প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একজন সৎ পুলিশ কমকর্তার অসহায় প্রার্থনা!

অসীম সাহা : আমি এমন একজন পুলিশ-কর্মকর্তাকে চিনি, যিনি পুলিস-কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশবাহিনীতে যোগ দেয়ার ২০ বছর পরেও একই পদে কর্মরত আছেন। অনেকের কাছেই ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তাকে আমি পারিবারিকভাবে জানি বলেই জোরের সঙ্গে কথাটি বলতে পারছি। তিনি আপাদমস্তক সৎ একজন পুলিশ-কর্মকর্তা। প্রায় সকলেই ধরে নেন, পুলিশ মানেই অবৈধ টাকার মালিক। অধিকাংশক্ষেত্রে কথাটা মিথ্যেও নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আমাদের দেশে পুলিশবাহিনীতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় বলে তাদের বিভিন্ন জরিপেও প্রকাশ করেছেন। তা ছাড়া পুলিশের চুনোপুটি থেকে রাঘব বোয়াল পর্যন্ত টাকার কুমির, এটা প্রায় সকলেরই জানা। যে অঞ্চলেই কাজ করুন, তিনি বলতে গেলে, সে-এলাকার রাজা। আর আমাদের দেশে নানামুখী অপরাধের কোনো নির্দিষ্ট এলাকা নেই। কমবেশি প্রায় সবখানেই অপরাধ সংঘঠিত হয়। ফলে পুলিশের হয় পোয়াবারো। আসামি ধরতে পারলেই টাকা। মামলা, সে-বৈধ কিংবা অবৈধ হোক, সবখানেই টাকার খেলা। এমনকি অপরা৮াধী না থাকলেও নিরীহ মানুষকে অপরাধী বানিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পুলিশের জুড়ি নেই! সেখানেও মামলা তুলে নেয়ার জন্য টাকার দাবির ঘটনা প্রায়ই আমরা পত্রপত্রিকায় নিয়মিতই পড়ি এবং এ-জন্যে পুলিশ-সদর-দপ্তর থেকে ‘অপরাধী-পুলিশ‘দের শাস্তি দেয়ার ঘটনাও চোখে পড়ে। তাই জনগণের কাছে পুলিশবাহিনীর খুব সুনাম নেই! তারই মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে আমার উল্লিখিত পুলিশ কর্মকর্তাও যে আছেন, সেটা অনেকেই ভুলে যান। তিনি ছাড়াও আরো এমন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা আছেন, যারা কোনোভাবেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। আর তারা আছেন বলেই এখনো মানুষ অনেকক্ষেত্রে পুলিশের সেবা পান।

আমার পারিবারিক স্বজন সেই পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি আবার গোপালগঞ্জ। গোপালগঞ্জ নাম শুনলেই অনেকের অ্যালার্জি ওঠে। বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া তো আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে ‘গোপালগঞ্জের’ নামই দেশের মানচিত্র থেকে মুছে দেবেন! কারণ কী? কারণ দেশের সবকিছু দখল করে নিয়েছেন গোপালীরা। তারচেয়েও আরো বড় একটি যন্ত্রণা তার আছে, তা হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি গোপালগঞ্জ। তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়িও গোপালগঞ্জ। কী করে সহ্য হয় তার? ফলে গোপালগঞ্জকে বিলুপ্ত করতে পারলে, তার স্বামী, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত নায়ক জিয়াউর রহমানের নাম সামনে চলে আসতে পারে। অতএব সবকিছুতেই গোপালীদের দোষ! সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমার কথিত পুলিশ অফিসারও দোষী। অথচ গোপালী হয়েও তার কোনো লাভ হয়নি। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যেখানে তার এসপি হয়ে অবসরে যাবার কথা, সেখানে গত বিশ বছর ধরে তিনি এএসপির পদেই অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। আর পুলিশবাহিনীতে টাকার খেলা সম্পর্কে কে না জানে? পোস্টিং থেকে প্রমোশন এবং প্রমোশন থেকে বিদেশ গমন পর্যন্ত শুধু টাকা আর টাকা। এ-ক্ষেত্রে আমার এএসপি অফিসার একেবারেরই অপারগ ও আনাড়ি। তার একটাই কথা, “সারা জীবন একই পদে থাকলেও টাকা দিয়ে প্রমোশন আমি নেবো না!” সে-জন্যে তিনি কখনো কারো কাছে তদবিরেও যাননি। গোপালী হওয়া সত্ত্বেও তার ভাগ্যে প্রমোশনের শিকে ছেঁড়েনি। চাকরির প্রথম দিকে একবার জাতিসংঘ শান্তিমিশনে বাংলাদেশের পুলিশের হয়ে বিদেশ গিয়ে কিছু টাকা জমিয়ে ফেরার সময় সেই টাকা নিয়ে এসে ঢাকা ও গোপালগঞ্জ শহরে কিছু জমি কিনেছিলেন। গোপালগঞ্জ শহরের জমি নিয়ে এখন তিনি মহাবিপদে আছেন। বিদেশে থাকা অবস্থায় ভাইবোনদের জিম্মায় সেই জমির দায়িত্ব দিয়ে রাখার পর এখন তাকে প্রতারণা করে আপন ভাইবোনরা সেই জমি আত্মসাতের সকল প্রকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ভাইবোনদের উপকার করতে গিয়ে এখন তিনি তাদের দ্বারাই প্রতারিত হয়ে নিজ জমির জন্য ভাইবোনদের কাছে হাপিত্যেশ করে মরছেন। একজন পুলিশ-অফিসারের এই দুর্দশা দেখে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছি। তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা বলতে গেলে আমাদের পারিবারিক সদস্যদের মতো। চোখের সামনে দেখছি, স্বামীর এই দুরবস্থায় মা-মেয়ে কীভাবে মুষড়ে পড়েছেন।

তার স্ত্রী একজন কবি ও সমাজসংগঠক, যিনি মাতৃস্নেহে দেবরদের মানুষ করেছেন। বিপদে সবসময় স্বামীর পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন। ১৪ বছর বয়সী বড় মেয়ের আকস্মিক অকালমৃত্যুতে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া একজন মায়ের জীবনসংগ্রামের কথা আমরা জানি। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই নারী যাদের মানুষ করেছেন, যাদের সেবাশুশ্রƒষা করেছেন, তারাই আজ ভাইকে তো ঠকাচ্ছেই, একইসঙ্গে ভাবীকেও পারলে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। একদিকে চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চনা, অন্যদিকে ভাইবোনদের প্রতারণায় বিধ্বস্ত সেই এএসপি এখন শুধু চাকরি করেন। সময় পেলেই নামাজ পড়েন আর মোনাজাত করেন। আল্লার উদ্দেশ্যে হাত তুলে প্রার্থনা করে কাঁদেন। প্রার্থনায় বলেন, “আল্লাহ, আমি কেন গোপালী হলাম? কেন আমার পুলিশে চাকরি হলো? আমি কী পাপ করেছিলাম?” তার এই প্রার্থনা শুনে স্ত্রী কাঁদেন, কন্যা কাঁদে। আর আমি মনে মনে ভাবি, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য হয়ে এমন বোকা কেউ হতে পারে? সে কি জানে না, এদেশে যারা সৎ, তাদেরকে সকলে বোকা মনে করে? এ-নিয়ে তার সঙ্গে হাসিঠাট্টা করেও দেখেছি, তারপরও তিনি তার অবস্থানে অনড়। আর যাই করুন, তিনি জীবনে তদবির বা অসততা করে কিছু করবেন না! এদেশের বাস্তবতায় সত্যি তাকে বোকা মনে হতে পারে। কিন্তু যদি একবার নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখি, এমন সৎ পুলিশ কর্মকর্তাই কি এদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নয়? তখন কি তার প্রতি নিজের মাথাটা শ্রদ্ধায় আপনিই নত হয়ে আসে না?

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়

সর্বাধিক পঠিত