প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোন অনুভূতির দেশ গড়বে আওয়ামী লীগ?

 

আশীষ চক্রবর্ত্তী : আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের আগে। তাই বাংলাদেশে অনেক আওয়ামী লীগারকে বিএনপি বা জাতীয় পার্টির হতে দেখেছি। আবার বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বামদল, এমনকি জামায়াত থেকেও কারও কারও রাতারাতি আওয়ামী লীগার হওয়ার কথা জেনেছি। এমন দলবদল অকারণে হয় না। শুধু আদর্শ যে কারণ নয়, তা কে না জানে। আদর্শিক কারণে তো ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পরই আওয়ামী লীগ নেতাদের একটা অংশ হত্যাকারী আর হত্যার নেপথ্যের কুশীলবদের সঙ্গে হাত মেলাতে পারে না। একদিন-দুদিনে তো নতুন আদর্শের উদয় হয় না। তারা নিশ্চয়ই প্রাণ-মান বাঁচাতে বা ক্ষমতার অংশ হতেই উদগ্রীব ছিলেন। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস বা আদর্শের জোর তাদের ছিলো না। তাই আপোস করেছেন। আপোস যারা করেননি, তাদের মধ্যে চার নেতাকে জেলের ভেতরেই হত্যা করা হয়েছে। ওই চার নেতার চেয়ে ছোট নেতাদের অনেকেও আপোস করেননি। তোফায়েল আহমেদসহ অনেকে তাই দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন।

তাই বলে কি ‘৭৫-এর ৪৪ বছর পরও ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন-নির্যাতন থেকে বাঁচতে আপোস করতে হবে? না করলে কখনো ছাত্রলীগ, কখনো পুলিশ, কখনো মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ হামলা চালাবে? এভাবে যদি ক্ষমতায় টিকে থাকা যেতো তাহলে তো পঁচাত্তরে লাশ আর রক্তের উপর দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিলো, তারা বা তাদের অনুসারীরাই এখনো গদিতে থাকতো, শেখ হাসিনা হয়তো আর দেশে ফিরতে না পেরে, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফেরানো অসম্ভব মেনে হতাশায়, গ্লানিতে মুষড়ে পড়তেন। বাস্তবে তো তা হয়নি। বাস্তবে চাটুকার, ষড়যন্ত্রকারী মোশতাক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, মোশতাকের পর সেনাছাউনি থেকে ক্ষমতায় আসা প্রথম শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলও শেষ হয়েছে অগণতান্ত্রিক উপায়ে।

বঙ্গবন্ধুর মতো জিয়াউর রহমানকেও হত্যা করেছে কতিপয় সেনা সদস্য। তারপরও ক্ষমতায় ছিলো বিচারপতি সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। পর্দার আড়ালে সব ‘ম্যানেজ’ করে সেই সরকারকে সরিয়ে তারপর এরশাদ শুরু করেছেন স্বৈরাচারী শাসন। মোশতাক আর জিয়াউর রহমানের মতো এরশাদেরও বন্ধুর অভাব হয়নি। এখনকার বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ তখন ৭১-এ ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকার স্মৃতি ডায়েরিতেই রেখে এরশাদের তথ্যমন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হয়েছেন। আরও কে কে তখন স্বৈরাচারী এরশাদের ‘বন্ধু’ ছিলেন তা অনেকেরই এখনো মনে আছে। মনে আছে, এক বাম নেতা এরশাদের মন্ত্রী হয়ে বলেছিলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বললে আমি রাজপথ ঝাড়ু দিতেও রাজি’। এ নিয়ে সাপ্তাহিক যায় যায় দিন-এ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হয়েছিলো। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো, ‘আমি তব রাজপথের হবো ঝাড়ুদার’। প্রতিবেদনটি পড়ে খুব হতাশ হয়ে, খুব বিস্ময় নিয়ে ভেবেছিলাম আদর্শ ছুড়ে ফেলে বাম নেতাও এভাবে স্বৈরাচারী শাসকের ‘ভৃত্য ঝাড়ুদার’ হতে পারে। ক্ষমতালোভী মানুষ ডান হলে পারে, বাম হলেও পারে। বঙ্গবন্ধুর আমলে পেরেছে, মোশতাকের আমলে পেরেছে, জিয়াউর রহমানের আমলে পেরেছে, খালেদা জিয়ার আমলে পেরেছে, এখন শেখ হাসিনার আমলেও পারছে। দল বদল করা, বিপরীত আদর্শের ঝা-া হাতে নেয়া সবাই যে ক্ষমতালোভী তা আমি বলছি না।

দুয়েকজন আছেন, যারা লড়াইয়ের বড় প্ল্যাটফর্ম পেতে বা অন্য কোনো রাজনৈতিক কারণে বাম থেকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নেতা হয়েছেন। তারা সংখ্যায় খুব কম বলে তাদের ধর্তব্যে রাখছি না। তবে এমন দুয়েকজন বাকিরা সুখের পায়রা ছিলো, বেঁচে থাকতেই এরশাদ তা বুঝেছেন। ক্ষমতায় থাকতে যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের দমন করেছেন, ভোটের নামে প্রহসন করেছেন, ‘৯১, ‘৯৬, ২০০১, ২০০৭-এর নির্বাচন শেষে একজন-দুজন করে যেতে যেতে এক সময় অনেক সহযোদ্ধাই হয়ে গেছেন প্রতিপক্ষ। ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলটাকে ধরে রাখার জন্য লড়েছেন। দমন-পীড়ন এড়াতে কিংবা ক্ষমতার ভাগ নিতে একসময় এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করেছেন বলে জনশ্রুতি আছে। নিকটাত্মীয়ের বিরোধী পক্ষে যোগ দেয়াও নতুন কিছু নয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যে তার ভায়রার ছেলে শেখ শহীদুল ইসলাম এরশাদের মন্ত্রী হয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপির বিরুদ্ধে অনেক হুঙ্কার দিয়েছেন। এখন জাতীয় পার্টির দাপট নেই, শেখ শহীদুল ইসলামের সেই হুঙ্কারও নেই।

বাংলাদেশে দমন-পীড়ন, ভোট কারচুপি, রাজনৈতিক হত্যা, গুম, দুর্নীতি সব আগেও হয়েছে। সময়ের ফেরে, ক্ষমতার হাত বদলে হয়তো কৌশলটা শুধু বদলেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাত্রাও বেড়েছে। তাই বলে কি এসব চলতেই থাকবে? ক্ষমতায় গেলে বেশিরভাগ শাসক বা শাসক দল তা-ই চায়। গণতান্ত্রিক দেশে চাইলেও তা পারা যায় না। আপাত গণতান্ত্রিক বা একেবারে অগণতান্ত্রিক দেশে দমন-পীড়ন, ভোট কারচুপি, হত্যা, গুম চালিয়ে একাধিক মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা গেলেও একসময় পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তন আসে। তবে বাংলাদেশ তো আফ্রিকার কোনো দেশ নয়, পৃথিবীও সেই যুগে পড়ে নেই যে তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা রবার্ট মুগাবে বা তার মতো অন্য কারও দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলেই কয়েক মেয়াদ টিকে থাকা যাবে। অনুভূতির দাম না দিয়ে দেশ চালাবে আওয়ামী লীগ? রাষ্ট্রের দমন কৌশল, জনতার মিছিলে পুলিশের গুলি : সরকারবিরোধী প্রতিবাদ কিংবা মিছিলে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনা বারবার ঘটেছে বাংলাদেশে।

এরশাদের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশ গুলি করে ছাত্রদের হত্যা করে। এমন ঘটনা অব্যাহত ছিলো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও। ২০০৬ সালে কানসাটে বিদ্যুতের দাবিতে গণবিক্ষোভে ২০ জন নিহত হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়Ñএটি একটি অনুভূতি। খুব প্রশংসিত হয়েছিলো তার এই বক্তব্য। সৎ এবং দৃঢ়চেতা রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফের কথায় যুক্তিও ছিলো। কিন্তু এখন একই কথা বলতে গেলে তার কণ্ঠের সেই জোর থাকতো কিনা সন্দেহ। বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়েছে। বিরোধীরা আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা কল্পনায় নিয়ে সব নাকচ করতে চাইলেও ভুলে গেলে চলবে না যে, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ধারার প্রশংসা করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগই যে করছে, তা-ও এখন কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির আগাম অভিযোগ, চোখ রাঙানি সব উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার দেশের টাকায় পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এটাও সত্য। আরও কিছু সাফল্য আছে বর্তমান সরকারের।

কিন্তু পাশাপাশি দুর্নীতি, কারচুপির নির্বাচন, বিরোধীদের দমন-পীড়ন ইত্যাদিও আছে। আরও আছে ছাত্র লীগ, যুব লীগ, শাহজাহান খানদের বাড়াবাড়ি।
ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে, কয়েকজনকে আটক করে যুবলীগের উৎপাত আপাতত নিয়ন্ত্রণ করলেও ছাত্রলীগ এখনো বেপরোয়া। অবশ্য সরকারের ভালো কাজগুলো অন্য কিছু লোকের কারণেও প্রায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত রাজাকারের তালিকা প্রকাশ। তড়িঘড়ি করে বড় কিছু করে দেখানোর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর আরও সুনজরে আসার চেষ্টা বা মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধার অনুভূতির ঘাটতির কারণে যে তালিকাটি প্রকাশ করা হয়েছিলো, তাতে রাজাকারের চেয়ে মুক্তিযোদ্ধাই ছিলো বেশি। জানতে ইচ্ছে করে, মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মন্ত্রীদের অনুভূতি নিয়েই যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ এমন মন্ত্রীদের নিয়ে দুর্নীতি, দমন-পীড়ন বন্ধ না করে কোনো অনুভূতির দেশ গড়তে চায়? লেখক : ডয়চে ভেলে

সর্বাধিক পঠিত