প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভারতের সঙ্গে ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা : উত্তরণের চেষ্টা করবে বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট : বিএনপি-বিজেপিবাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হয়েছিল বিএনপি। দেশটিতে সদ্য অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল বিজয়ে এই মনোযোগ আরও বাড়াবে দলটি। বিগত সময়ে বিভিন্ন ঘটনার কারণে দেশটির সঙ্গে যে ‘তিক্ত অভিজ্ঞতা’ হয়েছে বিএনপির, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথও খুঁজবে দলটির হাইকমান্ড। বিএনপির বিদেশনীতি নিয়ে কাজ করেন, এমন একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে।বাংলা ট্রিবিউন।

শুক্রবার (২৪ মে) সকালে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে ঢাকাস্থ হাইকমিশনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চিঠিও।

বিএনপির বিদেশনীতি নিয়ে কাজ করেন, এমন একাধিক নেতা জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ঘাটতি ছিল দলটির।২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর থেকে একাধিক ঘটনায় দেশটির সঙ্গে দলীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটায় বিএনপি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অনেকটা প্রকাশ্যেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয় ভারত। গত বছরের জুনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ কয়েকজন ভারত সফর করেন। ওই সফরে ভারতের একাধিক থিংকট্যাংকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপির প্রতিনিধি দল।

বিএনপির ফরেইন উইংয়ের টিম লিডার আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে, সম্পর্ক হবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে হবে। পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখে আমাদের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এতে করে আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী হবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, দলীয়ভাবে বিএনপি প্রতিবেশী দেশটির সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেনি। তবে নরেন্দ্র মোদি টানা সরকারে আসায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে, সম্পর্ক নতুনভাবে ঝালাই করতে। শনিবার (২৫ মে) বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হবে। সে চিঠিতে দলের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিজেপিকে অভিনন্দিত করার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন একাধিক নেতা।

বিএনপির নেতা ও দলটির বিদেশ বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ডানপন্থী’ দল হিসেবে বিজেপির টানা বিজয় হলেও ভারতের বিদেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনও পরিবর্তন আসবে না। এক্ষেত্রে দেশটির বিদেশনীতিতে যে ধারাবাহিকতা, তাই বজায় থাকবে। একইসঙ্গে টানা ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা দেখা দিলেও শেষপর্যন্ত বিজেপি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে মনোনীত করে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বক্তব্য পর্যালোচনা করার পরই স্পষ্ট অবস্থান নেবে বিএনপি, এমনটি বলছেন দলটির সিনিয়র একাধিক নেতা।

বিএনপির বিদেশ বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ইনাম আহমেদ চৌধুরী। শুক্রবার বিকালে তিনি বলেন, ‘আমি তো বিএনপিতে নেই যে, তাদের অবস্থান বলতে পারবো। তবে এটা বলা যায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে নীতি, তার একটি ধারাবাহিকতা থাকে। সেদিক থেকে সরকার পরিবর্তন হলে বা না হলেও নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসে না। ভারতের ফরেন পলিসি, তাদের ফরেন অফিসই নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। ফলে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে যেভাবে বিবেচনা করার, সেটাই প্রাধান্য পাবে বলে আমি মনে করি।’

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘মোদি সরকার এখনও পুরানোই আছে। এখনও নতুন সরকার শপথ নেয়নি। এখন যদি মোদিকে বাদ দিয়ে অন্য কেউ হয়, তাহলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। পৃথিবী পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে, এজন্য আগে বিজেপি সরকার শপথ নিক। এরপর সেই সরকারের অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি, বক্তব্য বুঝে বিএনপি অবস্থান বিবেচনা করবে। আমাদের লক্ষ্য, গণতন্ত্রের পক্ষে প্রতিবেশী দেশ কতটা কাজ করে, সেটা দেখা।’

শামসুজ্জামান দুদুর ভাষ্য, বৃহৎ ভারতের একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল কতটা গণতন্ত্রপ্রিয় হবে, সেটা নিয়ে বিএনপির সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাশা করবো, আগামী সরকার গণতন্ত্রের পক্ষে যেন কাজ করে। বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রহীনতা, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে সহযোগিতা আমাদের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য তারা করেছিল, সেই দৃষ্টি নিয়ে তারা যেন এগিয়ে আসে। সে কারণেই বলবো, অপেক্ষা করে অবস্থান ব্যক্ত করাই বিএনপির জন্য উত্তম।’

ইনাম আহমেদ চৌধুরীও এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শুধু ভারতেই নয়, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশে যেভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদী দলগুলো ক্ষমতায় আসছে, তাতে সামগ্রিকভাবে চিন্তার বিষয়। এসব পৃথিবীর জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এবারে ভারতের নির্বাচন নিয়েও কিন্তু আমরা প্রথমবারের মতো লক্ষ করলাম, দেশটির দলগুলো নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাত, ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।’

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপির কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের বিষয়টি গত কয়েক বছরে একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিল, ভিশন ২০৩০ ঘোষণা ও কারাবন্দি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যেও উঠে আসে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের মাটিকে কোনোভাবেই ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না—এমন ভাষ্যও দলটি দিয়ে এসেছে। ‘ভিশন ২০৩০’-এর পররাষ্ট্রনীতি’র একটি অংশে বলা হয়েছে, ‘বিএনপি অন্য কোনও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও অন্য কোনও রাষ্ট্রের জন্য নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি করবে না।’ মূলত ২০১২ সালের শেষদিকে ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে বিএনপির সরে আসার ইঙ্গিত মেলে।

এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘কেউ কাউকে দোষারোপ করতে চাইলে আমরা অনেকগুলো কারণেই দোষারোপ করতে পারবো। আমি সেগুলো তুলে ধরতে চাই না। কারণ, এগুলো দু’দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। বহু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো দোষারোপ করে যাওয়ার মতো। সুতরাং এগুলো পেছনে রেখে আমাদের সামনে এগোতে হবে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশের মানুষের জন্য আমাদের সামনে এগোতে হবে এবং তা আমাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে।’

বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবীর খান বলেন, ‘২০১২ সালের ২৮ অক্টোবর ভারত সফর করেন চেয়ারপারসন। ওই সফরে তিনি তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী, প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, বিরোধীদলীয় নেত্রী সুষমা স্বরাজ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ, পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই, জাতীয় নিরপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা শিবশংকর মেননের সঙ্গে বৈঠক করেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকেও বিএনপি চেয়ারপারসন বাংলাদেশের মাটিকে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে না দেওয়ার কথা বলেছিলেন।’

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেননি খালেদা জিয়া। জামায়াতের হরতালের কারণে তিনি সাক্ষাৎ করতে যাননি।

শুক্রবার (২৪ মে) সকালে গুলশানে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ফরেন উইংয়ের টিমলিডার আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘ভারতের নির্বাচনের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, তাদের জনগণ ভোটের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পেরেছে। যেটা বাংলাদেশে জনগণ পারেনি। ভারতের সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে, জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়েছে। গণতন্ত্র সুসংহত হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করেছে।’

এ বিষয়ে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বলেন, ‘ভারতীয়রা ভাগ্যবান কারণ তাদের কার্যকর গণতন্ত্র রয়েছে, সেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়। যা আমাদের বাংলাদেশে অনুপস্থিত। ভারতের জন্য বাংলাদেশ ও বিএনপি সবসময় বন্ধু ছিল। শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আমাদের প্রতিবেশীকে সহযোগিতা করবো। পানিবণ্টন বা সীমান্ত হত্যার মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও উভয় দেশের মধ্যে উপযুক্ত সমঝোতার মাধ্যমে সবসময় সমাধান সম্ভব। এটা দুঃখজনক যে, বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা দলটি এই ইস্যুগুলো প্রায় একদশকেও সমাধান করেনি।’

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, ভারতের নির্বাচন নিয়ে খুব দ্রুত বিএনপির বিদেশ বিষয়ক কমিটি বৈঠক করবে। দেশটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, বাংলাদেশে নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে দেশটির মনোভাব নতুন কোনও রূপ নেয় কিনা, এ বিষয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করবে বিএনপি।

এদিকে, ভারতে বিজেপির টানা বিষয়ে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জামায়াতের আমির মকবুল আহমদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতা।

উল্লেখ্য, সাত দফায় অনুষ্ঠিত ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনা হয় গত ২৩ মে। এদিন নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফল অনুযায়ী ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৫১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-জোট। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট এগিয়ে রয়েছে  ৯১টি আসনে। এরইমধ্যে পরাজয় স্বীকার করে বিজেপি নেতা মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ