প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাহে রমজানে যেমন ছিলো নবীজির আমল

ইমদাদুল হক যুবায়ের : মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা নিয়ে অলস-অবহেলায় উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবন-যাপন করার কোনো অবকাশ নেই। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এবং স্রষ্টার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণে মানুষকে হতে হবে সর্বদা আন্তরিক ও অবিচল। কিন্তু মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্বকে সহ্য করতে পারেনি শয়তান। শয়তান ঘোষণা করেছে, সে আল্লাহর বান্দাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরবে। তাই শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মানুষ অনেক সময় অসৎ, অশোভন কিছু কাজ করে বসে। শয়তানের এই প্ররোচনার উপর বিজয়ী হবার জন্যে মানুষের আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন। পবিত্র রমজান মাস হলো সেই আত্মশুদ্ধি অর্জনের শ্রেষ্ঠ মাস। আর আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য সাওম পালন করতে হবে সেভাবে; যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাওম পালন করেছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রাত্রি জাগরণ, তাহাজ্জুদ ও সালাত আদায়ের বৈশিষ্ট্য ও রূপ বর্ণনা করে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রমজানে রাত্রিকালীন সালাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.) সালাতকে অনেক দীর্ঘ করতেন। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রা.)-কে রমজানে রাসূলের সালাত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- রমজান কিংবা অন্য সময়ে তিনি (রাতে) এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি প্রথমে চার রাকাত সালাত আদায় করতেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য হতো অতুলনীয়; অত:পর পুণরায় চার রাকাত আদায় করতেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যও হতো অতুলনীয়। এরপর তিন রাকাত আদায় করতেন। আমি বললাম- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বিতির আদায়ের পূর্বেই ঘুমাবেন? তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমার দু-চোখ ঘুমায়, কিন্তু অন্তর ঘুমায় না। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ২০১৩)

রমজানের শেষ দশ দিনে ইতিকাফকালীন সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাতেন, পরিশ্রম করতেন কঠোরভাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ক্বদরের রাত্রির অনুসন্ধানে রাত্রি-জাগরণ করতেন, ইবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত সময় যাপন করতেন। আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, এ রাতের অনুসন্ধানে প্রথম দশ দিন আমি ইতেকাফ যাপন করলাম, পরবর্তীতে যাপন করলাম মধ্যবর্তী দশ দিন। অত:পর ওহির মাধ্যমে আমাকে অবগত করানো হলো, সে রাত আছে শেষ দশ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে ইতেকাফে আগ্রহী সে যেন ইতিকাফ করে। তাই লোকেরা তার সাথে ইতিকাফ পালন করল। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬৭) এছাড়া আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে দশ দিন ইতেকাফ যাপন করতেন, যে বছর তার ঊর্ধ্বারোহন হয়, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফ যাপন করেন। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৯০৩)

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে সফর করতেন; সফরে তিনি কখনো কখনো সাওম পালন করতেন, কখনো ত্যাগ করতেন এবং পানাহার করতেন। অন্যদেরও আদেশ দিতেন সওম ভঙ্গের। ইবনে আব্বাস হতে তাউস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে সাওম পালনরত অবস্থায় সফরে বের হলেন, পথে উসফান নামক এলাকায় পৌঁছে পানিপাত্র আনার নির্দেশ দিলেন। লোকদের দেখানোর জন্য তিনি প্রকাশ্যেই পানি পান করলেন। মক্কায় পৌঁছা অবধি তিনি পানাহার করতে থাকলেন। ইবনে আব্বাস বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে সফররত অবস্থায় সাওম পালন করেছেন এবং ভঙ্গ করেছেন। সুতরাং, যার ইচ্ছা সাওম রাখবে, যার ইচ্ছা ভঙ্গ করবে। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৪২৮৯)

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে অধিক নেক আমল করতেন, বিশেষ করে সদকা করতেন বিপুল পরিমাণে। ইবনে আব্বাস এক হাদিসে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মাঝে সর্বাধিক দানশীল। রমজানে তিনি সর্বাধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরাঈলের সাথে তার সাক্ষাৎ হত। রমজানে জিবরাঈল তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তার সাথে কুরআন পাঠ করতেন। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৩২২০)

রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে সাহাবিদের সাওম বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে আলোচনা করতেন, বিশেষভাবে তিনি সকলকে বলতেন রমজানে আত্মার পবিত্রতা অর্জন করতে, পাপ পরিহার করে চলতে কারণ, রমজান ও অন্যান্য সময় সমকাতারের নয়। এছাড়া তিনি লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান করার জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মহান রাত্রিকে গণিমত মনে করে কাজে লাগাতে বলতেন। এর কল্যাণ অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতেন সকলকে। একবার তিনি সাহাবীদেরকে এ রাতের ফজিলত বর্ণনা করে বলেন- যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে এ রাত্রি জাগরণ করবে, তার পূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৮০২) বিভিন্ন হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এ রাতের সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন- রমজানের শেষ দশ দিনে তোমরা লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।’ (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৮০২) তাছাড়া ফেতরা আদায়ের আদেশ করতেন যেমন: ‘ইবনে ওমর (রা.) এর হাদিস, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ফিতরা নির্ধারণ করলেন এক সাআ’ খেজুর বা এক সাআ’ জব। তিনি স্বাধীন, দাস, নারী-পুরুষ সবার উপর ফেতরা ওয়াজিব করলেন। এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে তা আদায় করার আদেশ দিলেন।’ (সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ১৫০৩)

রাসূলুল্লাহ (সা.) তার সাহাবীদেরকে, রমজান অতিবাহিত হওয়ার পরেও রমজান মাসের ইবাদত সিয়াম পালন অব্যাহত রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। যেমন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- যে ব্যক্তি রমজানের সাওম রাখে অত:পর শাওয়াল মাসে ছয়টি সাওম রাখে সে যেন গোটা বছর সাওম রাখলো। (সুনানু ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৪৩৩)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত