প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আদিবাসী ও সংখ্যালঘুরা চান প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ

সমকাল :  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমতলের আদিবাসীদের একমাত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের জুয়েল আরেং। তিনি নির্বাচন করছেন ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে। তুলনায় পাহাড়ের পরিস্থিতি একটু ভালো। সেখানে আট আদিবাসী প্রার্থীর পাঁচজনই বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির। পার্বত্য তিন জেলাতেই আওয়ামী লীগ বরাবর আদিবাসীদের প্রার্থী করে থাকে। বিএনপি থেকেও এবার রাঙামাটি ও বান্দরবানে আদিবাসীদের প্রার্থী করা হয়েছে।

দলীয় ও স্বতন্ত্র হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এক হাজার ৮৪৮ জন। এর মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু প্রার্থী মাত্র ৭৮ জন। প্রায় এক কোটি সংখ্যালঘু ভোটারের তুলনায় নির্বাচনে এসব জনগোষ্ঠীর প্রার্থীসংখ্যা অনেক কম। এর পরও যারা নির্বাচিত হন, তারা মূলত বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্য। ফলে নিজস্ব জনগোষ্ঠীর সরাসরি প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে তারা খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন না বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা তাই সরাসরি তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে চান সংসদে। এ জন্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার অনুপাতে সেখানে আসন সংরক্ষণ করা উচিত বলে মত দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে যেসব সংসদীয় আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার রয়েছে, সেখানে সংখ্যালঘু প্রার্থী মনোনয়ন দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘নির্বাচন এলেই নিরাপত্তা সংকটে ভোগেন পাহাড়ি ও সমতলের আদিবাসী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা। এ ছাড়া অন্য সময়ও নানা কারণে জুলুম-নির্যাতন চলে তাদের ওপর। নিরাপত্তার পাশাপাশি আদিবাসীদের রয়েছে ভূমি সমস্যা। সমাজের অন্যান্য অংশের তুলনায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নানা ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে। বৈষম্য দূর করতে এসব সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। এ জন্য সংসদে তাদের নিজেদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি।’

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘সংসদে এমন ব্যক্তিরাই যাবেন, যারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন। এর পরও সমাজে যত ধরনের মানুষ আছে, সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকা ভালো। এটা যত দিন হবে না, তত দিন রাজনৈতিক দলগুলোর এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া উচিত, যারা সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে উঠে আসবে।’

কার কত প্রার্থী :এবার সংসদ নির্বাচনে ১৮টি রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক দলের ৭৮ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী রয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। দলটি ১৮ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জন বর্তমানে সংসদ সদস্য। বিএনপির সংখ্যালঘু প্রার্থী ছয়জন। বাম দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)- ১৭ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের আটজন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাতজন ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি-এনপিপি, গণফোরাম ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ তিনজন করে; ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের দু’জন এবং জাকের পার্টি, তরীকত ফেডারেশন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল ও গণতন্ত্রী পার্টির একজন করে সংখ্যালঘু প্রার্থী রয়েছেন। আর আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) একজন এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফের একজন প্রার্থী রয়েছেন। এ দু’জন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছেন ময়মনসিংহ-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মান্দি (গারো) সম্প্রদায়ের জুয়েল আরেং এবং নওগাঁ-১ আসনে সাঁওতালদের একজন মঙ্গল কিস্কুকে প্রার্থী করেছে বাসদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় আটজন আদিবাসী প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। তারা হলেন- বান্দরবানে আওয়ামী লীগের বীর বাহাদুর উ শৈ সিং ও বিএনপির সাচিং প্রু (মারমা), খাগড়াছড়িতে আওয়ামী লীগের কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ও স্বতন্ত্র হিসেবে ইউপিডিএফের নতুন কুমার চাকমা এবং রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগের দীপঙ্কর তালুকদার (চাকমা), বিএনপির মনি স্বপন দেওয়ান (চাকমা), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির জুঁই চাকমা এবং জেএসএসের উষাতন তালুকদার (চাকমা)।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, এবার সংখ্যালঘু প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, এটা আশাব্যঞ্জক। তবে দেখতে হবে, যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, দল তাদের নির্বাচিত করে নিয়ে আসতে ভূমিকা রাখছে কি-না। রাখলে ভালো, না হলে বুঝতে হবে মনোনয়ন হয়েছে লোক দেখানো।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, ‘নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। ফলে ৭৮ জন প্রার্থী হলেও আলোচনায় থাকা প্রার্থী এর এক-তৃতীয়াংশ। বাকিরা নির্বাচনে খুব বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না বলে মনে করেন তিনি।

জানতে চাইলে ঢাকা-৬ আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও গণফোরাম নেতা সুব্রত চৌধুরী বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এর বিরুদ্ধেই তাদের লড়াই। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট জিতলে গণতন্ত্র ফিরবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর হবে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে ১৫টি সংসদীয় আসনে প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে সংখ্যালঘু ভোটার। আর ৩০টি আসনে সংখ্যালঘুদের ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে রানা দাশগুপ্তের দাবি, প্রায় ১০০টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটাররা প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রভাব রাখতে পারেন। তিনি বলেন, ভোটার সংখ্যা হিসাবে সংখ্যালঘুদের জন্য ৩৩ থেকে ৩৫টি আসন সংরক্ষণ প্রয়োজন।

প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ ও দাবি-দাওয়া :ঐক্য-ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর যেসব সংখ্যালঘু সংসদ সদস্য থাকেন, তারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজেদের সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশা, বৈষম্য ও নির্যাতনের কথা খুব বেশি তুলে ধরতে পারেন না। এ জন্য সংসদে সংখ্যালঘুদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত। সর্বোপরি দেশ যদি মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় পরিচালিত হয়, তাহলেই সব বৈষম্য দূর হয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

জানতে চাইলে আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো আদিবাসীদের প্রতি সংবেদনশীল নয়। নিজেদের প্রতিনিধি না পেলে আদিবাসীরা কখনোই বৈষম্যমুক্ত সমাজ পাবে না।

আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যা কিছু বলা হয়, তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। সমতলের অধিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও তা হয়নি। সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে অঙ্গীকার রাখা হয়নি। বৈষম্য বিলোপের আইন পাস হয়নি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যা অঙ্গীকার করে, তার অধিকাংশ রক্ষা করে না। বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাস বলেন, দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান সামাজিক ও পেশাভিত্তিক বৈষম্য নিরসনে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ সংসদে পাস করতে হবে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘বাংলাদেশের সমতলের আদিবাসীদের জন্য কোনো মন্ত্রণালয় না থাকায় তাদের উন্নয়নে যথাযথ কাজ হচ্ছে না। পৃথক মন্ত্রণালয় না হলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক বিভাগ বা অধিদপ্তর খোলা যেতে পারে। আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের এই আহ্বায়ক বলেন, দলিত সম্প্রদায়ের বৈষম্য বিলোপের জন্য একটি এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নিরাপত্তা বিধান ও অধিকার সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আদিবাসীবিষয়ক একটি বিল অনেক প্রচেষ্টারও পর সংসদে উত্থাপিত করা সম্ভব হয়নি। সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশনও গঠন করা যায়নি। আগামীতে সরকার এলে অগ্রাধিকার পাবে এই বিষয়গুলো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত