প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উদারনৈতিক বাংলাদেশ যাঁর স্বপ্ন

এম. নজরুল ইসলাম : একটি কবিতা লিখেই বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন তিনি। বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম সোপান বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন স্পর্শ করেছিল তাঁকে। লিখেছিলেন এক অমর কবিতা। অমর সুরকার আলতাফ মাহমুদের সুরে তা আজ গীত হয় বিশ্বজুড়ে একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে। একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে, ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে এভাবেই নিজেকে যুক্ত করে ফেলেছিলেন তিনি। বাঙালী চিরদিন স্মরণ করবে এই গানটি। আর স্মরণ করবে এই গানের গীতিকার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে। সে কারণেই তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। যত দিন বাঙালী জাতি টিকে থাকবে, একুশের প্রভাতফেরি হবে, প্রভাতফেরিতে গীত হবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। আজ সারা বিশ্বে গানটি গাওয়া হয়। বিশ্বের নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে গানটি। গাওয়া হয়েছে। বেরিয়েছে রেকর্ড। বাঙালীর জন্য এ এক অনন্য অর্জন।

ইতিহাসের সাক্ষী তিনি, সঙ্গীও। ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জš§, এই ইতিহাসের অনেক কিছুরই তিনি সাক্ষী। জšে§ছিলেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি প্রয়াত হাজি ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী তাঁর বাবা, মা জোহরা খাতুন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালে যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন ১৯৫৬ সালে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশে সেলিব্রেটি সাংবাদিকের সংখ্যা হাতে গোনা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সেই স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিকের একজন, যার কলামের অপেক্ষায় থাকে দেশের বেশিরভাগ পাঠক। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কলামে যে মত প্রকাশ করেন, তার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই হয়তো মতের মিল হবে না। কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কী ভাবছেন, তা জানার আগ্রহ পাঠকদের আছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতবাদের মানুষও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলাম পড়ে সমান আগ্রহে।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে শুধুই একজন সাংবাদিক কিংবা কলাম লেখকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যাবে না। নন্দিত কথাশিল্পী তিনি। একাধারে লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস। লিখেছেন গান ও কবিতা। তাঁর পাঠকনন্দিত ছোটগল্পের বই ‘সম্রাটের ছবি’। পেয়েছেন ইউনেস্কো পুরস্কার। ভূষিত হয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারেও। পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর পাঠকপ্রিয়তা। অসাধারণ এক কথক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। শব্দ বয়নের অসামান্য দক্ষতায় তিনি পাঠককে টেনে নিয়ে যান। সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। লেখাকে অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন তিনি। পাঠকের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা পান, এ কথা বলেন প্রায়ই। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিয়ম করে লিখতে বসেন। লেখা তাঁর কাছে সাধনার মতো। লেখার আগে ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে ফোন করে জেনে নেন সর্বশেষ খবরটি। যে কারণে বিদেশে থাকলেও তাঁর কলামে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ পাওয়া যায়।

শৈশবে, যখন থেকে একুশের প্রভাতফেরিতে যাচ্ছি, তখন থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয়। তাঁকে চিনি কলেজজীবন থেকে। চিনি বলতে দূর থেকে দেখেছি। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন স্কুলজীবনেই। স্কুলের পাঠ নিতে নিতেই নিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির পাঠ। আধুনিকমনস্ক মানুষটি মননে প্রগতিশীল। তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। আজও সমান প্রতিবাদী তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে তাঁর কলম। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়েছেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তাঁর কলাম সৃষ্টি করেছে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যাঁর লেখালেখির শুরু, তিনি আজ সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী সৃজনশীল মানুষটির নাম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।

আজ তাঁর ৮৫তম জš§বার্ষিকী। মধ্য আশিতেও আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সমান সক্রিয়। নিয়মিত লিখছেন তিনি। পাঠককে জোগান দিচ্ছেন চিন্তার খোরাক। আরও অনেক দিন লিখবেন তিনি, সক্রিয় থাকবে তাঁর কলম ও চিন্তার জগৎ- জন্মদিনে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তাঁর মতো প্রগতিশীল মানুষকে আমাদের খুব প্রয়োজন। অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে তাঁকে চাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাবাহী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কলম আরও অনেক দিন সক্রিয় থাকবে, জš§দিনে এটাই আমাদের চাওয়া। শুভ জš§দিন গাফ্ফার ভাই। আপনি দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং

অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক
সূত্র : জনকণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত