প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্নাতক পরীক্ষার্থী অটোরিকশা চালক; ছোট ছেলে রাজুর গল্প….

মাহফুজ নান্টু : ভাই আসেন- আসেন, কই যাইবেন? আড়াইওড়া, পালপাড়া, মহেষপুর বলে যাত্রীদের ডেকে যাচ্ছে এক যুবক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পোষাক ও কথা বলার ঢং অন্য অটোরিক্সা চালকদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। নিজের অটোরিক্সার পাশে দাড়িয়ে অনবরত যাত্রীদের এক নাগাড়ে ডেকে যাচ্ছে । কয়েকজন যাত্রী রিকশার ভেতরে আছেন। আর একজন যাত্রী হলেই গন্তব্য’র উদ্দেশ্য ছেড়ে যাবে পরিবারের ছোট ছেলে স্নাতক পরীক্ষার্থী রাজু আহমেদের অটোরিকশাটি ।

২০১৬ সাল থেকে অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ করা ছাড়াও নিজের লেখাপড়াটাও চালিয়ে যাচ্ছে । সামনে স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষা। এখন পড়ালেখায় আরো সময় দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু ঘরে বাবা- মাকে অভুক্ত রেখে লেখাপড়ায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়া সম্ভব নয়। তাই রাতে অটোরিকশা চালায় আর দিনে পরীক্ষার প্রস্তুতি চলতে থাকে রাজুর।

কথা হয় অটোরিকশা চালক স্নাতক পরীক্ষার্থী রাজু আহমেদের সাথে। কুমিল্লা শাসনগাছা এলাকার মোঃ রফিক মিয়ার দু’ ছেলের মধ্য রাজু ছোট । বড় ছেলে রনি।


রফিক মিয়া এক সময় শাসনগাছা এলাকায় যাত্রী বাসের বডি মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন। বয়সের সাথে অসুস্থতা পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় বাসের বডি মিস্ত্রি রফিক মিয়ার আর তাই ঘরে বসে বিশ্রাম নেয়া ছাড়া উপায় নেই। রফিক মিয়ার পরিবারের এমন কঠিন মুহূর্তে পরিবারের হাল ধরে রফিক মিয়ার ছোট ছেলে সদ্য এসএসসি পাশ করা রাজু আহমেদ। বিনয়ী আর দৃঢ়চেতা রাজু একটি বেসরকারী মুঠোফোন কম্পানীতে মার্কেটিংয়ে চাকরী নেয়, বেতন কম সময় দিতে হয়। তাই মুঠোফোন কোম্পানীর চাকরী ছেড়ে দিয়ে আবারো চাকরী নেয় মোবাইল ফোন সীম বাজারজাত করনের চাকরী।সেখানেও একই অবস্থা। দৈনিক ১২/১৩ ঘন্টা কাজ করতে হয়।এর মাঝে কিছু টাকা জমায় রাজু। তবে খুব বেশী সময় চাকরীর পেছনে চলে যায়, এতে লেখাপড়ার সময় বের করা কঠিন হয়ে পরে । এমন কষ্টের মাঝেই এইসএসসি পাশ করে রাজু। ভর্তি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে। কর্পোরেট কোম্পানির মার্কেটিংয়ের চাকরী বাদ দিয়ে শুরু করে নতুনভাবে পথচলা। নিজের জমানো টাকায় একটি অটোরিকশা কিনে নেয় রাজু। সুন্দর আলোসজ্জা আর মনোমুগ্ধকর প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে সাজিয়ে নেয় অটোরিকশাটি।

বছর ঘুরতেই বড় ভাই রনির জন্য একটি অটোরিকশা কিনে রাজু। নিজেই বড় ভাইকে বিয়ে করিয়ে সংসারী বানায়। এখন বড় ভাই স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকে। এ বিষয়টাও রাজুর কাছে আনন্দের। নিয়মিত না পারলেও মাঝে মধ্যে বাবা মাকে আর্থিক সহযোগিতা করে পরিবারের বড় সন্তান রনি। তবে হাসি মুখেই সংসারের মূল ভরণপোষণ চালিয়ে নেয় পরিবারেট ছোট ছেলে রাজু। তবে এত কিছুর মাঝেও রাজু তার লেখাপড়া ছাড়ে নি। আর কিছুদিন পর রাজুর স্নাতক ফাইনাল পরীক্ষা। ভালো ফলাফল করতে হলে বেশী সময় দিতে হয়। কিন্তু রাজুর বেলায় তা সম্ভব না। পরিবারে বাবা মা কে অভুক্ত রেখে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে মন সায় দেয় না । তাই রাতের বেলা অটোরিকশা চালায়। পরের দিন একটু বেলা করে উঠে কিছু মুখে দিয়ে পড়ার টেবিলে বসে। পড়তে বসার আগে মনে করে রিকশার ব্যাটারি চার্জে দেয়। সন্ধ্যায় অটো রিকশা নিয়ে বের হয় রাজু। মধ্য রাতে বাসায় ফেরে। বেশী রাত জাগলে দিনে পড়ালেখায় ক্ষতি হবে, তাই বাসায় এসে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে যায়। স্বপ্ন দেখে রাজু। অল্প কিছুদিন পর তার স্নাতক শেষ হবে। তারপর স্নাতকোত্তর। সরকারী একটি চাকরী রাজুর স্বপ্ন। স্বপ্নটা রাজুর বাবা- মা’রও। বাবা মা কে নিয়ে সুখে থাকবে। আত্মপ্রত্যয়ী বিনয়ী রাজুর সারল্য আছে- আছে দৃঢ় প্রত্যয়, জীবনে কিছু করে দেখিয়ে দেয়ার এক অদম্য ইচ্ছাও। কারো দয়া বা অনুকম্পায় নয়, যতক্ষন সম্ভব ততক্ষন চালিয়ে যাবে জীবনযুদ্ধ । একটি অটোরিকশাই রাজুর হাতিয়ার। আর যুদ্ধ জয়ের অদম্য শক্তি যেন রাজুর দেহমন থেকে চুঁইয়ে পড়ছিলো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত