প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘কৃষকের সঙ্গে মশকরা করতে পারেন না’

মঞ্জুরুল আলম পান্না : জাতিসংঘের হিসাব মতে, প্রতি বছর সারাবিশ্বে উৎপাদিত খাদ্যের এক-তৃতীয়াংশই বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়, যার পরিমাণ প্রায় ১৩০ কোটি টন। ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনইপি) মতে, প্রতিবছর নষ্ট করা খাদ্য পচে যাওয়ার পর তা থেকে যে পরিমাণ তরল পদার্থ তৈরি হতে পারে তা ভলগা নদীর পানি প্রবাহের সমান। বিভিন্নভাবে এই পরিমাণ খাদ্য নষ্ট করা হলেও এর একটি প্রধান কারণ বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করতে বাধ্য করা হয় কৃষককে। শিল্পোন্নত দেশে কৃষক সেই কাজটি স্বচ্ছন্দেই করে থাকেন।  কারণ তাকে সেজন্য ভর্তুকি দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এবার ধানচাষে দিশেহারা কৃষকদের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমাদের কৃষিমন্ত্রী ফ্রান্সে উদ্বৃত্ত খাদ্যপণ্য নষ্টের উদাহরণ দিলেন বটে, কিন্তু চেপে গেলেন উন্নত দেশগুলোতে কৃষককে ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি। কোরিয়া-জাপানের মতো দেশগুলোতে কৃষকের সব ধান কিনে নেয় সরকার। কৃষিমন্ত্রী এটা স্বীকার করে নিলেও এক্ষেত্রে জানিয়েছেন, ‘সেটা করার জন্য আমাদের আরও গুদাম তৈরি করতে হবে’। এতোদিনে কেন তা করা হয়নি, সে প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত পাওয়া যাবে না। তবে এটা স্পষ্ট যে, কৃষিপ্রধান দেশ হলেও  আমাদের কৃষিনীতি নিঃসন্দেহে কৃষকবান্ধব নয়।

‘কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’ কথাটিকে কেবলই একটি মশকরামূলক রাজনৈতিক স্লোগান বলে মনে হয়। গত ১৬ মে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সচিবলায়ে সাংবাদিকদের কাছে অকপটে বলে ফেললেন, ‘সরকার রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাজার থেকে সরাসরি কৃষকের ধান কিনতে পারছে না। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়’। অর্থাৎ চাল সংগ্রহ করা হবে চালকল মালিকদের কাছ থেকে, যারা এলাকায় দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং অনেক বেশি প্রভাবশালী। তাই বলা যায়, ‘চালকল মালিকরা বাঁচলে দলীয় রাজনীতি বাঁচবে’। ধানের দাম কম এবং দিনমজুর না পাওয়ায় টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ক্ষোভে-হতাশায় নিজের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেন আবদুল মালেক সিকদার নামের এক কৃষক। সেখানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান আওয়ামী লীগের মতো একটি গণসম্পৃক্ত এবং ঐতিহ্যবাহী দলের এখনকার শীর্ষনেতাদের কেউ কেউ। ঘটনাটির মধ্যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়ার কথা জানিয়ে খোদ খাদ্যমন্ত্রী সাধন মজুমদার বললেন, ‘কৃষক তার উৎপাদিত ধানে আগুন দেবেন, এটা হতে পারে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে’। যদিও তার এই ষড়যন্ত্রীয় তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছেন সরকারি দলের আরেক নেতা এবং সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ। খাদ্যমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করে  হুইপ বলেছেন, ‘আপনি কৃষকের সঙ্গে মশকরা করতে পারেন না’। কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধা মেশানো এই কথাটুকুতেই আবু সাঈদ আল মাহমুদ যখন পাচ্ছিলেন সাধারণ মানুষের অশেষ ভালোবাসা, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেশবাসীর সামনে করলেন খাদ্যমন্ত্রীর কথারই পুনরোল্লেখ।

কৃষকের সঙ্গে মশকরা আর কাকে বলে! উদ্বৃত্ত চালের দেশে কৃষকের আহাজারি শোনার মতো কেউ না থাকলেও রীতিমতো আমদানি চলছে লাখ লাখ টন চালের। বিষয়টিকে হালকা করতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলে ফেললেন, দেশের পাঁচ তারকা হোটেল আর ধনীদের পছন্দের কারণে নাকি সুগন্ধী-সরু চাল আমদানি হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সপ্তাহখানেক আগেও ভারত থেকে যে চাল আসছিলো তা আতপ। প্রতি কেজি ভারতীয় চালের দাম ছিল ২২ টাকা। অর্থাৎ সুগন্ধী-সরু চাল নয়, ভারত থেকে সাধারণ চালই বেশি আমদানি হয়ে আসছিলো। তবে অনেক সমালোচনার পর চাল আমদানিতে ৫৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করায় আপাতত চালের জন্য নতুন করে এলসি খোলা হচ্ছে না মাত্র কয়েকদিন ধরে।

ধানে কৃষকের ক্ষতি মানে কি কেবলই আর্থিক ক্ষতি? কেউ হয়তো দাদনে টাকা এনে জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। মহাজনের টাকা পরিশোধের চিন্তায় তার এখন পাগলপারা অবস্থা! সামনের দিনগুলোতে তিন বেলা খাবার জুটবে কিনা, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন। এবার বোরো ধান তোলার পর পরই হয়তো কারোর কন্যাসন্তানের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে ছিলো। নিশ্চয়ই ভেঙে গেছে সেই স্বপ্ন। কারো কারোর সন্তানের পড়াশোনাটাও হয়তো বন্ধ হবার উপক্রম। ঈদ-পূজা-পার্বনের রং, সবই এখন ধূসর। মশকরা আর কাকে বলে! এই যখন অবস্থা বাংলার কৃষকের, ঠিক সেই মুহুর্তে কৃষি কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়া হলো বিলাসবহুল গাড়ির চাবি। আচ্ছা সরকারকে বিব্রত করতে সরকারের ভেতরেরই একটি শক্তিশালী অংশ খুব নীরবে কাজ করে যাচ্ছে না তো? নাকি বেশ সজ্ঞানেই চলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এসবের আয়োজন? বকেয়া মজুরির দাবিতে রোযার মধ্যে রাজপথে যখন প্রায় সত্তর হাজার পাট শ্রমিক, ঠিক তখনই ১০০ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রত্যেকের হাতে তুলে দেয়া হলো কোটি টাকার একেকটি গাড়ি। কি দরকার ছিলো এখনই ওগুলোর? লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত