প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নূরের চিত্রকর অথবা কবি রনি আহম্মেদ

শায়লা সিমি : নানা অধ্যায়ে যুক্ত জীবন বইয়ের পাতাগুলো, তা খুলে… খুলে জীবন নদী বয়ে চলে চেনা-অচেনা উপকূল পেরিয়ে। এ সকল উপকূলে কখনো শ্রাবণ বর্ষণ আবার দেখি রোদ্দুর কিংবা বৈশাখ! রৌদ্রোজ্জ্বল নানা ঘাঁটি পাই… আলোর ও সন্ধান পেয়েছি! যার সন্ধান করে যান আল্লাহর প্রেমিক আজীবন, আমিও সে আলো সন্ধানী!

এ সন্ধানের একপর্যায়ে দেখেছি সূর্যসন্তানদের ! তাদের মধ্যে আছেন আমার শিক্ষক ও ভাই নায়েব-এ-রাসুল হজরত শাফি মাকসুদ (রা.), আছেন হজরত তাসলিমা বেগম (রা.) … যাদের শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে সামান্য কণা আকাঙ্ক্ষা করার সুযোগ হয়েছে জীবদ্দশায়, আমার মা লুৎফুন্নিসা… তার হাতেই হাত রেখে শেখা … আরও আছেন আলোকিত আত্মা শিল্পী রনি আহম্মেদ, তার শিল্প ও জীবনবোধের যে জ্ঞান তা সার্বিক ও পরিপূর্ণ।

শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্ক তার অণুর, কিন্তু সম্পর্ক বুঝে আলোকিত ক্যানভাসে কীভাবে মননের তুলিতে রং ও আলো ছড়াতে হয় তা জানতে পেরেছি রনি আহম্মেদের সহায়তায়। যে কোনো শিক্ষায় আলো কতটা জরুরি তা আমরা একত্রে অনুধাবন করেছি। আমাদের ছাত্র সমাজ তথা শিক্ষিত সমাজের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে আমরা বর্তমানে টের পাচ্ছি- এই রক্ত আর হাহাকারের দিনে কাজের মাঝে আলো প্রয়োজন, আল্লাহর আলো প্রয়োজন ভাবনার মাঝে।

রনি আহম্মেদ শিল্পের নানা মাধ্যম নিয়ে কাজ করেছেন; গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিশ্বাসী, সত্য সন্ধানী আত্মা তিনি। যেহেতু কিছু বছর ধরে তিনি সুফি সাধনায় আছেন, বর্তমানে যে কারণে তার শিল্পে সুফিজম বা সত্যজ্ঞানের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। যেমন; সৃষ্টির তৃপ্তি দেখেছি তার চোখে, আবার নতুনের অবিরল আকাঙ্ক্ষা বুঝেছি তার মাঝেও। তার সৃষ্টিশীলতার ধারা বরাবর আশ্চর্য করেছে আমাকে। একই সঙ্গে নানা কাজ করতে পারেন এবং সে সব কাজের ফ্লো অসম্ভব… একই সঙ্গে সম্পূর্ণ! তুলিতে তার ভাবনার প্রতিফলন আর কবিতায় শব্দের সে ব্যঞ্জন অভূতপূর্ব। রনি আহম্মেদের মতো আল্লাহর জ্ঞানে আলোকিত আত্মাদের থেকে বরাবরই পৃথিবী বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছে।

রনি আহম্মেদ জন্মগ্রহণ করেন ১২ অক্টোবর ১৯৭১ সালে। যদিও বলেন, যুদ্ধ নিয়ে জন্ম আমার … অথচ জীবনের সকল মুহূর্ত আনন্দে উদ্যাপন তার স্বভাব। সুস্বাদু খাবার তার প্রিয় বিষয়, তিনি এক কৈলাস আর সেখানে মহাদেবের মতি মতোই ভালোবাসার স্রোতোধারা যেন জলপ্রপাতের মতো বইতে থাকে তার হৃদয় ছুঁয়ে। একজন সুফি ও আলোকিত আত্মা সম্পর্কে সঠিক শব্দ ব্যবহারে আমার হাত বাঁধা….. কারণ, পৃথিবীর সকল ভাষা ও অনুভূতির সীমাবদ্ধতা এখানে আমাকে খাটো করে রেখেছে। যা আমায় তৃপ্তি দেবে সে রকম উৎকৃষ্ট শব্দ বিরল!তার জন্মদিনে সহসাধক আমি ও তার বন্ধুদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা স্বরূপ এ লেখাটি রনি আহম্মেদকে উৎসর্গ করছি।

শিল্পের সঙ্গে তার অবিরত থাকা ও তার যাত্রা জানিয়ে দেয়- প্রতি মুহূর্তে সে সৃষ্টির ও সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসার স্রোতে বহমান। রনি আহম্মেদ বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্তর কচ্ছপের ভাস্কর্য করেছেন বাংলাদেশের কক্সবাজারে। তিনি ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পের ধাপে আটকে থাকেননি নানা স্থাপনা পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছেন, কাজ করেছেন দেশে ও বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একক শিল্প ও দলগত শিল্প প্রদর্শনী করেছেন। এখন থাইল্যান্ডে “স্টার গেট অব কাল্ব’ শিরোনামে একটি একক প্রদর্শনীতে তিনি ব্যস্ত আছেন।

রনি আহম্মেদ ও আমাদের দেশে যারা বরেণ্য শিল্পী তাদের কাজের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা লক্ষণীয়। কিন্তু, সুফী আর্টের এ ব্যতিক্রমী ধারার চিত্র অঙ্কনের শুরুটা হয়েছে চট্টগ্রামের শিল্প হাব বিস্তারে অনুষ্ঠিত রনি আহম্মেদের একক প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে। তার পরপর দুটি সুফি ধারার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রদর্শনী করেছে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় বেগম আর গ্যালারিতে, এ প্রদর্শনীতে সুফি ভাবধারার শিল্পী হিসাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন রনি আহম্মেদ।
রনির ভাষায় ছোট হয়ে আসা পৃথিবীর বাইরেও আরও বড় জগৎ আছে, সে জগতের কথা বলেন রনি তার অঙ্কনে কবিতায়। তিনি আরও বলেন, মহাবিশ্ব তার কাজের ক্ষেত্র! আলোর খোঁজ; বহু আগেরই একটি সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা তার, বহু পূর্বে করা কাজগুলোর মধ্যে আমি তা খুঁজে পাই।
তার বিচরণ আছে কবিতায়- নাটক ও গল্পে। তার দুটি কবিতার বই বেগম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে- ‘গোলাপের শব্দ’ ২০১৮সালে এবং ‘নূহের নৌকায় আমাকে শেষ দেখা গেলো’ প্রকাশিত হয়েছে এই বছর। একটি চরিত্র ‘ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স’-এর ওপর ভিত্তি করে চমৎকার মঞ্চনাটক লিখেছেন রনি, সেটা কক্সবাজার মারমেইড থিয়েটারে মঞ্চস্থ করা হয়।

শিল্পক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রথম ‘ভিআর’ প্রোডাকশনটি করেছেন রনি আহাম্মেদ, শিরোনাম ‘সেভেন্থ মোকাম’। এই প্রোডাক্শনটি কোরিয়ান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বেঙ্গল আর্ট ফাউন্ডেশনের সহায়তায় ভারতীয় শিল্প মেলা ২০১৯ এ অংশ নেয়। এবং তার একটি পারফরমেন্স আর্ট ‘কনফারেন্স অব বার্ড’-এ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছি। তার একক প্রদর্শনীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত, যার প্রদর্শনীগুলো এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

রনির ‘কসমিক আর্ক্’ বইটি ২০১৩ সালে ভেনিস বিয়েনালে উৎসবে মোড়ক উন্মোচন করা হয়। তার লেখা একটি ছোট গল্পের সংকলন ‘সেলিমের দুঃখের কাহিনী’ বর্তমানে অনলাইন প্রকাশনা ইপ্রকাশে পাওয়া যায়।

তার প্রত্যেক মুহূর্তই যেন ধার্যকৃত, সৃষ্টির কামনায় সৃষ্টির অবিরাম বর্ষণ! নানা গল্প ফাঁদের রনি কথায় কথায়। কথা যেন মহাকালের ইতিহাস… এমন মুহূর্ত একজন আল্লাহ প্রেমিক বা সুফির জীবনে নাই, যেখানে আল্লাহ ও তার সৃষ্টির প্রেম নাই… রনির জীবনেও ব্যতিক্রম নয়!

একজন আল্লাহর প্রেমিক এক মুহূর্তের জন্যও সৃষ্টিকর্তার রহমত ও সৃষ্টির ধারাকে উপেক্ষায় ফেলেন না! সুফিজম ইনফ্যাক্ট ইজ আ পারপাসফুল লাইফ! জীবন-আচরণে সাধনা ও শিল্পের প্রতিষ্ঠা রনিকে একটি আলোর স্থাপনায় পরিণত করেছে। সৃষ্টিকর্তা তার যে জ্ঞান ভান্ডার রনিকে উপহার দিয়েছেন তা দিয়ে সমাজ ও জগৎ সংসার আলোকিত হোক। সকলে আমরা তার সহসাধক হয়ে নূহের নৌকায় পাড়ি দেব।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত