প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রামে অরক্ষিত বধ্যভূমি

আমাদের সময় : চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি, সম্মুখযুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। জেলা প্রশাসকের উৎসাহে বেসরকারি পর্যায়ে গঠিত চট্টগ্রাম বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটির তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি ওই তালিকার কাজ হয়। প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী নগরসহ জেলায় বধ্যভূমির সংখ্যা ১১০টি। সম্মুখযুদ্ধের স্থান ১০৯টি। প্রশিক্ষণ শিবির ১৩টি। তবে তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সব জায়গার সঠিক তথ্য আসেনি।

অনেক জায়গায় শহীদের তালিকা, কোনো-কোনো বধ্যভূমির স্থান তালিকায় আসেনি। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে করা এক তালিকায় চট্টগ্রামে বধ্যভূমির স্থান দেখানো হয় মাত্র ৩১টি। এর মধ্যে অনেক বধ্যভূমির ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে মন্তব্য করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এবারের তালিকা আরও সমৃদ্ধ। এটি আরও পর্যালোচনা করে জনমত যাচাই করা হবে। নতুন কোনো মতামত বা তথ্য পাওয়া গেলে তা অন্তর্ভুক্ত করে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।

নতুন তালিকায় সবচেয়ে বেশি বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে আগ্রাবাদ সার্কেলে (ডবলমুরিং, বন্দর, পাহাড়তলী, হালিশহর ও পতেঙ্গা এলাকা) ৩০টি। দ্বিতীয় সদর সার্কেলে (কোতোয়ালি) রয়েছে ২১টি এবং তৃতীয় চান্দগাঁও সার্কেলে রয়েছে ১২টি বধ্যভূমি। এ ছাড়া ফটিকছড়িতে ১০, আনোয়ারায় সাত, সাতকানিয়া ও মিরসরাইয়ে পাঁচটি করে, বোয়ালখালীতে চার, রাউজানে তিন, চন্দনাইশ, রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালী, সীতাকু-ে দুটি করে এবং পটিয়া, হাটহাজারী, বায়েজিদ, হালিশহর ও পাহাড়তলীতে (খুলশি) একটি করে বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্যের কমিটিতে সরকারের উপসচিব জাফর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকের হোসাইন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (ভূমি হুকুম দখল) ছাড়াও আইনজীবী, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সংস্কৃতিকর্মী এবং ভূমি প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা আছেন।

কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তালিকা তৈরিতে উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার, ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সহযোগিতা করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চিহ্নিত করে দেওয়া স্থান স্থানীয় ভূমি কার্যালয় থেকে পরিমাপ করে জায়গার দাগ-খতিয়ান, মালিকানা ও ভূমির প্রকৃতি উল্লেখ করে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম জেলার বধ্যভূমির সংখ্যা, সেগুলো কী অবস্থায় আছে, সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব কিনা- এসব তথ্য চেয়ে একটি তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে চাওয়া হয়। এ সম্পর্কে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি তালিকা ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

২০০৫ সালে সরকারিভাবে তৈরি তালিকায় বধ্যভূমির সংখ্যা ও স্থান দেখানো হয় ৩১টি। এর মধ্যে অনেক বধ্যভূমির ব্যাপারে নির্দিষ্ট বা বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই বলে মন্তব্য করা হয়। তালিকায় পটিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, ডবলমুরিং ও চান্দগাঁওয়ে কোনো বধ্যভূমির উল্লেখ নেই।

নগরসহ চট্টগ্রামের চিহ্নিত বধ্যভূমি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্থানগুলো সংরক্ষণ এবং এতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ নিয়ে জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এসব স্থানের এক-তৃতীয়াংশ কোনো না কোনো ব্যক্তির। বাকি স্থানগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন।

ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক স্মৃতিস্থানের ওপর ইতোমধ্যে দোকান, বাড়িসহ নানা স্থাপনা তৈরি হয়েছে। যেগুলো খালি বা খোলা অবস্থায় আছে, সেগুলোর দখলসংশ্লিষ্ট মালিকরা ছাড়তে চাইছেন না। সংশ্লিষ্ট জায়গা সংরক্ষণ করতে হলে হয় হুকুম দখল করতে হবে, নয়তো মালিকদের বুঝিয়ে দখল নিতে হবে। তবে হুকুম দখলের ক্ষেত্রেও মামলার ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে ফয়’স লেক বধ্যভূমির স্থান নিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। দীর্ঘদিন মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকায় সেখানে প্রস্তাবিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মালিকানাধীন জায়গাগুলোর দখল ছাড়ার ব্যাপারেও নানারকম আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করে স্মৃতিস্তম্ভ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

বিভিন্ন ভূমি কার্যালয় থেকে দাগ খতিয়ান উল্লেখ করে যে তালিকা তৈরি করা হয়, তাতে দেখা যায়- বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম গোমদ-ী বধ্যভূমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন। জায়গাটির বড় অংশ খালের সঙ্গে মিশে গেছে। একই এলাকার আরেকটি বধ্যভূমির মালিক কধুরখীল বালিকা বিদ্যালয়। দুই বধ্যভূমির কোনোটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সামনে অ্যাপোলো ফার্মেসির পেছনের বধ্যভূমিতে প্রায় ১৫০ জনকে গণকবর দেওয়া হয়। ওই জায়গাটিও ব্যক্তিমালিকানাধীন। লালখানবাজার ও চকবাজার এলাকায় দুটি গণকবরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও চট্টগ্রাম শহরের বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের সঠিক চিত্র উঠে আসেনি। চিহ্নিত হয়নি চূড়ান্তভাবে। ফলে যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। মাত্র তিনটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে-পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে সদর দপ্তর, হালিশহর মধ্যম নাথপাড়া ও পাহাড়তলী বধ্যভূমি।

এ পর্যন্ত শহরে বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের সংখ্যা চিহ্নিত করা হয়েছে ৯৩টি। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে ৬৩টি।

বধ্যভূমির ব্যাপারটা এখন অনেকেই চেপে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মারাও গেছেন অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা লোকজন। যে কজন বেঁচে আছেন, তারাও এখন এসব ব্যাপারে কথা বলতে চান না। ফলে অনেক বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের প্রকৃত তথ্য অজানাই থেকে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামে বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্র সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয় গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। তখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জেলা প্রশাসককে বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সময় কাজ কিছুদূর এগিয়েও যায়। কিন্তু সরকার বদল হওয়ার পর তা থমকে যায়। এর পর এবার মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে এ প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় নগর ও জেলার বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের একটা তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসন। ওই তালিকাটা এখনো চূড়ান্ত নয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহর চট্টগ্রামের নির্যাতনকেন্দ্র ও বধ্যভূমি বইয়ের লেখক সাখাওয়াত হোসেন লিখেছেন- একাত্তর সালে অনেক স্থানে নির্যাতনকেন্দ্র ছিল। নির্বিচারে বাঙালিদের খুন করা হয়েছে এ রকম অসংখ্য স্থান রয়েছে। সব সংরক্ষণ করা জটিল ব্যাপার। তাই জেলা প্রশাসনের কাছে আমার প্রস্তাব ছিলÑ শহরের সবচেয়ে বড় পাহাড়তলী বধ্যভূমি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে এতে বাকি বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের একটি তালিকা দিয়ে দেওয়া হোক। জেলা প্রশাসন এ প্রস্তাবে রাজিও হয়েছিল। কিন্তু পরে আর তা হয়ে ওঠেনি।

মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শী লোকজনের বর্ণনা মতে, নগরের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি পাহাড়তলী। সেখানে অসংখ্য বাঙালিকে জবাই করা হয়। অথচ এ বধ্যভূমি সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতার শেষ নেই।

অধ্যাপক ড. গাজী সালেহউদ্দিন বলেন, ‘হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন এটি বধ্যভূমি। এখন সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হয়েছে দিকনির্দেশনার জন্য। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। এ ছাড়া বর্তমানে পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে নামমাত্র যে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, মূল বধ্যভূমি সেখান থেকে আরও ৫০-১০০ গজ ভেতরে। এখন যেখানে স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে, সেখানে ছিল পানির ছড়া।’

বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের সঠিক চিত্র উঠে না আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখনো সঠিকভাবে বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বেসরকারিভাবে উঠে আসা ৯৩টির বাইরেও বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্র আছে, যা যথাযথ অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসবে।

চিহ্নিত বধ্যভূমির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- পাহাড়তলী ফয়’স লেক (বর্তমান চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্রের বিপরীতে), হালিশহর মধ্যম নাথপাড়া, মহামায়া ডালিম ভবন (ডালিম হোটেল), চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস, চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম (বর্তমান এমএ আজিজ স্টেডিয়াম), চট্টগ্রাম সেনানিবাস, গুডস হিল, রেডিও ট্রান্সমিশনকেন্দ্র কালুরঘাট, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পতেঙ্গা, সার্সন রোডের পাহাড়ের ওপরের বাংলো, হোটেল টাওয়ার (জামালখান সড়ক), হোটেল দেওয়ান (দেওয়ানহাট মোড়), চন্দনপুরা রাজাকার ক্যাম্প, পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট, হাজিক্যাম্প, বন্দর আর্মিক্যাম্প (বর্তমান বন্দর থানার পাশে), দক্ষিণ বাকলিয়া মোজাহের উলুম মাদ্রাসা (মিয়াখাননগর), চরচাক্তাই নদী ও খালের পার, আমবাগান রেলওয়ে ওয়ার্কশপ, ঝাউতলা বিহারি কলোনি, শেরশাহ বিহারি কলোনি, পাকিস্তান বাজার ক্যাম্প (বর্তমান বাংলাবাজার), ফিরোজ শাহ বিহারি কলোনি, হালিশহর বিহারি কলোনি, এয়ারপোর্ট সেনাক্যাম্প (প্রকাশ কামালটিলা) ইত্যাদি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত