প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অসীম সাহার কবিতা

সৌমিত্র শেখর : বাংলাদেশের বিশ শতকের ছয়ের দশকের কবি অসীম সাহাকে স্বল্পালোচিত বললেও ‘শক্তিশালী’ কবি বলতে চাই না। কারণ কবির সঙ্গে ‘শক্তিশালী’ বিশেষণটি মানায় না; অসীম সাহার সঙ্গে তো নয়ই। ‘সমালোচনার’ নামে অতি-প্রশংসা করতে গিয়ে ইতঃপূর্বে কাউকে কাউকে যে ‘শক্তিশালী’ কবি বলে উচ্ছ্বাস দেখানো হয়েছে, সে প্রশংসার তাড়নায় জন্মানো লোভকাতুরে কিছু কনুইওয়ালা কবির প্রাদুর্ভাব তো দেখাই যাচ্ছে কাব্যগুলবাগানে। ফুল ফোটানোর চেয়ে ‘শক্ত শালে’র চাষই পছন্দ তাদের। কনুইয়ে ‘শক্তিশালী’ তারা হতে পারেন; আঙুলে নন, আঙুলের আলতো চাপে জড়িয়ে ধরা কলমে তো ননই। অসীম সাহাকে সে বিচারে ‘শক্তিশালী’ কবি বলতে আমি নারাজ। তাঁকে শুধুই ‘কবি’ বললে ক্ষতি কী? বিশেষণ দিয়েই যদি বলতে হয়, তবে বলবো ‘পূর্ণ’ কবি। একজন পরিপূর্ণ কবির যে গুণাবলি থাকা প্রয়োজনÑঅনুভব আর প্রকাশেÑঅসীম সাহার আছে তার ষোল আনা। অপার ধৈর্য আর সাধনার সংমিশ্রণে অভিজ্ঞতার বেলাভূমি থেকে এক একটি শব্দ-শুক্তি সংগ্রহ করে আন্তরিক দরদ আর ভাবের আবেশে যিনি গাঁথতে পারেন অনিন্দ্য-সুন্দরের সাতনরী, তিনিই তো কবি!
অসীম সাহার কবিতা উঠে এসেছে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে। নিশ্চিত করে এ কথা কেন বলা গেল? কারণ বহু অভিজ্ঞতাই আছে, যা কবির একার বলে মনে হলেও সেগুলো আসলে সবারই চেনা। বাংলাদেশের চিরায়ত সংস্কৃতিতে দোলাচল, দেশভাগ, অস্তিত্বের উৎকণ্ঠা, স্বদেশের জন্য উত্তাপÑএ-সবই নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে কবিতায় বাঙ্ময় করেছেন অসীম সাহা। কিন্তু পাঠক হিসেবে বিষয়গুলো আমাদেরও নিজের বলে মনে হয়। বিষয়কে কুক্ষিগত করে রাখার কোনো প্রবণতাই নেই তাঁর, প্রকাশেও তিনি মুক্ত গগনচারী। প্রেমের যে সংরাগ, এর যে আবেশ, এই মিষ্টি ভাবটুকু কখনো; আবার জিজ্ঞাসায় ক্ষত-বিক্ষত প্রেম, তার বৃশ্চিকদংশনবিষ, সবই অসীম সাহা কবিতায় প্রকাশ করেছেন সুন্দরে-কঠিনে। অনুষঙ্গ কখনো ইতিহাস, কখনো পুরাণ, কখনো সমকাল। যে-কোনোকিছুই হয়েছে তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ; আবার মহার্হ অনেক কিছুই নেননি তিনি কবিতায়। কারণ তাঁর কবিতায় আয়োজন কম, স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি। কবিতায় জোর করে অনুষঙ্গ-আরোপণ তাঁর স্বভাব-বিরুদ্ধ। স্্েরাতস্বতী কাব্যাবেগ সাবলীলতায় যেখানে গ্রহণ করে যতোটুকু এর বাইরে কোনো কিছুকেই কবিতায় স্থান দেয়ার ‘লোভ’ নেই তাঁর। তাই ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ কবে শেষ হয়ে গেছে’ (‘পুনরুদ্ধার’) বলে কবি যেমন পুরাণে আশ্রয় নেন, তেমনি ‘তিতুমীর আর সূর্য সেনের উত্তরাধিকার আমার গর্ব’ (‘না, আমরা কাঁদবো না’) বলে তাপিত হন ইতিহাসের দীপশিখায়। আবার ‘আহা, এই দেশে বন্যপ্রাণীরা আজ/পূর্ণিমার মাংস খেতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে’ (‘পূর্ণিমার মাংস’) বলে সমকালীন ভাবনাতাড়িতও হন তিনি। তাঁর কবিতায় আসে ‘কসাইখানায় একটি অসহায় পশুর ঝুলন্ত লাশ’ (‘শানানো ছুরির নিচে’), আসে জীর্ণ কুঁড়েঘর, ক্ষুদ্র পিপীলিকা, সন্ত্রস্ত হরিণ (‘এই রাতে’)। অর্থাৎ অনুষঙ্গ ব্যবহার কবিতার প্রয়োজনেই; অসীম সাহার কবিতা আভিধানিক অনুষঙ্গের শো-কেস নয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ পূর্ব পৃথিবীর অস্থির জ্যোৎøায় (১৯৮২)-এ কবি বলেছেন : ‘আমি জন্ম থেকে এইভাবে নিজেকে রেখেছি হিমগৃহে’ (‘নবজন্ম’)। সমকালীন বিরুদ্ধতা থেকে আত্মকু-লায়ন প্রথম পর্যায়ে কবির মধ্যে ছিলো। এর কবিতাগুলোতে শংকিত কবির নৈঃসঙ্গ্য-নিথরতা বেশ প্রবলই বলা চলে : ‘কচুরিপানার মতো নিঃসঙ্গতা ফুটে আছে শূন্য চরাচরে’ (‘নিঃসঙ্গতার প্রতীক’)। তবে যে কাব্যগ্রন্থে বাউলিনীও বিরহকাতর হয় সেখানে যে চুপিসারে প্রবেশ করে রোমান্টিকতা, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? প্রথম পর্যায়ে এই বাউল-রোমান্টিকতা নিয়েও কিন্তু শুরু করেছিলেন কবি অসীম সাহা। উত্তরকালের কবিতাবলিতে রোমান্টিকতা ফ্যাকাশে হয়েছে (কিন্তু মরে যায়নি), স্পষ্টতর হয়েছে বাস্তবতার অভিঘাত। এ-প্রসঙ্গে ‘উদ্বাস্তু’ সিরিজের দশটি কবিতার কথা বলা যায়। উদ্বাস্তু’ হওয়া পঞ্চাশোত্তীর্ণ কবির স্মৃতি-কোলাজ এই কবিতাগুচ্ছ। এখানে আছে : কখনো তাঁর খোকনকে সামনে রেখে, কখনো একাকী অনেক না-বলা কথা; কখনো কৈশোরস্মৃতি, কখনো যৌবনের স্বপ্ন; কখনো বারো বছরের নিরুপমা, কখনো সরস্বতী-শীলা সাহার রক্তসিঁদুর মাখার গল্প।
করণকুশলতায় যতœ আর আগ্রহের সীমা নেই অসীম সাহার। গদ্যকবিতায় ছন্দের লাগাম ধরে রাখা খুব যে কঠিন, কবিমাত্রই তা মানবেন। অসীম কাব্যঘোড়সওয়ার হয়ে ছন্দলাগামকে অগ্রাহ্য করতে রাজি নন। অপার প্রযতœ তাই তাঁর কবিতায়। ‘খাসিয়া পাহাড় থেকে টুকরো-টুকরো হয়ে গলে পড়ছে/শরতের স্বচ্ছ শাদা মেঘ,/বিন্দু-বিন্দু জল;/ প্রতিবিম্বিত আকাশের গ্রীবা বেয়ে উঠে যাচ্ছে/আমাদের টুকরো টুকরো স্মৃতি।’ (‘স্মৃতি’) চমৎকার চিত্রকল্পের দৃষ্টান্ত। এখানেও ছন্দকে সামান্যতম আঘাত পেতে তিনি দেননি; রক্ষা করেছেন। আট-দশ মাত্রার মূল পর্বে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবিতাটি লিখতে গিয়ে ‘প্রতিবিম্বিত’-এর মতো উপল-কঠিন আটপৌরে শব্দে কবি এক মাত্রার অতিরেক-উচ্চারণ গ্রহণ করেন (‘ম’-এর ক্ষেত্রে)। এতে ছন্দ যেমন রক্ষা হয় (দশ ও আট মাত্রার দুটি পূর্ণ পর্ববিশিষ্ট পঙক্তি), তেমনি তৈরি হয় প্রতিবিম্বিত হওয়ার একটি আবেশও। ছন্দের সঙ্গে অলংকারসৃজনেও আনন্দ অসীমের। অলংকারের মধ্যে উপমাতেই আগ্রহ যেন বেশি। ‘ধূসর ফিতের মতো বহু দূর’ (‘বিরহকাতর এক দগ্ধ বাউলিনী’); ‘প্রাচীন ধ্বংস্তুপের মতো একঘেয়ে স্তন’ (‘একমাত্র প্রার্থিত পুরুষ’); ‘আকাশের ঘন মেঘ বুনো শুয়োরের মতো তেড়ে আসছে’ (‘পুশব্যাক’)-এ-রকম বহু উপমা সৃজন-আনন্দে মেতেছেন অসীম। তবে অসীম সাহার কবিতার অঙ্গ-পারিপাট্যে জীবনানন্দ দাশের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করা জরুরি। কখনো তিনি জীবনানন্দকে অন্তর্গত মিথস্ক্রিয়ায় নিজের করে নিয়েছেন; কিছু ক্ষেত্রে তা হয়নি। যেমন, অসীম সাহা যখন লেখেনÑ‘হাজার বছর ধরে সহস্র করুণ ছায়া হেঁটে যায় অতি সন্তর্পণে’ (‘অগস্ত্যযাত্রা’), তখন জীবনানন্দকে তিনি আত্তীকরণ করেন এবং ‘বনলতা সেন’ কবিতার চেতনাকে শুষে নেন নিজের কাব্যচতনা দিয়ে। পরিণত মানব-মানবীমাত্রই জানেন, শোষণটি বিশেষমাত্রার হলে তাতে রসায়ন ঘটে; অসীম সাহার ‘অগস্ত্যযাত্রা’তেও ঘটেছে তাই। কিন্তু যখন তাঁর কবিতায় ‘জিরাফের তীব্র গ্রীবার মতো অনন্ত বিস্ময়’ (‘একমাত্র প্রার্থিত পুরুষ’) লেখা হয়, তখন জীবনানন্দের কাব্য-পঙক্তি ‘উটের গ্রীবার মতো কোনো-এক নিস্তব্ধতা’ (‘আট বছর আগের একদিন’)-এর কথাই মনে আসে আগে; অসীম সাহার ‘প্রবল জলের মতো স্মৃতিগুলো পাক খায় মাথার ভেতরে’ (উদ্বাস্তু-৫’) পঙক্তিপাঠের সঙ্গেই মনে পড়ে জীবনানন্দের ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!’ (‘বোধ’)। তবে পাঠকেরা এভাবে খুঁটে খুঁটে কবিতা পড়েন না; এ কাজ করেন সেই ‘ছায়াপি-’Ñজীবনানন্দ দাশ যাঁদের স্মরণ করেছেন তাঁর ‘সমারূঢ়’ কবিতায়।
তবু ছায়ার প্রয়োজন আছে। ছায়া না থাকলে বস্তুটিই থাকে না; হয়ে যায় অলীক কিছু। অসীম সাহার কবিতা অলীক স্থানের কল্পকুসুম নয়, বাস্তব পৃথিবীর জুঁই ফুল। এগুলো স্বস্নিগ্ধতা নিয়েই প্রস্ফুটিত, সুবাসিত; দ-ায়মান স্বীয় দার্ঢ্য।ে বাংলাদেশের বাংলা কাব্যাঙ্গনে এই কবিতাগুলো ‘অমূল্য’ নয়Ñ মূল্যবান, সমাদরযোগ্য

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত