের এলাকার মানুষের জন্য যার প্রাণ কাঁদার কথা, সেই তিনিই কিনা ভারতের হত্যার পক্ষে সাফাই গাইছেন। খাদ্যমন্ত্রীর কাছে আমার প্রশ্ন, আপনার এলাকার মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত এলাকায় যায় কেন, তারা কেন চোরাচালান করে, কেন ভারত থেকে গরু আনে? মানুষ নিশ্চয়ই আর কোনো উপায় না পেয়ে পেটের দায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তে যায়। তার মানে আপনি আপনার নির্বাচনী এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারেননি। ব্যর্থতাটা আসলে আপনার। বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী বা বিএসএফ যাই বলুক, সীমান্ত এলাকায় মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ অবৈধ কিছু করলে তাকে আটক করে আইনের হাতে তুলে দেওয়াই তাদের কাজ, গুলি করে মেরে ফেলা নয়। শুরুতেই গত এক যুগে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন উচ্চতার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সম্পর্কের এই উচ্চতার সঙ্গে সীমান্তে হত্যার পরিসংখ্যান বড্ড বেমানান। বন্ধুত্বের উষ্ণতা রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের একার নয়। বন্ধুত্বটা যদি কেউ মিন করেন, তাহলে এক্ষুণি সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি চাই। সীমান্ত হোক শূন্যমৃত্যুর এবং সবার জন্য নিরাপদ। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ফেসবুক থেকে