প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চাঁদাবাজিতে ‘স্পুফিং’ অ্যাপস

যায় যায় দিন : স্পুফিং নামের একটি অ্যাপস ব্যবহার করে শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয়ে নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু করেছে সংঘবদ্ধ প্রতারকরা। এই অ্যাপসের মাধ্যমে দেশে বসে ফোন করা হলেও তাতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মোবাইল ফোন নম্বর উঠে আসছে। সম্প্রতি কয়েকজন আমলা এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে এ ধরনের ফোন কল আসার পর তা তদন্ত করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দারা এ তথ্য পেয়েছেন।

তাদের তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে, প্রতারক ওই চাঁদাবাজ চক্র নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে টেলিগ্রাম ও টর নামের আলাদা আরও দুটি অ্যাপস ব্যবহার করছে। ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গোয়েন্দারা সহজে তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এসব প্রতারক চাঁদাবাজ চক্রের সন্ধানে নেমেছে পুলিশ।

তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার হওয়ায় বিষয়টি হালকাভাবে নেয়নির্ যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। এ জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ইন্টারপোলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সম্প্রতি চিঠি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘ডার্ক’ নামে একটি ওয়েবসাইট এসব অ্যাপস সংগ্রহ করায় সেটিও বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি সেল।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এক সময় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য ছিল এমন কিছু ছিঁচকে সন্ত্রাসী টার্গেটকৃতদের নাম-ঠিকানা ও মেবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। এরপর তারা মোবাইল ফোন দিয়ে অ্যাপসের মাধ্যমে কল করে চাঁদা দাবি করছে। এক্ষেত্রে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। দলের কারাবন্দি ক্যাডারদের ছাড়ানো, অসুস্থ ক্যাডারদের চিকিৎসা এবংর্ যাব-পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ সহযোগীদের সাহায্যের কথা বলা হচ্ছে। এতে কিছু মানুষ ভয়ে টাকা-পয়সা দিয়ে দিচ্ছে। আবার অনেকে সাহস করে পুলিশের কাছে আসছেন। এসব বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে বেশির ভাগ ফোনকলে ব্যবহার করা হয়েছে নতুন অ্যাপস।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয়ে ফোন করে যদি বলা হয়, আমার লোকজন জেলে আছে, তাকে ছাড়াতে টাকা লাগবে বা আমার দুইজন ক্যাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছে অথবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছে, তাদের চিকিৎসরা জন্য টাকা লাগবে- তাহলে সেই ফোনটি শতভাগ ভুয়া। প্রকৃত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কোনো অজুহাত দেখায় না।

তিনি বলেন, এসব প্রতারক চাঁদাবাজ শত শত অ্যাপস তৈরি করেছে। ওই অ্যাপসের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে বসে ফোন করলেও দেখা যায়, ইন্ডিয়া থেকে ফোন করেছে। না হয় কানাডা। এটা ধরা কঠিন। কারণ এই অ্যাপস থেকে কেবল তারা টার্গেটকৃত ব্যক্তির সঙ্গেই কথা বলেন। এর বাইরে আর অন্য কোনো লোকের সঙ্গে ওই অ্যাপস ইনস্টল করা ফোন দিয়ে কথা বলেন না। এদের সবাই প্রতারক। এসব প্রতারক চক্রের সদস্যরা বেশির ভাগ অবস্থান করে ফরিদপুরের ভাঙ্গা, আলফাডাঙ্গায়, ভোলায়। তারা আগে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিম ব্যবহার করত। এখন তারা অবস্থান পালটে আধুনিক হয়েছে। এখন অ্যাপসের সাহায্যে তারা কল করে। স্কোফিং-এর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন দেশের নাম্বার ও কোড ক্লোন করে এসব অপকর্ম করছে। এ চক্রকে গ্রেপ্তার করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন গোয়েন্দা পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

জানা গেছে, সুব্রত বাইন পরিচয়ে গত ২৭ নভেম্বর রামপুরা চৌধুরী পাড়ার বাসিন্দা ও পুস্তক ব্যবসায়ী আজহারুল ইসলামী ফরাজীকে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ফোন করে বলা হয়, আশুলিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় তার দুই ক্যাডার আহত হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। ১৪ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ টাকা ম্যানেজ করলেও আরও চার লাখ টাকা প্রয়োজন। এই টাকা না দিলে তার সন্তানদের অপহরণ করা হবে। ওই দিন আরও দুই দফায় +০০৯১৮০১৭৮২২৭২৫ নম্বর থেকে ফোন করা হলেও ব্যবসায়ী আজহারুল ভয়ে ফোন ধরেননি। বিষয়টি তিনি ওই দিনই খিলগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ এবং অক্টোবরের শুরুতে রাজধানীর খিলগাঁও পলস্নীমা সংসদের সাধারণ সম্পাদকসহ ১৯ জনের কাছে ফোন করে চাঁদা দাবি করা হয়। তারা হচ্ছেন, পলস্নীমা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাফিজুর রহমান ময়না, আজীবন সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সহসভাপতি ওয়াকিল উদ্দিন আহমেদ নীলু, জাহিদ হোসেন জাহিদ, মঈদ উদ্দিন আনোয়ার আহমদ দুলু, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মাহাবুব জামান পান্না, সাধারণ সম্পাদক আওয়াল কামরুজ্জামান ফরিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন কবির বাবু, এএফএম মোজাম্মেল হক স্বপন, সম্পাদক (ক্রিকেট) সাজ্জাদুল হক পারভেজ, ক্রীড়া সম্পাদক জালাল উদ্দিন শিক্ষা সম্পাদক শাহ রাফিউল কবির শাকিল, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক সোলায়মান খান, সেমিনার সম্পাদক কাজী জন্নুর খোকন। এ ঘটনায় গত ৩ অক্টোবর খিলগাঁও থানায় জিডি করেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু এরপরও তাদের কাছে চাঁদা চেয়ে একের পর এক ফোন আসতে থাকে। তারা বিষয়টি নিয়ে আবারও পুলিশের শরণাপন্ন হন। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন পরিচয়ে গত ২৩ এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাৎ পরিচয়ে ২৫ নভেম্বর টাকা চেয়ে দুই দফায় প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে সাংবাদিক আরিফুর রহমান দোলনকে। দুইটি ঘটনাতেই নিজের নিরাপত্তা চেয়ে রাজধানীর রমনা মডেল থানায় জিডি করেছেন দোলন। এসব ঘটনার তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও সাইবার সিকিউরিটি সেলের সদস্যরা। তদন্তের একপর্যায়ে দেখা যায় দেশের ভেতরে বসেই এসব কল করা হয়েছে। কারণ এসব এক্ষত্রে যে মোবাইল ব্যবহার করা হয়েছে তার আইএমই নাম্বার বাংলাদেশে নিবন্ধিত এবং ওই মোবাইল ফোন থেকে অ্যাপসের মাধ্যমে কল করা হয়। ওই ফোন থেকে শুধু টার্গেটকৃতদেরই কলা হয়। এর বাইরে তারা আর কারো সঙ্গেই যোগাযোগ করে না। এ কারণে তাদের গ্রেপ্তার করতে বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশের।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে সাম্প্রতিক চাঁদাবাজির ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানতে চাওয়া হয়। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের তদন্তের অগ্রগতি জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, এক শ্রেণির প্রতারক চক্র এসব কর্মকান্ডে জড়িত।

উলেস্নখ্য, ২০০১ সালে ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আটজন এখন কারাগারে আছেন। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এবং ‘গণপিটুনী’তে নিহত হয়েছেন দুইজন। পলাতক ১৩ জন ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, দুবাই, থাইল্যান্ড এবং কানাডায় অবস্থান করছেন। পলাতকদের মধ্যে শাহাদাত, জিসান, মোলস্না মাসুদ, শাহিন, সুব্রত বাইন, আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর, হারিস, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস এবং বিকাশ কুমার বিশ্বাসের নামেই বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত