প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসছে সাপ

দৈনিক আমাদের সময়: জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ভার বহনকারী মূল পিলার ও দেয়াল ভেঙে দোকানের পরিসর বাড়ানোর কাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে এর হোতা মো. সোহরাব হোসেন গাজীর বিরুদ্ধে বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, বায়তুল মোকাররম মার্কেটের একটি দোকানে বয় হিসেবে কাজ শুরু করা সোহরাব ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা, অন্যায়ভাবে দোকান জবরদখল করা এবং ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। পাশাপাশি বাগিয়ে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় ইউনিটের সভাপতির পদও।

এদিকে পিলার গায়েব কাণ্ডে ক্ষেপেছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। গত শনিবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তিনি। ‘আল্লাহর ঘর মসজিদ’ ভবনে এত বড় একটি কাণ্ড ঘটার পরও বিষয়টি তার দৃষ্টিগোচর না করায় ঘটনাস্থলেই তিনি ভর্ৎসনা করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। বিশ্বস্ত একটি সূত্রের খবর, দুর্ঘটনার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন প্রতিমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক ডেকে নির্দেশ দেন, অতিসত্বর জাতীয় এ মসজিদের ভেঙে ফেলা পিলারটি পুনঃস্থাপন করার এবং এহেন কাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার ‘বায়তুল মোকাররমের পিলার গায়েব’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মুসল্লি ধারণক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের দশম বৃহত্তম এ মসজিদটির ভার বহনকারী মূল দুটি পিলারের একটি এবং এর সঙ্গে যুক্ত ১৫ ফুট দেয়াল রাতের আঁধারে ভেঙে স্ত্রীর মালিকানাধীন দোকান বড় করেছেন আওয়ামী লীগের বায়তুল মোকাররম ইউনিট শাখার সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন গাজী।

এ নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়; গঠন করা হয় একাধিক তদন্ত কমিটি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গত ২০ মার্চ ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনও পাঠানো হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত অভিযোগের বিপরীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মসজিদের ভার বহনকারী পিলার ও দেয়াল ভেঙে ফেলায় যে কোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ সংবাদে টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। শুধু তাই নয়, ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, রাতের আঁধারে ক্ষমতাসীন দলের নেতার লোভাতুর কা- এবং এর ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা-এসব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ওই নেতাকে ধিক্কার দিচ্ছেন দল-মত নির্বিশেষে অনেকেই; দায়িত্বশীলদের গাফিলতি নিয়ে তীর্যক মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ।

এদিকে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশের পর গতকাল রবিবার সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন-উত্তর একাধিক বৈঠক করেছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব হাসান আহমেদ ও উপ-সচিব সাখাওয়াত হোসেনসহ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ থাকার পরও গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ কা-ের হোতা সোহরাব হোসেনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

যদিও জোর গুঞ্জন রয়েছে যে, তাকে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ইতোমধ্যেই আটক করেছে। তবে কোনো দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেনি। দোকানটির মালিকানা সোহরাব হোসেনের স্ত্রী শায়লা আক্তারের নামে; তাকেও এ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়নি। গতকালও দেখা গেছে, তাদের মালিকানাধীন দোকানটিতে জমজমাট বিক্রি চলছে। দোকান সামলাচ্ছিলেন অভিযুক্ত সোহরাবের ভাই। একাধিক সূত্রের খবর, সোহরাবের গা বাঁচাতে তার পক্ষ থেকে এখন ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে ধরনা দেওয়া হচ্ছে।

কেঁচো খুঁড়তে কেউটে সাপ
বিখ্যাত এ স্থাপনাটির মূল পিলার গায়েব সংক্রান্ত ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে বিস্ময়কর তথ্য। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাব হোসেন নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটের কোটি টাকা মূল্যের ৭টি দোকান দখল করে রেখেছেন। নিয়ম উপেক্ষা করে দখলকৃত ৫টি দোকান ভেঙে বানিয়েছেন বিশাল একটি দোকান। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন সোনালী ব্যাংকের বায়তুল মোকাররম শাখার প্রায় ৪ কোটি টাকা। ২০০৪ সালের ৯ মার্চ সোহরাবের বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের বায়তুল মোকাররম শাখা থেকে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে তা লিখিতভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দপ্তরকে জানিয়েছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

ওই শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক, এডি ও ডিডি স্বাক্ষরিত ওই পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘আমরা বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, অত্র শাখার (বায়তুল মোকাররম) গ্রাহক মো. সোহরাব গাজী প্রেস ২১, বায়তুল মোকাররম মার্কেটের দোকান মালিক। তিনি (সোহরাব) অত্র ব্যাংকের প্রায় ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত; বিধায় তার নিজ এবং পরিবার-পরিজনের নামে স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি বিবরণী আদালতসহ সিআইডি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটিকে প্রদানের জন্য অত্র কার্যালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সোহরাব গাজীর স্থায়ী ঠিকানা ৪৮/১ পুরানা পল্টন, সুলতানাবাদ কলোনি।’ সোনালী ব্যাংক তখন বিশাল এ জাল-জালিয়াতির বিষয়ে অবহিত করার পরও রহস্যজনক কারণে আজ অবধি আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

গতকাল সোনালী ব্যাংকের বায়তুল মোকাররম শাখার ব্যাংক ইনচার্জ এজিএম মো. শামীম আজাদের কাছে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি চলতি বছরের মার্চ মাসে দায়িত্বভার গ্রহণ করি। ঘটনাটি ২০০৪ সালের। তাই বিস্তারিত এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একইভাবে বায়তুল মোকাররম মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ পিলার রাতের আঁধারে ভেঙে অপসারণের ঘটনায়ও সোহরাব ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পল্টন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়।

যেভাবে উত্থান
জানা গেছে, সোহরাব হোসেন গাজী ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। অভাব-অনটনের কারণে পড়ালেখায় এগোতে পারেননি বেশিদূর। প্রায় ৩০ বছর আগে গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চল থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে বায়তুল মোকাররমের একটি দোকানে বয় হিসেবে কাজ নেন। চুরির অপরাধে সেই দোকান থেকে চাকরি যায় তার। এর পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনের ফুটপাতে কয়েকটি দোকান (হকার) বসিয়ে শুরু করেন চাঁদাবাজি। এর পর ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে খুবই মূল্যবান বায়তুল মোকাররম এলাকার ফুটপাতের প্রায় পুরোটাই দখলে নেন। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছত্রছায়াও পেতেন।

এক সময় তিনি নিজেই আওয়ামী লীগের নেতা বনে যান। ফুটপাতে বসানো সহস্রাধিক দোকান থেকে আদায় করতে শুরু করেন রোজ লক্ষাধিক টাকা। হতদরিদ্র পরিবার থেকে ঢাকায় এসে এখন শত কোটি টাকার মালিক সোহরাব হোসেন। একে একে মালিক হয়েছেন ফ্ল্যাট-বাড়িসহ প্রচুর বিত্ত-বৈভবের। পল্টনের বালুর মাঠ এলাকায় অবস্থিত রূপায়নে তার দেড় কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, একই এলাকায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা মূল্যের বিশাল ভবন, মাতুয়াইল মেডিক্যাল রোড এলাকায় ৫ কাঠার বাড়ি, পোস্তগোলা নদীর আশপাশে অসংখ্য প্লট ছাড়াও তার আরও অনেক সম্পত্তির খবর মিলেছে। শুধু জমি, ফ্ল্যাট, বাড়িই নয়, সোহরাব গড়েছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। শুধু বায়তুল মোকাররম মার্কেটেই তার অন্তত ১৫টির মতো দোকান রয়েছে। তার চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে বায়তুল মোকাররম এলাকার ব্যবসায়ীরা।

সূত্র আরও জানিয়েছে, রাজধানীর বিশাল একটি হুন্ডি ব্যবসায়ী চক্রের হোতাও তিনি। চক্রের অন্যতম সদস্য জসিম, জাকির, কবির প্রমুখ। ব্যাংকে ডাকাতির একটি মামলায়ও আসামি সোহরাব। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত