প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গোপন ভিডিও ভাইরাল এবং স্বামীকে বাঁচাতে অস্ত্রের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া সাহসী মিন্নি

হাসনাত কাদীর : খুনি নয়নের সঙ্গে ‘মিন্নির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের গোপন ভিডিও দেখুন’। এমন শিরোনামে ফেসবুক ইনবক্সে মেসেজ ঘুরছে। সঙ্গে একটি ঝাপসা ছবি। সেখানে যুবকের সঙ্গে তরুণীকে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে দেখা যায়। বলা হচ্ছে, ঝাপসা ওই যুবতীই মিন্নি। যুবক তার স্বামী রিফাত শরীফের খুনি নয়ন বন্ড। স্বামীর খুনির সঙ্গে মিন্নির ‘অবৈধ অন্তরঙ্গ ভিডিও’ ছড়িয়ে তার ফাঁসি চাচ্ছে একদল জনতা। কেন? তারা কারা? সদ্য স্বামী হারানো তরুণীর নামে এমন ভিডিও ছড়ানোর কারণটা কী? সাদা চোখে কিংবা ফাঁসির দাবি জানানো জনতার মতে, মিন্নি এক ‘চরিত্রহীনা’ নারী। একইসঙ্গে রিফাত আর নয়নের ‘ঘর করেছে’ সে। নয়ন বন্ডের সঙ্গে ‘বিয়ে’র কথা গোপন করে রিফাত শরীফকে বিয়ে করেছে। তারপর দুজনকে ‘বাহুডোরে বেঁধে’ ভাসতে চেয়েছে অন্যায় আনন্দে। দুই নৌকায় পা’ দিয়ে চলা এই ‘দ্বিচারিণী’র কারণেই লাশ হলো রিফাত ও নয়ন। মিন্নি কেন ডুববে না? তাকেও ডুবতে হবে। পরতে হবে ফাঁসির দড়ি। ‘চরিত্রহীনা’ মিন্নিকে ‘শিক্ষে’ দেয়া গেলে ‘রক্ষে’ পাবে আমাদের সাধু সমাজ।

‘মিন্নির গোপন ভিডিও’ বস্তুত সমাজের প্রকাশ্য ব্যাধি। যে ব্যাধির শিরায় শিরায় বয়ে চলে ধর্ষণের জীবাণু। যে ব্যাধি চুপি চুপি বলে যায় আমাদের নীতিনৈতিকতা, মানবিকতা, রুচি ও চরিত্র স্খলনের গল্প। চরিত্রের চূড়ান্ত পতন না হলে একজন মৃত মানুষের নামে পর্নো ভিডিও ছড়ায় কোনো সমাজ? যুক্তি ও বিবেক চূড়ান্ত বিসর্জন দিলেই খুনির বিচারের দাবির চেয়ে মুখ্য হয়ে উঠে ‘গোপন ভিডিও’। স্বামীহারা নারীর চরিত্র বিশ্লেষণ। আর ফাঁসি চাওয়া যায় স্বামীকে বাঁচাতে অস্ত্রের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া নারীটির।

সমাজের একটা বড় অংশ মিন্নিকে চরিত্রহীনা প্রমাণ করতে ব্যস্ত। খুন ও খুনিদের বিচারের চেয়ে তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে ‘গোপন ভিডিও’। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী-পুরুষের প্রেম এমনকি বন্ধুত্বকেও আমাদের সমাজ স্বাভাবিকভাবে দেখতে শেখেনি। এখানে প্রকাশ্য দিবালোকে দু’জন তরুণ-তরুণী পাশাপাশি বসলেও আটক হয়ে যায়। এখানে নারীর প্রতি মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে ‘উচ্চ শিক্ষিত’ তরুণরাও। নারী মানেই মাংস ও ভোগ্যা। সে ঘরের বাইরে গেলেই যেন ‘বেশ্যা’। কিন্তু এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? তরুণ-তরুণীরা কেন নারী-পুরুষের সম্পর্ককে স্বাভাবিক চোখে দেখতে শিখছে না? মানুষের জীবনে প্রেম আসতে পারে, প্রেম ভাঙতে পারে। এই স্বাভাবিক ব্যাপারকে তারা কেন মানতে শিখছে না? প্রিয় মানুষটির পছন্দের সঙ্গীকে সম্মান করার স্বাভাবিক মানসিকতা গড়ে উঠছে না কেন? জীবনে এসব জটিলতার মুখোমুখি কমবেশি সবাইকেই হতে হয়, কীভাবে এগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, মনকে মানাতে হয়, সে শিক্ষা কি তারা পাচ্ছে? পাচ্ছে না। এই শিক্ষাহীনতাই নারীর প্রতি অস্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান কারণ। তাই শুধু ভালো রেজাল্ট নয়, সময় এসেছে শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও মানবিকতা বিকাশের দিকে নজর দেয়ার। তা না হলে যতোই উন্নয়নের মেইলট্রেন ছুটুক, যুক্তিবিবর্জিত মস্তিষ্কে আবেগের বোঝা নিয়ে আমরা পড়ে রবো ‘গোপন ভিডিওর’ অন্ধ প্রকোষ্ঠে। আর ছুটে বেড়াবো খুনের মুখ্য অপরাধ এড়িয়ে গৌণ ‘চরিত্র’ বিশেষণেই। আমরা কিছুতেই বুঝতে পারবো না যে, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির যদি অবৈধ সম্পর্ক থেকেও থাকে তাতে কিছুই আসে-যায় না। প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস খুনের পর পরকীয়া, প্রেম কিংবা কোনো ভিডিওই মুখ্য থাকে না। ‘দ্বিচারিণী’ মিন্নি তখন গৌণ হয়ে যায়। ফোকাস দিতে হয় শুধুই ঘৃণ্য হত্যাকা-ে। তা না হলে দুর্বল বিচার ব্যবস্থায় আইনের ফাঁক গলে মূল অপরাধীরা চলে যেতে পারে আড়ালে। রিফাত হত্যার মূল আসামি নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ খতম হয়েছে। রিফাত শরীফকে কোপানো আরেক আসামি রিফাত ফরাজীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু অনেক আসামিই এখনো আটক হয়নি, যারা হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নিয়েছিলো। অথচ এরই মধ্যে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে। একদল জনতা তাতে আনন্দ প্রকাশ করছে। এরা নয়ন বন্ড ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও আনন্দিত হয়েছিলো। অপরাধী সাজা পেলে মানুষ খুশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অপরাধী বিনা বিচারে ‘খতম’ হলে জনতা যদি খুশি হয় সেটি ভয়ংকর। তখন বুঝতে হয় রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তারা আস্থা হারিয়েছে। আর যে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা জনতার আস্থা হারায়, সে রাষ্ট্র ‘ভয়ংকর’। মনে রাখা দরকার সেখানে ক্রমাগত অপরাধ বেড়েই চলে। যে রাষ্ট্র ‘অপরাধী’কে ‘বন্দুকযুদ্ধে খতম’ করে, সে রাষ্ট্রের বন্দুক তাক হতে পারে নিরপরাধীর মস্তকেও। সুতরাং সাধু সাবধান! ‘গোপন ভিডিও’র বদলে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা অন্যায়-অনিয়ম, অপরাধের সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে দাঁড়ান।লেখক : সহ-সম্পাদক, মানবকণ্ঠ। ফেসবুক থেকে

 

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত