প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

রফিক আহমেদ : মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর একমাত্র জীবিত সদস্য, বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ, দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল এক সময়ের মস্কোপন্থী ন্যাপ বলে পরিচিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-মোজাফফর) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ রাজধানীর এপোলা হাসপাতালের নিবীড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৯ মিনিটে মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শোক জানিয়েছেন।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও আজীবন শোষণমুক্তি ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে লড়াকু যোদ্ধা ৯৮ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ রাজধানীর এপোলা হাসপাতালের নিবীড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অধ্যাপক ডা. বোরহান উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত চারদিন যাবত লাইফ সাপোর্ট দিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে তাঁর হৃদযন্ত্র সচল রেখেছেন চিকিৎকেরা। বার্ধক্যজনিত সমস্যা ছাড়াও নিম্ন রক্তচাপ ও ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছেন তিনি।

ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, স্যারের রক্তচাপ অস্বাভাবিক মাত্রায় নেমে গেছে। এছাড়া ফুঁসফুঁসের জটিলতার কারণে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যেও তাঁর দেহে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়া যাচ্ছে না। যার কারণে চিকিৎসকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি।

উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের অর্থনীতি শাস্ত্রের সাবেক শিক্ষক মোজাফ্ফর আহমদ ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লার দেবীদ্বার আসনে ন্যাপ থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৭ সালে নির্বাচিত হন পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সংসদ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু হত্যার তীব্র প্রতিবাদ এবং তৎকালীন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান জিয়াউর রহমানের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এর জীবনী : বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামীপার্টি (ন্যাপ) সভাপতি, এদেশের বাম আন্দোলন এবং সাম্রজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরাধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বর্ষীয়ান জননেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালে ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে। ছাত্রাবস্থায় বিট্রিশবিরোধী ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্নকলেজে শিক্ষাকতা করেছেন। ১৯৫২ সালে আজিমপুর সরকারী কলোনীর একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। তাঁর এই ফ্ল্যাটটিই হয়ে উঠেছিল ভাষা আন্দোলনের হেডকোয়ার্টার। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে তিনি পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে দেবিদ্বার আসনে মুসলীম লীগের জাঁদরেল প্রার্থী মফিজ উদ্দিনকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিতহন।

১৯৫৭ সালের এপ্রিলে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্ত¡ শাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। দলীয় নেতৃত্বের বিরোধীতা করে শেখ মুজিবুর রহমান মোজফফর আহমদের প্রস্তাবের পক্ষে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং প্রস্তাবটি পাশ হয়েছিল।

১৯৫৭ সালের ২৭ জুলাই মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠন প্রক্রিয়ায়ও একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ১৯৫৮ সালে আইউবের সামরিক শাসন মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে হুলিয়া, গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি এবং ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। তিনি আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। ৮ বছর আত্মগোপনে থেকে ১৯৬৬ সালে আবার প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

১৯৭১ স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নেতৃতের¡ একজন এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বিশের^ বিভিন্ন দেশ সফর করেন। এ সময় তিনি জাতিসংঘেও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্রইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনে তাঁর ভ‚মিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

অধ্যাপক মোজাফফর স্বাধীনতার কথা, আদর্শিক রাজনীতির কথা, সমাজতন্ত্রের কথা বলে তরুণদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, রাজনীতির অর্থ দেশের সেবা, মানুষের সেবা। পদ পদবীর মোহ তাঁকে কখনও আকৃষ্ট করতে পারেনি। সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সাথে তাঁকেও স্বাধীনতা পদক দেওয়ার ঘোষণা করলে তিনি তা সবিনয়ে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে কুঁড়েঘরের মোজাফফর বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। তিনি এখন রাজধানীর বারিধারায় মেয়ে আইভি আহমেদের বাসায় সস্ত্রীক জীবন-যাপন করছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত