প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নুরুলের দুর্নীতিতে ‘লজ্জিত’ দুর্নীতির অভিযোগে পদ হারানো রাব্বানী

প্রথম আলো : সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হকের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগে ‘লজ্জিত’ ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধিরা। এ অভিযোগে ডাকসুর ভিপি পদ থেকে নুরুলের পদত্যাগ দাবি করেছেন দুর্নীতির অভিযোগে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ হারানো ডাকসুর জিএস (সাধারণ সম্পাদক) গোলাম রাব্বানীসহ ২৩ জন ছাত্র-প্রতিনিধি।

আজ রোববার দুপুরে ডাকসুর সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে ছাত্রলীগের ডাকসু প্রতিনিধিরা নুরুলের পদত্যাগের দাবি জানান। ডাকসুর ভিপি নুরুল হকের ‘টেন্ডারবাজি, তদবির–বাণিজ্য ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের’ প্রতিবাদে নিন্দাজ্ঞাপন, ভিপি পদ থেকে নুরুলকে পদত্যাগের আহ্বান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য জানাতে এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর জিএস ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ হারানো গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘ডাকসুর সর্বোচ্চ পদ যেটি, ভিপি পদ, নুরুল হক সেটিকে স্পষ্টভাবেই বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করেছেন। আমরা তার প্রমাণও পেয়েছি—তাঁর অডিও ফোনালাপ, ভাইরাল হওয়া ভিডিও। আমরা ডাকসু পরিবার এই অপকর্মের দায়ভার নিতে রাজি নই। আমাদের আহ্বান, ডাকসুর ভিপি পদকে আর বিতর্কিত না করে নুরুল যেন অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করেন। তিনি যদি পদত্যাগ না করেন, আমরা ডাকসুর সভাপতির প্রতি আহ্বান জানাই, নৈতিক স্খলনের কারণে তিনি যেন নুরুলকে ডাকসুর ভিপি পদ থেকে বহিষ্কার করেন।’

এ সময় নুরুলের একটি ভিডিও সাংবাদিকদের দেখান গোলাম রাব্বানী। সেখানে ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদারকে নুরুল বলছেন, ‘ডাকসু ভিপির জন্য মাত্র ১৩ কোটি টাকা কোনো বিষয় নয়। কত ১৩ কোটি টাকা আসবে-যাবে!’ রাব্বানী বলেন, ‘যে–কারও নামে অভিযোগ উঠতে পারে। অভিযোগ নিয়ে আমাদের কথা নেই। নুরুলের ক্ষেত্রে আমরা যেহেতু কিছু দালিলিক প্রমাণ পেয়েছি, তার নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।’

গত মার্চে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে গোলাম রাব্বানীর প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে তাঁকে নিয়মবহির্ভূতভাবে এমফিলে ভর্তির সুযোগ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এটি নৈতিক স্খলন নয় কি—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাব্বানী বলেন, ‘এটা নিয়ে ইতিমধ্যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হয়েছে, তদন্ত হয়েছে। আমি যে নিয়ম মেনেই ভর্তি হয়েছি, সেটা স্পষ্ট হয়েছে। এমফিলে ভর্তির কাগজপত্র যথাসময়েই আমি বিভাগে জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু বিভাগের দীর্ঘসূত্রতার কারণে যথাসময়ে তা জমা হয়নি। আমি যথাসময়েই জমা দিয়েছিলাম। সুতরাং এখানে আমার কোনো ব্যর্থতা বা দায়বদ্ধতা নেই। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়নি। একটা অভিযোগ উঠেছিল, যা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিয়ম আছে, তা আমার জানার কথা নয়। সঠিক সময় ও মুহূর্তে আমি আমার সঠিক কাজটি করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে তাদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে, সেটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে চাঁদাবাজির যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছিল, সে বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে রাব্বানী তাঁর কোনো জবাব দেননি। এই প্রশ্নের জবাব দেন ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরে যা ঘটেছে, তা একটি ছাত্রসংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেটির আলোকে কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গোলাম রাব্বানী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো ফোনালাপ বের হয়নি, তাঁর কোনো পারিবারিক ব্যবসার কথা বলা হয়নি, কোনো আন্টির কথা বলা হয়নি। তবু দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তিনি সংগঠন থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। সেদিক থেকে ভিপি নুরুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি আরও বেশি জোরালো।’

পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে নিজের কথোপকথনের একটি ফাঁস হওয়া অডিও প্রসঙ্গে কথা বলেন রাব্বানী। তিনি বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনায় যে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, তা ওই ফোনালাপে পরিষ্কার হয়েছে। আমি যেহেতু তখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম, আমার একটি ইউনিটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আমি সে বিষয়ে কথা বলেছিলাম। এটি আমার বিষয় নয়, তাদের। তবু অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমি ও আমার সভাপতি অব্যাহতি নিয়েছি। এরপর থেকে আমরা ওই ঘটনার বারবার তদন্ত চেয়েছি, কোনো তদন্ত কমিটি কিন্তু করা হয়নি।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ডাকসুর সদস্য রাকিবুল হাসান।

নিজেকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে হাজির করতে গিয়ে ভিপি নুরুল আজ ‘জাতীয় বেইমানে’ পরিণত হয়েছেন—এমন মন্তব্য করে লিখিত বক্তব্যে রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত ২৩ জন ছাত্র-প্রতিনিধির একক ও যৌথ উদ্যোগে যখন বিভিন্ন বিভাগের উন্নয়ন ফি কমানো, গ্রন্থাগারের সময়সীমা বাড়ানো, একাডেমিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু, শিক্ষার্থীদের জীবনমান ও পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে নিরলসভাবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কর্মযজ্ঞ হচ্ছে, তখন ডাকসুর ভিপি পদটি ব্যবহার করে নুরুল হকের টেন্ডারবাজি, তদবির–বাণিজ্য ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের খবর আমাদের লজ্জিত করে। শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করে নুরুল ডাকসুর ভিপি পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে অবস্থান করছেন। যে প্রত্যাশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা তাঁকে নির্বাচিত করেছিলেন, নুরুল একদিকে তার কিছুই পূরণ করতে পারেননি, জাতির সামনে শিক্ষার্থীদের লজ্জিত করেছেন। গত নয় মাসে ডাকসু ভিপির উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কাজ না হলেও পদটিকে ব্যবহার করে তিনি নিজের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের চেষ্টা করে চলেছেন পুরোদমে। একাধিক টেন্ডার–বাণিজ্য, তদবির–বাণিজ্য, নিয়োগ ও বদলিতে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।’

শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা না বলে নুরুল হক দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন—এমন অভিযোগ করে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘ডাকসুর ভিপি পদ ব্যবহার করে নুরুল কীভাবে জিরো থেকে হিরো হলেন, তা অনুসন্ধানের জন্য গণমাধ্যমকে আহ্বান জানাই। আন্দোলন-আন্দোলন খেলা, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করা, নিজের সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া, ধর্মকে আশ্রয় করে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো, সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকা, ফ্ল্যাট ভাড়া, ব্যয়বহুল হাসপাতালে স্ত্রী-সন্তানের চিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদি জানানোর এখতিয়ার সাংবাদিকেরা এড়িয়ে যেতে পারেন না। নির্বাচিত হওয়ার পর ভিপি নুরুল শিক্ষার্থীদের জন্য কী কাজ করেছেন, নিজের ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন করেছেন, সবাইকে তা জানার সুযোগ করে দিন। সম্প্রতি দুটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার মধ্য দিয়ে নুরুলের স্বরূপ সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করতে করতে নুরুল যে টেন্ডারবাজি, তদবির–বাণিজ্য ও অনৈতিক অর্থ লেনদেন ইত্যাদিতে দক্ষতা অর্জন করেছেন, তা ছাত্রসমাজের সামনে পরিষ্কার হয়েছে। এই ফোনালাপ প্রকাশের পর নুরুলের বিভিন্ন বক্তব্য, বিজ্ঞপ্তি, মন্তব্য ইত্যাদি আমরা গভীরভাবে লক্ষ করেছি। সেখানে তিনি যেভাবে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছেন, তা ছাত্রসমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।’

সংবাদ সম্মেলনে ‘আপামর ছাত্রসমাজের’ পক্ষ থেকে সব ‘অপকর্ম, ব্যর্থতা ও অক্ষমতা’ স্বীকার করে ডাকসুর ভিপি পদ থেকে নুরুল হককে পদত্যাগের আহ্বান জানান ছাত্রলীগের ডাকসু প্রতিনিধিরা। ডাকসুর ভিপি পদকে ‘অপবিত্র’ করা ও ‘অপব্যবহারের অপরাধ’ স্বীকার করে নুরুল যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে তাঁকে ডাকসু থেকে বহিষ্কারের জন্য উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি মো. আখতারুজ্জামানের কাছে আহ্বান জানান তাঁরা। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি আহ্বান, নুরুলের যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা করে ডাকসু তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কলঙ্কমুক্ত’ করা হোক।

গত মঙ্গলবার থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডাকসু ভিপি নুরুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে দুজন ব্যক্তির কথোপকথনের অডিও প্রচারিত হয়। অডিওর ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশিত হয়, ভিপি নুরুল দুর্নীতি করেছেন। তবে ভিপি নুরুল প্রথম থেকে দাবি করে আসছেন, তাঁর কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপের খণ্ডিতাংশ বিকৃতভাবে প্রচার করে তা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর ফলে তাঁর সম্মানহানি ও জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে স্বেচ্ছায় ডাকসু থেকে পদত্যাগ করবেন বলেও ঘোষণা দিয়েছেন নুরুল।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত