প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যজনের কামতৃপ্তি, চরম মানসিক অসুস্থতা

ড. এমদাদুল হক : একজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যজনের কামতৃপ্তি-চরম মানসিক অসুস্থতা। এ ব্যাপারে কেউ যেন কখনো অন্যজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে না যায়, এমনকি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যেন না যায়। কামশক্তি কাউকে আঘাত করার জন্য নয়, কর্তৃত্ব করার জন্য নয়, পরাভূত করার জন্য নয়, কাউকে অসম্মান করার জন্য নয়। এ শক্তির অপব্যবহার আত্মোন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আধ্যাত্মিক শক্তির সঙ্গে যদি কামশক্তি যুক্ত হয়, তবে তা আত্মবিকাশের দ্রুতযান হয়ে ওঠে।
কামনাতৃপ্তি কামশক্তি ব্যবহারের একটি দিক মাত্র। এটি জগতের সঙ্গে জীবনের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমও বটে। আরেকজনের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে কাম তৃপ্ত হয় না। তাই কামতৃপ্তির বাসনা থেকেই শুরু হয় যোগ-যৌথ চিন্তা, যৌথ জীবনযাপন। কাম সাদামাটা ইচ্ছা নয়- ইচ্ছার প্রবলতা। কামের ইচ্ছা যার মধ্যে প্রবল, প্রেমের ইচ্ছা তার মধ্যে দুর্বল। কাম শুধু একটা ক্ষুধা নয়, যা নিবৃত্ত করতে হবে। এটি আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক জীবনে এটি হলো প্রকৃতির স্বীকৃতি। ব্যক্তিজীবনে এটি একদিকে সঙ্গীর ওপর নির্ভরতা, অন্যদিকে দেয়ার মাধ্যমে আনন্দ প্রাপ্তি। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্নেহ, প্রীতি, ধৈর্য, সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতার চর্চা। কামের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক সুবিদিত। কেউ কাছে পেতে চায় এটি যেমন তৃপ্তিদায়ক তেমনি কাউকে কাছে পেতে চাওয়াও তৃপ্তিদায়ক। পরস্পরকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছার মধ্যেই রয়েছে এক ধরনের শক্তি।
মানুষ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার প্রধম পাঠ নেয় কাম থেকেই। যার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিলো না, তার সঙ্গে কামসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পর সম্পর্ক এমন ঘনিষ্ঠ রূপ নেয় যে, নিজের সব অর্জন তার হাতে তুলে দিতেও দ্বিধা করে না। কামসূত্র এমন এক বন্ধন গড়ে তুলে যে, একজন আরেকজনের জন্য ত্যাগ করা, ক্ষমা করা, সহ্য করা- আনন্দের বিষয় হয়ে ওঠে। আধ্যাত্মিকতা হলো আত্মার সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক। কাম হলো দেহের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক। দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন নয়। বস্তুর সঙ্গে শক্তির সম্বন্ধ যেমন কামের সঙ্গে আত্মার সমন্ধ তেমন। সংবেদনের সঙ্গে চিন্তার সম্বন্ধ যেমন কামের সঙ্গে আত্মার সম্বন্ধ তেমন। মজার সঙ্গে আনন্দের সম্বন্ধ যেমন কামের সঙ্গে আত্মার সমন্ধ তেমন। কালের সঙ্গে মহাকালের সম্বন্ধ যেমন কামের সঙ্গে আত্মার সম্বন্ধ তেমন। জীবন থেকে কাম বাদ দেয়া মানে জীবনের উদ্দীপনা বাদ দেয়া। পরমা প্রকৃতি সৃষ্টির জন্য যে অপার কামশক্তি দিয়েছে তাকে বিনষ্ট করে জীবনের রূপায়ণ অসম্ভব ব্যাপার। পক্ষান্তরে আধ্যাত্মিকতাকে বাদ দেয়া মানে অস্তিত্বকেই বাদ দেয়া। সৃজনশীলতা বিকাশের মূলাধার হলো কামশক্তি। সুতরাং এর সঙ্গে বিরোধিতা কদাপি নয়। একে স্বীকার করে, একে তার উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে, সহযোগী শক্তি হিসেবে তৈরি করে এগিয়ে যাওয়া চাই জীবন রূপায়ণের পথে। কাম শব্দটির মধ্যে এমন মশলা মেশানো রয়েছে যে এটি শুনলেই চোখ বড় হয়ে যায়, কান খাড়া হয়ে যায়। মানুষ নড়েচড়ে বসে। সকলেই ক্লান্ত, তন্দ্রার আবেশে চক্ষু বুজিয়া আসছে- যেই না কামিনী প্রকট হলো মূলাধার শক্তিকেন্দ্র জেগে উঠলো। এই শক্তি বড়ই অস্থিতিশীল, চপলমতি। যেকোনো সময়, যে কাউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারে। কামের এই উদায়ী ও উগ্র প্রবৃত্তির কারণেই একে সঠিক পথে চালনা করতে হয় সচেতনভাবে। মহাকালের কোপানলে মদনের ভক্ষ্মীভূত হওয়ার তাৎপর্য এই যে- যদি কখনো ক্রোধ করতে হয়, কামের ওপর করো। কাম প্রেম জ্ঞান ভক্তি- কোনটির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর? কামের সঙ্গে। যার কাম নষ্ট- তার জীবন নষ্ট। যদি আমরা প্রেমময় সম্পর্কের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সুখ রক্ষা করার আশা করি, তবে কামশুদ্ধি অত্যাবশ্যক। ভোজনের মতো কামও সাত্ত্বিক হওয়া চাই। কাম সাত্ত্বিকতায় রূপান্তরিত হলে এর মতো সহযোগী শক্তি দ্বিতীয়টি নেই। কীভাবে কাম সহযোগী শক্তি হতে পারে, যখন এর সঙ্গে মিশে আছে পরিতোষ, লজ্জা ও পীড়া? পুরুষের কামশক্তি দিয়াশলাইয়ের মতো দ্রুত জেগে উঠে, দ্রুতই এর পতন হয়। নারীর কামশক্তি জলের মতো ধীরে ধীরে অগ্নির স্পর্শে উত্তপ্ত হয় এবং দীর্ঘ সময় গরম থাকে। এই ভিন্নতা অবুঝ পুরুষের জন্য লজ্জা এবং নারীর জন্য হতাশার কারণ হয় যদি নারীর সক্রিয়তার পূর্বেই পুরুষ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এর পর্যায়ক্রমিকতা নারীকে পুরুষের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলে। এটি প্রমাণ করে যে, পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নারীর সৃষ্টি হয়নি, নারীর মনোরঞ্জনের জন্য পুরুষের সৃষ্টি। প্রকৃতির বিধান পরিবর্তন করার সাধ্য মনুষ্যের নেই- কিন্তু রূপান্তরের সাধ্য অবশ্যই আছে। পুরুষের কাম মূলাধার থেকে দেহে ছড়িয়ে পড়ে। সচেতন প্রয়াসে এই গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়া যায়। মূলাধার চক্র থেকে একে হৃদচক্রে প্রেরণ করাই সব সমস্যার সহজ সমাধান। হৃদচক্রে কাম রূপান্তরিত হয় প্রেমে- ফলে আমি থেকে তুমি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কামের সঙ্গে যখন প্রেম ও কোমলতা মিশে যায় তখন সম্ভোগ রূপান্তরিত হয় সমাধিতে। নারীর কাম প্রাকৃতিকভাবেই শুরু হয় হৃদচক্র থেকে। তাই নারীর জন্য এই প্রচেষ্টা নিষ্প্রয়োজন। নারীর ক্ষেত্রে মূলাধার ও হৃদচক্রের সংযোগ পথ প্রাকৃতিকভাবেই স্থাপিত- হৃদচক্র না জাগলে নারীর মূলাধার চক্র জাগে না, তাই নারী ঘরে-বাইরে ধর্ষণের শিকার হয়। যদি কাম রূপান্তরের ইচ্ছা থাকে, তবে প্রেমের সাথে বাস করা চাই। প্রেমের সাথে সম্মিলন ব্যতীত নফস্ কাম দ্বারা আক্রান্ত হবেই হবে।
কামশুদ্ধি ছাড়া আত্মোন্নয়নের পথে একবিন্দু অগ্রসর হওয়ার সুযোগ নেই। তাই এ ব্যাপারে অবশ্যই খুঁজে নিতে হবে মধ্যপন্থা-প্রেমময় সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। প্রেম ছাড়া আত্মা তৃপ্ত হয় না। পরমাত্মার সঙ্গে মিলন না হওয়া পর্যন্ত আত্মার পরিত্রাণ নেই। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত