প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বঙ্গোপসাগরে জোরালো হচ্ছে চীনের উপস্থিতি

নিউজ ডেস্ক : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রবল চাপে থাকা মিয়ানমারের সঙ্গে ৩৩টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার করেছে চীন। এ চুক্তিগুলোর মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (স্পেশাল ইকোনমিক জোন, সংক্ষেপে এসইজেড) উল্লেখযোগ্য। কালের কণ্ঠ

প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের’ মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সঙ্গে চীন সংযুক্ত হচ্ছে। এর ফলে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে সাগরপথে চীনের বাণিজ্য রুটের বাইরেও মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছার পথ পাচ্ছে চীন। এটি তার জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যকে অনেক সাশ্রয়ী ও সুসংহত করবে। গতকাল শনিবার সই হওয়া চুক্তিগুলোর আওতায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে চীনের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডের (বিআরআই)’ অধীন। অর্থাৎ চীন তার বিআরআই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো এগিয়ে গেল। বিশেষ করে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি বাড়ল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউয়ে চীনের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ফলে সিতুয়ে ভারত নির্মিত বন্দরের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে নতুন করে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর পশ্চিমা অনেক দেশই মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ওই দেশটির ওপর চীনের প্রভাব আরো বাড়বে বলে ধারণা করেছিলো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক বলেন, আশি-নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত রেখেছিলো। আর সেই সুযোগে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে চীন। এবারও তাই হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলো যখন মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে তখন চীন তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে এবং চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ উদ্ধারে তা কাজে লাগছে।

চলতি দশকের শুরুর দিকে মিয়ানমারে গণতন্ত্রায়ণ শুরুর পর সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে আগ্রহী ছিলো পশ্চিমা দেশগুলোও। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিও পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ সফর করে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা চালিয়েছেন কিন্তু রোহিঙ্গা জেনোসাইড ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান ওই সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মিয়ানমার সফরের প্রাক্কালে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ফলে মিয়ানমার পথচ্যুত হয়েছে। কেবল চীনই মিয়ানমারকে কর্দমা থেকে তুলে আনতে আগ্রহী।’

ওই নিবন্ধে আরো বলা হয়েছে, ‘কিছু ঝড়ঝাপটার পর মিয়ানমার বুঝতে পেরেছে যে মানবাধিকার ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী নীতি আছে। আর এর পরই মিয়ানমার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য আবারও চীনের দিকে ফেরা শুরু করে।’

গত ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) রোহিঙ্গা জেনোসাইডের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুনানির প্রাক্কালে নেপিডো সফর করেছিলেন চীনের স্টেট কাউন্সেলর ওয়াই ইং। আগামী বৃহস্পতিবার ওই আদালতে রায়ের প্রাক্কালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং মিয়ানমার সফর করেছেন।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই। তারা পরস্পরের স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার হিসেবে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। আর এ কারণেই চীন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থেই এটি করেছে।

তিনি বলেন, চীন মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করছিলো। চীন মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে তার বাণিজ্যের বড় অংশ মিয়ানমারের ভেতর দিয়েই করতে চায়। বিশেষ করে, তার পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো থেকে চীন সাগর, মালাক্কা প্রণালি হয়ে যাতাযাতে দূরত্ব অনেক বেশি। মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা চীন সব সময়ই কমাতে চায়। এ নিয়ে আগে থেকেই কথাবার্তা হচ্ছিলো। এখন এটি আরো এগোচ্ছে।

মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল যে চীন বড় আকারের বিনিয়োগ নিয়ে মিয়ানমারে আসবে। আমার মনে হয়, তারই অংশ হিসেবে এবারের সফরটি হয়েছে।’

চীনের এই উপস্থিতি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কী প্রভাব ফেলবে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, তিনি এখনো ভারতের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া দেখেননি। বঙ্গোপসাগরে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের স্বার্থই সবচেয়ে বেশি।

তিনি বলেন, আমেরিকানরা তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিকল্পনার আওতায় চীনকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় তা এখনো স্পষ্ট নয়। আরেকটি বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অসংগতি। তারা কখন কী করবে বোঝা যাচ্ছে না। মিয়ানমারে চীনের প্রকল্পগুলোর ফলে নিঃসন্দেহে বঙ্গোপসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মতৎপরতা বাড়বে। তবে ক্ষমতা কতটা বাড়বে সেটা এখনই বোঝা যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক জবাবদিহির উদ্যোগের ব্যাপারে চীনের আপত্তি থাকলেও ওই দেশটি প্রত্যাবাসন শুরুর পক্ষে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার মিলে এ সংকট সমাধান করুক—এটিই চাইছে চীন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমাধান মিলবে না বলেই বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয়র পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তৎপরতা চালাচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত