প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই দশকের চলচ্চিত্র অভিযাত্রায়ঢাকাই ছবির সুপারস্টার শাকিব খান

আবু সুফিয়ান রতন : দুই দশকের চলচ্চিত্র অভিযাত্রায় তিনি নিজেই এখন পুরো বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছেন সাফল্য ও ব্যবসার মানদণ্ডে। তিনি আর কেউ নন, ঢাকাই ছবির সুপারস্টার শাকিব খান।  ১৯৯৯-এর ‘অনন্ত ভালোবাসা’ থেকে ২০১৮-তে এসে ‘ক্যাপ্টেন খান’। আর ২০১৯ এসে মুক্তি পাচ্ছে ‘পাসওয়ার্ড’। আজ  ক্যারিয়ারের ২০ বছ পূর্ণ  করলেন তিনি। গত একদশক ধরেই   শুধু তার নামে পার পেয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমা।

সাফল্যের জন্য তোমাকে তিনটি মূল্য দিতে হবে : ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, আর স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখার জন্য ব্যর্থতার পরও কাজ করে যাওয়া। -বলেছিলেন ফ্র্যাঙ্ক লয়েড নামের একজন লেখক ও শিল্পী। তিনটি বিষয়ের ওপর মূল্য দিলে একজন মানুষ এতটা সাফল্যের চূড়ায় উঠবে যে, অন্যদের সে সাফল্যের উচ্চতা দেখতেও টাকা গুনতে হবে। ঢাকাই ছবির নায়ক শাকিব খানের বেলায়ও তেমনটি হয়েছে। আজ কেউ তাকে ‘সেরা নায়ক’, কেউ ‘সুপারস্টার’, কেউ ‘নায়ক’, কেউ বা ‘কিং খান’ এমন অনেক বিশেষণেই বিশেষায়িত করে আসছেন। কিন্তু তার প্রকৃত নাম মাসুদ রানা। চলচ্চিত্রে আসার পরই রানা থেকে হয়ে ওঠেন শাকিব। পরের ইতিহাস জানা সবার। সাফল্য তাকে এত উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে, ভক্তরা নামে নয়, বিশেষণে ডাকতেই আনন্দ পান।

চলচ্চিত্রের দুই দশক পার করছেন তিনি। পার করছেন দারুণ সময়। যে সময়ের জন্য একদিন তিনি স্বপ্ন দেখতেন, যে স্বপ্ন তাকে ঘুমুতে দিত না। নারায়ণগঞ্জ থেকে এফডিসি, এফডিসি থেকে কাকরাইল, পরিচালকদের দুয়ারে দুয়ারে হানা- সবই করেছেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি রাজ করছেন এ অঙ্গন। অথচ ১৯৯৯ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘অনন্ত ভালোবাসা’ ছবির হ্যাংলা-পাতলা ছেলেটাই একদিন চলচ্চিত্রে রাজ করবেন- এমনটা কেউ ভাবেননি। সাফল্য ও দর্শকপ্রিয়তার বিচারে শাকিব খানের ধারে-কাছেও কোনো নায়ককে পাওয়া যাবে না। চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যুর পর চলচ্চিত্র যেখানে থমকে যাওয়ার উপক্রম, সেখানেই হুট করে জ্বলে ওঠেন শাকিব। জ্বলছেন আজও। আজ ঢাকা তো কাল ভারত, মালয়েশিয়া, স্কটল্যান্ড, লন্ডন হয়ে অস্ট্রেলিয়া। অপ্রতিরোধ্যতার অগ্রযাত্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী পথচলা অভিযাত্রী শাকিব খান। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী নায়কও বটে। নিজেকে বাংলাদেশের সিনেমার আচ্ছাদন মনে করেন কি-না প্রশ্নে শাকিব কৌশলী কিন্তু আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমি যখন যে কাজটি করি, তা শতভাগ মনোযোগ দিয়েই করি। সেই কাজের সঙ্গে আমার প্রেম থাকে। এখন দর্শক আমাকে বাংলাদেশের সিনেমার শামিয়ানা মনে করলে তাদের রায় মাথা পেতে নেব।’

অন্য আট-দশ জনের মতো শাকিবের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। তিনি বলেন, ‘সায়েন্সের ছাত্র ছিলাম। সবসময় ভাবতাম ডাক্তার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করব। কিন্তু এইচএসসির পর হঠাৎ করেই সব স্বপ্ন হারিয়ে যেতে থাকল। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে হলাম অভিনেতা।’ ১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পায় শাকিব অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘অনন্ত ভালোবাসা’। আগামী মাসে অভিনয়ের দুই দশক পূর্ণ করতে চলেছেন তিনি। কেমন লাগছে? জানতে চাওয়া হয় নায়কের কাছে। বলেন, ‘চলচ্চিত্রে ২০ বছর পার করলাম। অথচ আমার তো মনে হয় সেদিন চলচ্চিত্রে এলাম। আফতাব খান টুলু ভাইয়ের ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’ ছবির মাধ্যমে প্রথম সেদিনও তো ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। অথচ ২০ বছর! সময় আসলেই কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সে তার নিজ গতিতেই চলে। আমাদের কত সময় বয়ে গেল। তবে আমি সন্তুষ্ট। আমার মনে হয় আমি সময়টাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। সেটা কিছুটা হলেও পেরেছি। আমার দর্শকরা যেভাবে চেয়েছেন তাদের হিরোকে দেখতে, সেভাবে উপস্থিত হওয়ার চেষ্টা করে গেছি। এখনও করছি।’ আপনার কাছে সাফল্যের মূলমন্ত্র কী? শাকিবের সাদাসিদে উত্তর, ‘কোনো মূলমন্ত্র নেই। তবে একজন হিরোর সাফল্যের মূলমন্ত্র কিন্তু দর্শকদের ভালোবাসা। নায়ক যদি দর্শকদের চাওয়া-পাওয়ার মূল্য দেয়, তাহলে দর্শকদের কাছে সে গ্রহণযোগ্যতা পায়। সাফল্যও আসে।’ বর্তমানে একমাত্র শাকিব খানের ছবি নিশ্চয়তা দিতে পারছে প্রয়োজকদের। তাদের টাকা ফেরতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারছেন তিনি। এর ফাঁকে মাঝে মধ্যে ২-১টি সিনেমা দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হচ্ছে। তবে, এই সংখ্যা হাতেগোনা। দিন শেষে শাকিবেই ভরসা রাখছেন সব প্রযোজক। শাকিব খান অভিনীত ছবি মানেই প্রযোজকদের নিশ্চয়তা। শাকিব খান এখন আগাগোড়াই বিপ্রফেশনাল নায়ক। অভিনয় জীবনে তার যা কিছু অর্জন সবকিছুই তিনি কখনও দর্শকের জন্য উৎসর্গ করেছেন, কখনও ছেলে আব্রাম খান জয়কে, কখনও বা উৎসর্গ করেছেন মা-বাবাকে। এত এত যার সাফল্য, এত এত যার ভাঁড় তার একটু ভুল হবে না, তা কিন্তু নয়। বিগত ১০ বছরে বেশ সমালোচিতও হয়েছেন শাকিব। অপু বিশ্বাসের সঙ্গে প্রেম, বিয়ে ও ডিভোর্স, এফডিসিতে প্রহূত ও নির্বাচনে সমর্থিত প্যানেলের পরাজয়, বারবার বয়কটের শিকার, মানহানি মামলা, সন্তান নিয়ে থানা-পুলিশ ইত্যাদি নিয়ে বেশ সমালোচিত এ নায়ক। তাতে কী? নায়ক হলে আলোচনা-সমালোচনা হবেই। যে গরু দুধ দেয় তার লাথিও গৃহস্থের ভালো লাগে। যে একাই টেনে তুলছেন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি, সে একটু-আধটু ভুল করবে না তা তো হয় না। নায়ক যেহেতু মানুষ, তাই মানুষ ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক। আর সেটা শুধরেও নেবে। নিয়েছেন শাকিব খানও।

আপনাকে নিয়ে তো চলচ্চিত্রে বেশ রাজনীতি চলে। এতে কি পিছিয়ে পড়ছেন বলে মনে হয়? নন্দনের এই প্রশ্নটা শুনে উত্তর দেন এ যুগের ‘নবাব’। বলেন, ‘এগিয়ে যাওয়া পিছিয়ে পড়া খেলারই অংশ। আজ যেটাকে পিছিয়ে পড়া বলছেন তা আশীর্বাদ বলবেন আপনারাই। আমার দুই যুগের ক্যারিয়ারে এত কিছু দেখেছি যে, এখন কোনো কিছুতে অবাক হই না। সবকিছুর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকি।’ গত কয়েক বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে শাকিব ঠেকাও ধরনের একটা মানসিকতা ছিল। সেটা কি এখনও আছে মনে করেন? এ প্রশ্নে হাসতে হাসতে শাকিব বলেন, ‘আরে ধুর! পারল কই। আমি তো আছি। থাকব। যতক্ষণ দর্শকের অন্তরে আছি আমাকে ঠেকায় সাধ্য কার? আমার শিকড় ইন্ডাস্ট্রি এবং দর্শকের অন্তরে গাঁথা আছে। ওটা কি রোখা যাবে?’ বলে চলেন নায়ক, ‘প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ময়দান আমার পছন্দ না। চলচ্চিত্রে এখন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তবে এটা যে খুব ভালো তা নয়।’

শাকিব জানান, চলচ্চিত্রই তার ধ্যান জ্ঞান। অথচ এখন শাকিব অভিনীত চলচ্চিত্রও খুব কম মুক্তি পাচ্ছে। অথচ গত এক দশক শাকিব বিরতিহীনভাবে কাজ করেছেন। বছরের ৩৬৫ দিনই তাকে শুটিং নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। এখন সে ব্যস্ততা কমিয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে তো কেবল উৎসবেই মুক্তি পাচ্ছে তার ছবি। ছবির সংখ্যা কমানোর কথা জানতে চাইলে উত্তরে শাকিব বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও তো বছরে ১০টি ছবি মুক্তি পেত আমার। এখন ছবির সংখ্যা অনেক কমিয়ে দিয়েছি। কারণ, ভালো ছবির মতো ছবি বছরে একটাই যথেষ্ট বলে মনে করি আমি। এখন ছবি করার আগে কথা বেশি হয়। এই করবে, সেই করবে; কিন্তু ছবিতে সাইন করার পর দেখা যায় কিছুই হয় না। কেবল ভালো প্রজেক্টের ছবিতেই কাজ করব।’

একই সঙ্গে চোখের সামনে অনেকের ক্যারিয়ার শেষ হতেও দেখেছেন জানিয়ে শাকিব বলেন, ‘যাদের ছবি আমি নিজে হলে গিয়ে দেখতাম তাদের ক্যারিয়ারও পড়ে যেতে দেখেছি আমি। কেবল তাদের অসাবধানতার কারণে ক্যারিয়ার ক্ষতি হয়েছে তাদের। তেমনটি চাই না। এখন গল্পপ্রধান ছবিতে কাজ করব। যেসব পরিচালককে নিয়ে কাজ করা দরকার সবই করব। প্রত্যেকটা উৎসব ধরে সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপন করব।’

নিজের প্রযোজনা সংস্থার বাইরে হাউসে কাজ করলেও ছবির সব কিছু দেখভাল করবেন শাকিব। কোনো না কোনোভাবে তার প্রযোজনা সংস্থাও সেখানে জড়িত রাখবেন বলে জানান এ নায়ক। নিজের প্রযোজনা সংস্থা এসকে ফিল্ম থেকেও নিয়মিত প্রযোজনা থাকবে। ইতিমধ্যে রোজার ঈদের জন্য এ হাউস থেকে ‘পাসওয়ার্ড’ নামে একটি ছবিও শেষ করেছেন। প্রক্রিয়াধীন আছে আরও বেশ কয়েকটি প্রজেক্ট। কারণ শাকিব খানের দু’চোখজুড়ে এখন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়েই স্বপ্ন। স্বপ্নের কথা আসতেই শাকিব বলেন, ‘বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি আমি। দুই বাংলা যদি সিনেমার দিক থেকে এক হয়ে যায় তা হলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি অনেক সমৃদ্ধ হবে। অপজিশন থাকবেই। কিছু মানুষ মন্দ কথা বলবেই। তার জন্য তো বৃহত্তর স্বার্থ থেমে থাকতে পারে না।’ একসময় অপুকে প্রাধান্য দিতেন এখন বুবলি… প্রশ্ন শেষ হয় না। শাকিব বলেন, ‘এভাবে সরলীকরণ করাটা মনে হয় ঠিক না। বরং এভাবে বলতে পারেন- প্রযোজক কিংবা পরিচালকরা যা চান তার ভিত্তিতে সব নির্ধারিত হচ্ছে। আর তারা দর্শক চাহিদার ওপর নির্ভর করেই সব ঠিক করেন। আমার মতামত হয়তো তারা চান। আমি একাধিক নাম বলি। তারা আমার ও দর্শকের মত মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। আমি কেবল আমার কাজটি করি।’

আলোচনায় ব্যক্তিজীবন, পরিবার-সন্তান প্রসঙ্গে নাম্বার ওয়ান শাকিব খানের বক্তব্য, ‘তারকার সবকিছু নজরবন্দি থাকে জানি; কিন্তু তার নিজস্ব বলে কিছু আছে সেটা গণমাধ্যম যদি আরেকটু বুঝত তবে ভালো হতো। যাহোক, সব মেনে নিজের মতো করে সন্তানকে সময় দিচ্ছি। আর কাজটাকে প্রাধান্য দিচ্ছি।’

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত