Skip to main content

শ্রেণি, গাড়ি, মটরবাইক চালক এবং পথচারি…

আফসান চৌধুরী : ষাটের দশকের সেই ঢাকাকে আমি স্মরণ করতে পারি। অলস, বৃষ্টিভেজা, বৃক্ষপল্লবিত, পছন্দ করার মত একটা শহর ছিলো। প্রশান্ত সেই সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠছিলো মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সেই শহরে কেবল পাকিস্তানীরাই ছিলো প্রকৃত অর্থে ধনী। কাজেই কোন ধনী মানুষের সঙ্গে পরিচয় না থাকাটা এক অর্থে ভালোই ছিল। শহরের রাস্তায় কদাচিৎ দু’একটা গাড়ি দেখা যেত। বেশি ছিল রিকশা, রিকশা নিয়ে কারো মধ্যে কোন অভিযোগ ছিলো না। মানুষকে তখন তেমন একটা হাঁটতে হতো না, কারণ রিকশা সহজেই পাওয়া যেত। যারা দূরে যাবেন তারা বাসে চড়তেন। পায়ে হাঁটার ওপর নির্ভর করতেন তারাই, যারা সেই ব্যয়ভার বহন করতে পারতেন না। আবার অনেকে কেবল আনন্দ কিংবা বিনোদনের জন্যও হাঁটাহাঁটি করতেন। এমন একটি শহর বদলে যেতে থাকে ১৯৭১ সাল থেকে। এরপর থেকেই দ্রুত রিকশা ভাড়া বাড়তে থাকলো। অন্য সব কিছুর মতো বাড়তে থাকলো বাসভাড়াও। শহরে ঢুকতে থাকলো ব্যক্তিগত গাড়ির বহর। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির এই সময়ে মানুষের অর্থনীতিরও উন্নতি দৃশ্যমান হলো। কিন্তু গণপরিবহন খাতে বাড়লো না বিনিয়োগ। ফলে গণপরিবহনে কোন উন্নতি দেখা গেলো না। এর অর্থ কি তাহলে এমনটাই দাঁড়ালো যে- মানুষ আরো বেশি পায়ে হাঁটার উপর নির্ভর করতে থাকলো? কিন্তু শহরটি তো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়নি- যা থেকে মানুষ পায়ে হাঁটতে আগ্রহী হবে। বরং পরিকল্পনাটা ছিল হাঁটাহাঁটি হবে সীমিত পরিসরে, অবসর বিনোদন বা পার্কে ঘোরাঘুরির জন্য। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যে ফুটপাত আছে, ব্যস্ত সময়ে সেগুলো পথচারির পরিবর্তে মটরসাইকেল চালকদের দখলে থাকে। নাগরিকরা যখন একটি বাস বা রিকশায় ওঠার চেষ্টা করেন, তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা গাড়ি কিংবা মটরবাইকের প্রতিবন্ধকতার। আমি নিজে আমার কাজের জায়গায় যেতে যে হাঁটার রাস্তাটি ব্যবহার করতাম, সেটি এখন বন্ধ। আমি লক্ষ্য করেছি, এই পথটি এতদিন কাজের বুয়া, ছোট ছোট দোকানের কর্মচারি ও ড্রাইভাররা ব্যবহার করতো। আশপাশের বস্তিগুলো থেকে আসতো তারা। মধ্যবিত্তরা হেঁটে অফিসে যায় না, কারণ এটা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত লোকেরা তো তাদের গাড়িই ব্যবহার করেন। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব যন্ত্রচালিত যানবাহনবিহীন সমাজে অর্থাৎ যারা হাঁটাহাঁটি করে, আমরা আসলে তাদের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আছি। রিকশাও এখন পরিকল্পনা ছাড়াই চলাচল করে। বাসগুলোতে এতো ভিড় থাকে যে, তা একেবারেই স্বস্তিদায়ক নয় বরং হয়রানিমূলক। এমনকি গাড়িও এখন আর স্বস্তিদায়ক যানবাহন নয়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দ্রুতগতির জন্য অনেক তরুণরাই এখন সাইকেল ব্যবহার করছে। এটা ভালো। কিন্তু কথা হলো-কত মানুষ সাইকেল ব্যবহার করতে পারে বা করবে? এটা আসলে তরুণদের ব্যবহার উপযোগী যান। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক বা বৃদ্ধদের পক্ষে সবসময় সাইকেল চালানো সম্ভব নয়। তাহলে কি মোটরবাইক? অবশ্যই মোটরবাইক গাড়ির চেয়ে ভালো। আর তা ‘পাঠাও’ এর জনপ্রিয়তা দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু এটি কি একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা? কারণ এই শ্রেণির মানুষজন কিভাবে যাতায়াত করবে তা নিয়ে সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। আর এই মানুষদেরও অন্য কোন বিকল্প নেই। শেষে একথা বলা যায়, এদেশের মানুষের সামাজিক অবস্থান বোঝা যায়, তাদের যাতায়াতের ধরণ বা যানবাহন দেখে। গরীবরা হাঁটে। মধ্যবিত্তরা বাসে বা বাইকে চড়ে। উচ্চ-মধ্যবিত্তরা মোটরবাইকে আর উচ্চবিত্তরা গাড়িতে চলাফেরা করে। যার যা আছে।

অন্যান্য সংবাদ