প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ জাপার তৃণমূল কর্মীরা

ইউসুফ আলী বাচ্চু: জনকল্যাণমূলক কোনো কর্মসূচি না দেয়া ও সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষুব্ধ জাতীয় পার্টির রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলা, মহানগর, উপজেলা ও পৌরসভার নেতারা। পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের মুখের ওপর অনেক শক্ত কথা শুনিয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের ওই নেতারা।

তবে প্রায় সকলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জাতীয় পার্টি এখনো নিশ্বেষ হয়ে যায়নি, জনপ্রিয়তা রয়েছে। শুধুমাত্র কর্মসূচি না থাকা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণে অনেকটা বেহাল অবস্থা। এই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে সংসদে সরকারের অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যুতে কর্মসূচি দেয়ার দাবি জানান তারা।

মঙ্গলবার রাজধানীর এজিবি কলোনি কমিউনিটি সেন্টারে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সভায় ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি পার্টির জন্য নানা সুপারিশও তুলে ধরেন তারা। কেউ কেউ জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতেও ছাড়েননি।

পাবনা জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক কদর আলী মঞ্চে বসা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমাদের সংসদ সদস্য সংখ্যা মাত্র ২৬ জন হলো কেন? মহাজোট থেকে এতো কম আসন পেলাম কেন? আপনি জেলার নেতাদের কোনো খবর রাখেন? আপনার কাছে কতোজনের নম্বর আছে?’

ঠাকুরগাঁও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রাজি স্বপন বলেন, ‘কেন্দ্রের কোনো কর্মসূচি নেই, কোনো দিক-নির্দেশনা নেই। আজকে ঢাকা আসার ব্যাপারে হতাশ নেতারা। কর্মীদের কথা হচ্ছে, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের দালালি করছে। দালালি করতে হলে সরাসরি আওয়ামী লীগের দালালি করবো। জাতীয় পার্টি করবো কেন?’

তিনি বলেন, ‘আমরা জোট করলাম, সংসদ যদি তাদের ছেড়ে দেই, তাহলে উপজেলাতো আমরা পেতে পারতাম। আমরা কেন পেলাম না? আমাদের নতুন কর্মী তৈরি হচ্ছে না। সম্ভবত আমরাই শেষ প্রজন্ম। আমাদের ছাত্র সংগঠন শক্তিশালী না থাকায় নতুন কর্মী তৈরি হচ্ছে না। এ ভাবে চললে জাপা বিলীন হয়ে যাবে।’

‘সংসদে সরকারি দলের চেয়ে বিরোধীদল জাতীয় পার্টির এমপিরা উন্নয়নের কথা বেশি বলেন। এটা করলে চলবে না। বিএনপির মাত্র ছয়জন এমপি সংসদ কাঁপিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের এমপিরা পারছেন না কেন? বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশ, তাদেরকে আমাদের করে নিতে পারতাম। আমার সে পথে হাঁটছি না। এভাবে পার্টিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গাইবান্ধা জেলার সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন শাহীন বলেন, ‘গত নির্বাচনে আমার ২৩০টি আসনে আওয়ামী লীগকে ওয়াকওভার দিয়েছি। কিন্তু আমি জনসভা করতে গেলে ওসি ফোন করে নিষেধ করেছেন। গোবিন্দগঞ্জের প্রার্থীকে একরকম হুমকি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। জাপার দূর্গ বৃহত্তর রংপুরে কেন মাত্র ছয়টি আসন? কর্মসূচি দেন, আগামীতে বৃহত্তর রংপুরের ২২ আসন জাপার প্রার্থীরা জয়ী হবে। সংসদে আমাদের ২৬ এমপি বিরোধীদলের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’
পঞ্চগড় জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু সালেক বলেন, ‘জাতীয় পার্টির শিরদাড়া শক্ত করতে হবে। আমরা জাতীয় পার্টির জন্য জীবন যৌবন, অর্থ, মেধা সবই শেষ করলাম। পার্টির কাছে কিছুই পেলাম না। আমরা কি চাই, সেটাও নেতারা বুঝতে চেষ্টা করেন না। আমাদের অবস্থা ভিক্ষা চাই না মা কুত্তা সামলান অবস্থার মতো।’

‘সাধারণ নেতাকর্মীরা হতাশ, আজকের এই সভায় কিছুটা আশান্বিত হলেন। আপনারা কর্মসূচি দেন, জেলা, জাতীয় ও আঞ্চলিক ইস্যুতে কথা বলেন, মানুষ গ্রহণ করবে।’

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খাইরুল আলম বলেন, ‘জাতীয় পার্টি বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। সংসদে যথাযথ বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করুন। মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষুব্ধ। আমাদের ভূমিকা ভালো হলে মানুষ আমাদের গ্রহণ করবে। কেন্দ্রের কোনো নির্দেশনা গ্রামে যাচ্ছে না। এভাবে দলকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’
কুড়িগ্রাম জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক পনির উদ্দিন আহমেদ এমপি বলেন, ‘সেন্ট্রাল ঠিক করেন। আমরা তৃণমূল ঠিক আছি। আমরা ট্রেনের বগিতে আছি, বগি ফেলে দিয়েন না। আমি ভোটের সময় দেখেছি, একজন বয়স্কলোক আমাকে বললেন, একটু আগে ফোনে এরশাদ স্যারের সঙ্গে কথা হলো। পার্টির চেয়ারম্যান তৃণমুলের লোকজনের নাম জানেন। এটা বড় যোগ্যতা।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা জাপার সদস্য সচিব আব্দুল জলিল বলেন, ‘এক বছর পর চিঠি দিয়ে ডেকে আনেন। অন্য সময়ে কোনো খোঁজ খবর নেন না। প্রত্যেক জেলায় সাংগঠনিক কর্মসূচি দেন। বিভাগে বিভাগে সাংগঠনিক টিম থাকতে পারে।’

বোচাগঞ্জ উপজেলা জাপার সভাপতি জুলফিকার হোসেন বলেন, ‘আমাদের পার্টিতে নির্বাচনের ১৫ দিন আগে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়। এটা বন্ধ করতে হবে। আগামী নির্বাচনের জন্য এখনই প্রার্থী মনোনীত করে মাঠে নামিয়ে দিতে হবে।’

‘এজন্য সাংগঠনিক টিম পাঠিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে চুড়ান্ত করতে হবে। সাংগঠনিক টিমকে যেন স্থানীয় এমপি বা পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রভাবিত করতে না পারেন। পদ দিয়ে লাভ নেই। কর্মসূচি দেন, আমাদের কাজ দেন, পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে।’ বিএনপি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন এই সময়ে আমরা এগিয়ে গেলে জনগণ আমাদের কাতারে এসে দাঁড়াবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় মাইক নিয়ে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘আমরা আট বিভাগে আটটি সাংগঠনিক টিম গঠনের চিন্তা করছি। কেউ বলেছেন, স্ব স্ব বিভাগ থেকে টিম করতে, কেউ বলছেন বাইরে থেকে করতে। আপনারা এ বিষয়ে মতামত দিতে পারেন কোনটা হলে ভালো হয়।’

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক নূর আলম যাদু বলেন, ‘আমাদের আসনটি জাপার দুর্গ। এখানে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে দেয়া হয়েছে। উপজেলাও যদি দিয়ে দেন, তাহলে দল কিভাবে চলবে? এমপি দিচ্ছেন, উপজেলা যদি নিতেন, তাহলে দল বেঁচে থাকতো। জাতীয় পার্টি সঙ্গে না থাকলে এতিম হয়ে যাবে আওয়ামী লীগ।’

বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আব্দুল হান্নান বলেন, আমাদের আসনে আলতাফ আলীকে ২০১৪ সালে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি পার্টির কোনো খোঁজ খবর নেননি। ২০১৭ সালে পার্টির চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম। তখন পার্টির চেয়ারম্যান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে তাকে বহিস্কার করতাম। গত নির্বাচনে আমিনুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু একদিন পর হঠাৎ মনোনয়ন বদলে যায়। এভাবে খামখেয়ালিপনা করলে দল চলবে কি করে?’

মোহনপুর উপজেলা জাপার নেতা আমিনুল হক বলেন, ‘সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দল ব্যর্থ হচ্ছে। কিছু নেতাকর্মী আছেন, যারা কাজ করতে দেন না। পার্টিতে বিভাজন সৃষ্টি করেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলা সভাপতি আকবর ইমাম বলেন, খোঁজ না নিয়ে অচেনা অযোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়াই পরাজয়ের মূল কারণ। আগামীতে আগে ভাগেই প্রার্থীদের নামিয়ে দিতে হবে।

প্রেসিডিয়াম সদস্য গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘বিএনপি আন্দোলন করে তাদের নেত্রীকে মুক্ত করতে পারছে না। জাতীয় পার্টি কিন্তু তার চেয়ারম্যানকে ঠিকই জেল থেকে মুক্ত করেছে। এটা রেকর্ড। বিএনপি এবার মাত্র ছয়টি আসন পেয়েছে। আর আমরা ২২ আসনে জিতেছি, এটাও কিন্তু বাস্তবতা। সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখতে না পারলে উপযোগিতা থাকবে না।’
‘অনেক নেতাই অভিযোগ করেন, যে পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে। তাতে তারা নজেহাল হচ্ছেন, মান সম্মান হারাচ্ছেন, অর্থ খরচ হচ্ছে। রাতের আঁধারে ভোট কারচুপি ঠেকাতে সোচ্চার হতে হবে।’

বেলা ১১টায় শুরু হওয়া ওই সাংগঠনিক সভার শুরুতে জিএম কাদের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সকলের কথা শুনতে চাই। সে কারণে প্রত্যেকে তিন মিনিটের মধ্যে শেষ করতে পারলে ভালো। আপনারা যতোক্ষণ কথা বলতে চান, আমি ততোক্ষণ আছি। প্রয়োজন হলে বিকেল পর্যন্ত চলবে।’

বুধ, বৃহস্পতিবারও একই স্থানে পৃথক চার বিভাগের সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হবে। সম্পাদনা: অশোকেশ রায়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত