প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একুশ আগস্ট নিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান কমিশন গঠন আবশ্যক

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: ২০০৪ সালের একুশ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবাদ সভায় যে ন্যক্কারজনক গ্রেনেড হামলা হয়েছিলো সেটির এ বছর ১৫তম বার্ষিকী সবেমাত্র শেষ হলো।

প্রতিবছর দিবসটি সব রাজনৈতিক সচেতন মহল বেশ ক্ষোভ, দুঃখ, যন্ত্রণা এবং হতাশা নিয়েই স্মরণ করে থাকে। ওইদিন গ্রেনেড হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আইভি রহমান গুরুতর আহত হয়ে দু’দিন পর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থক পর্যায়ের ২৩ জন মৃত্যুবরণ করেন। অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হন। গ্রেনেড হামলার মূল লক্ষ্যটি ছিলো আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সেসময়ের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য মানব ব্যুহ তৈরি করে তাকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে কী ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো সেটি সকলেই জানেন। এই হত্যাকাণ্ডকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সঙ্গে সঙ্গেই তৎপর হয়ে উঠে যা সবাইকে হতবাক ও বিস্মিত করেছিলো। সেই রাতে আহত নেতাকর্মীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালে চিকিৎসা না দিয়ে ডাক্তারদের একটি বিরাট অংশ হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। অভিযোগ আছে এরা বিএনপি-জামায়াতপন্থি ডাক্তার। তারা কার নির্দেশে এমন অমানবিক আচরণ করেছিলেন সেটি আজও রহস্যে আবৃত। আমাদের এখন অনেকেই সেটি জানেনও না। অবিস্ফোরিত আর্জেস গ্রেনেড সরকারের বিশেষ সংস্থাগুলো সংরক্ষণ না করে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলো কী কারণে, কার নির্দেশে সেটি এখনো কারও জানা নেই। একটি আর্জেস গ্রেনেড কীভাবে জেলখানায় পাওয়া গেলো সেটিও অজানা থেকে গেছে। সেই রাত থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের দায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আওয়ামী লীগের উপর চাপানোর ঘটনা সবাইকে হতবাক করেছিলো। পরবর্তী দীর্ঘ সময় জামায়াত-বিএনপি জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত একই সুরে এবং একই ভাষায় এই গ্রেনেড হামলার দায় শেখ হাসিনার উপর দিয়ে যাওয়ার প্রচারণায় লিপ্ত ছিলো। এ নিয়ে স্বয়ং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আক্রান্ত শেখ হাসিনার ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়েও নানা রকম মন্তব্য করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ জলিল রমনা থানায় মামলা করতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। সংসদে এই গ্রেনেড হামলা নিয়ে কোনো আলোচনা করতে দেয়া হয়নি। কোনো আহত মানুষের চিকিৎসার জন্য সরকার ন্যূনতম সহযোগিতা প্রদান করেনি। একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। তার তদন্তের ফলাফল শুনে বিচারপতির জ্ঞান-বুদ্ধি কতোখানি নেমে গিয়েছিলো সেটি দেশবাসী জেনেছিলো। সেসময়ে একবারের জন্যও সরকারের দিক থেকে এতোবড় একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের কোনো চেষ্টা করা হয়নি। অধিকন্তু আওয়ামী লীগের দুয়েকজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকে জড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছিলো। দেশব্যাপী তখন বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা একবারের জন্যও তাদের দলীয় নেতৃবৃন্দের শেখানো বুলির বাইরে কথা বলেনি। তারা গ্রাম পর্যায়ে এতোবড় গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে প্রচার করেছিলো। অন্যদিকে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত নোয়াখালীর এক অখ্যাত যুবক জালালকে জজ মিয়া সাজিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের এক ফিরিস্তি দেয়ার চেষ্টা শুরু করেছিলো। প্রায় দুই বছর এই নাটক বাংলাদেশে মিডিয়ায় সংবাদ হিসেবে অনেকেই দেখেছিলেন। ১/১১ পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। জজ মিয়া নাটক মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়। গণমাধ্যমে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে সত্য উদ্ভাসিত হতে থাকে। সেই সত্য হলো তৎকালীন সরকারের মদদেই এমন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিলো। একুশ আগস্টে গ্রেনেড হামলার মামলা নতুন করে তদন্ত শুরু হয়। সেই তদন্ত পুনঃতদন্তের মাধ্যমে আদালতে বিচারের জন্য উপস্থাপিত হয়। আদালত এরই মধ্যে রায় দিয়েছে। এই মামলার আসামি ছিলেন ৪৯ জন। যাদের মধ্যে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন দেয়া হয়েছে। এছাড়া তারেক রহমান এবং হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জনকে মামলার নথিতে পলাতক দেখানো হয়েছে। মামলাটি এখন হাইকোর্টে আছে। এরপর সুপ্রিম কোর্ট হয়েই চ‚ড়ান্ত রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রেরিত হবে। একুশ আগস্টের মামলা একটি বিচারিক আদালতের বিষয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো একুশ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ঘটনার বিষয়। এর সঙ্গে যেহেতু সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থার লোকজনের সংশ্লিষ্টতার কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে, আবার মূল পরিকল্পনাকারী ছাড়াও এর নেপথ্য সমর্থক, মদদদাতা, পরিকল্পনাকারী আরও অনেকেই থাকতে পারেন। এখানে বিএনপি, জামায়াত, জেএমবি নামক তিনটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের কথা স্পষ্ট হয়েছে। আবার প্রশাসনে অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করা এবং পরবর্তী সময়ে ধামাচাপা দেয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বাইরেও যেসব জামায়াত, শিবির ও বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবী ডাক্তার আক্রান্তদের চিকিৎসাদানে বিরত ছিলেন তাদের বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। এর বাইরেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী একুশ আগস্টের ঘটনাকে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষের দৃষ্টিকে অন্যদিকেও ঘুরিয়ে নিতে চেষ্টা করেছিলো। এই ধরনের আরও বেশ কিছু বিষয় এখনো অভিযোগ আকারেই শুধু একুশ আগস্টের স্মরণ সভায় কিংবা লেখালেখিতে উঠে আসে। কিন্তু এমন একটি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অনুমাননির্ভর বা সন্দেহপ্রবণ কথাবার্তা বলে খুব বেশি সত্যকে তুলে ধরা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন যা সামগ্রিক এই ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন কোন শক্তির পরামর্শ, ইন্ধন, অংশগ্রহণ, সমর্থন, অস্ত্র যোগানসহ যাবতীয় বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে উদ্ঘাটন করা অত্যন্ত জরুরি। সেটি করা গেলে একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডের পরিপূর্ণ ধারণা বের হয়ে আসতো। তাহলে সুনির্দিষ্ট করে জানা যেতো কোন কোন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের আয়োজন, সংগঠন এবং এর পরবর্তী সময়ের নানা ঘটনার সঙ্গে কীভাবে জড়িত ছিলো, কার ভ‚মিকা কী ছিলো সেটি দলিল আকারে বের হয়ে আসতো। সেটি আমাদের দেশে রাজনীতির জন্য যেমন একান্তভাবে প্রয়োজন একইসঙ্গে আমাদের বৃহত্তর সমাজে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সঠিক রাজনৈতিক ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। সেখানে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় উঠে আসবে তাদের সম্পর্কে মানুষের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই সরকারের উচিত হবে এখনই একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অনুসন্ধান কমিশন গঠন করা। যেখানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই অনুসন্ধানটির পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ প্রমাণ রেখে জাতির এই কলঙ্কজনক ঘটনার একটি পরিষ্কার ধারণা জাতিকে দিতে ভ‚মিকা রাখবেন। আমাদের ধারণা এমন একটি তদন্ত কমিশন দায়িত্ব নিয়ে কাজ করলে আমাদের দেশের রাজনীতিতে ১৯৭৫-এর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ের হত্যার উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, একুশ আগস্ট এবং তার পরবর্তী সময়ের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চরিত্রটি মানুষের কাছে উন্মোচিত হতে পারে। এর জন্যই প্রয়োজন এমন একটি অনুসন্ধান কমিশন। এটি কোনো মামুলি পুলিশি তদন্ত হবে না, হবে বহুমাত্রিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের স্বরূপ উন্মোচন। এর উপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করবেন, লেখাপড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে জানার চেষ্টা করবেন এবং গবেষণা করবেন তাদেরও এই দলিলটি হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র। আমাদের দেশের বাইরেও এই দলিলের গ্রহণযোগ্যতা হবে ঐতিহাসিক। সেই কারণে প্রয়োজন একুশ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সব রহস্যের উন্মোচন করা। লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত