প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একুশ শতকের শিক্ষার মানোন্নয়নের চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : গত দুইশো বছরে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থা, দর্শন, উপযোগিতা, প্রায়োগিকতা এবং বিশ্ব ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের ক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থাই মানুষকে চিন্তা শক্তিতে এতোটাই পরিবর্তিত করেছে যে, মানুষ গত দুইশো বছরে পৃথিবীকে যেভাবে বদলে দিয়েছে তা পূর্ববর্তী লাখ লাখ বছরে মোটেও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এখন পৃথিবী যে গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে তাতে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান, দক্ষতা, ক্ষমতা ইত্যাদি এতোটাই গতিময়তা লাভ করেছে যে, প্রতি ৫ বছরেই পৃথিবীর অনেক কিছু সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও তথ্য জ্ঞান এ শতকের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমরা কেউ বলতে পারবো না ২০৩০ সালে পৃথিবী কতোটা পাল্টে যাবে। ২০৫০ বা ২১০০ সালের কথা তো কল্পনাই করা যাবে না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা যদি এখন না ভাবি তাহলে আমাদের জনসংখ্যা নিয়ে আমরা হয়তো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারি। আবার এখনই যদি শিক্ষাকে পৃথিবীর বর্তমান গতিময়তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিই তাহলে আমরা যথার্থই একটি মানবসম্পদে সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হতে পারবো। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে ভাবনা এখনো অনেকটাই গতানুগতিক, বিশ শতকের মাঝামাঝির চাইতে বেশি কিছু নয়। অথচ আমাদের এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা ইত্যাদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কয়েক কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। কিন্তু তারা বা তাদের অভিভাবকরা খুব বেশি জানেন না যে, শিক্ষাটা আসলেই কী শুধু সনদ লাভ করার জন্য, নাকি জ্ঞান-বিজ্ঞানের চিন্তা শক্তিতে উদ্ভাবনী মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য? আমরা এখনো জানি না আমাদের ইতিহাস পঠন-পাঠনের সঙ্গে এ দেশের সমাজ বাস্তবতার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও সক্ষমতা কতোটুকু রয়েছে। আমরা এটা জানি না বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম আমাদের শিক্ষার্থীদের কতোটা একুশ শতকের দক্ষ মানুষে রূপান্তরিত করতে সক্ষম।

আমরা কী বুঝতে পারি যে সারা পৃথিবীতে অর্থনীতি এখন কতোসব তাত্ত্বিক, প্রযুক্তিগত ও প্রায়োগিক সমস্যা অতিক্রম করে চলছে? এসব বুঝতে বা মোকাবেলা করতে না পারলে আমাদের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারবে না। বিশ্ব এখন যেমনিভাবে ব্যাপক সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে, একইসঙ্গে এর জটিলতাও ব্যাপকভাবে বেড়ে চলছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পারলে আমরা হ্যাক হয়ে পড়তে পারি। সেক্ষেত্রে আমাদের গতিস্তব্ধ হয়ে পড়তে বাধ্য। আবার সেই স্তব্ধতা কাটিয়ে উড়তে হলে আমাদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। অথচ আমাদের দেশে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হচ্ছে যাদের বিষয়গত জ্ঞান একুশ শতকের উপযোগী মানে দেয়া হয় না। এই অদক্ষ জনগোষ্ঠী পাঁচ বা দশ বছর পরে কী করবে? আমরা এসব নিয়ে আদো ভাবছি কী? যদি ভাবতাম তাহলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বনি¤œ স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত মানসম্মত একুশ শতকের উপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের অপরিহার্যতা উপলব্ধিতে এক মুহূর্ত দেরি করতাম না।

দুই বছর পর আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপকল্প আছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে নেই কোনো তাগাদা। অথচ শিক্ষা ক্ষেত্রে একুশ শতকের যুগোপযোগী মান অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ ব্যতীত বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন ঘটানো মোটেও সম্ভব হবে নয়। এ কারণে এখনই দরকার বিশ্বব্যাপী জ্ঞান, বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তি, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিকসহ নানা ক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনকে উপলব্ধিতে নিয়ে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। এর জন্য অর্থ বরাদ্দ, কারিকুলাম প্রণয়ন, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও বিশ্বদীক্ষার ধারণাগত বাস্তবতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার দর্শনই অনুপস্থিত। একুশ শতকের সামগ্রিক পরিবর্তনশীলতার ধারণা তো কল্পনাই করা যায় না। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই ষোলো কোটি মানুষকে জনসম্পদে পরিণত করার শিক্ষাক্রম প্রণয়নে হাত দেয়া সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। এর কোনো বিকল্প বাংলাদেশের সম্মুখে খোলা নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত