প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভোট মিছে তো ষোলো আনাই মিছে

কাকন রেজা : চলতি ইস্যুর উপর লেখাই হয়তো চলতি সময়ের নিয়ম। বলতে গেলে শুধু নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ফোকাস করা, তার আগে-পরের বিষয়টি ‘আউট অব ফোকাস’ হলেও অসুবিধা নেই। নির্বাচনের এই মৌসুম ঘিরে সদ্য-সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিই। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি দলবদল করে বিএনপিতে গিয়েছেন এবং সাথে মনোনয়নও নিশ্চিত করেছেন। রনির এই দলবদল ও মনোনয়ন প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে অনেকেই লিখেছেন। রনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েই বিএনপিতে গিয়েছেন, না হলে যেতেন না, তার আদর্শের কোনো বালাই নেই ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ সেসব বিশ্লেষণ। এমনতর বিশ্লেষণের সাথে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর বিএনপির বাংলাদেশি, দুটোর মধ্যে যোজন ফারাক। আওয়ামী লীগের সমাজতান্ত্রিক আবহের গণতান্ত্রিক ধারণা আর বিএনপির গণতান্ত্রিক চিন্তার মধ্যেও রয়েছে বিস্তার পার্থক্য। সুতরাং একটি বিপরীত ধারণার দলে সহসাই যোগদানের বিষয়টি আদর্শ সম্পর্কিত ব্যাপার-স্যাপারের সাথে ঠিক যায় না।

না যাক। আমার কথা যাওয়া না যাওয়া নিয়ে নয়, ‘ফোকাস’ আর ‘আউট অব ফোকাস’ নিয়ে। সেজন্যেই বলেছিলাম, নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ফোকাসের বিষয়টি। গোলাম মাওলা রনির উপর যারা ফোকাসটিকে নির্দিষ্ট করেছেন, তখন তাদের আগ-পরের এমনতর ঘটনাগুলো ‘আউট অব ফোকাস’ হয়ে গিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের সুলতান মোহম্মদ মনসুর যেখান থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন সেখানে মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন এমন ধারণা করে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী একজন দলবদল করেছিলেন। তখন কিন্তু সেই ব্যক্তিটির আদর্শ নিয়ে, নীতি বিষয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। এমনকি তার নামটিও অনেকে মনে করতে পারবেন না। অথচ রনির উপর ফোকাসটা ছিল হাই পাওয়ারের।

বি চৌধুরী রিভার্স সুইং করে পাল্টি খেলেন। মাহি বললেন, তিনি জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাস করেন এবং জিয়ার রাজনীতি করেন। অথচ কর্মকান্ডে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। এসব নিয়েও নীতি আদর্শে তেমন কোনো কথা হলো না। না হোক, তাতেও আপত্তি নেই। যেখানে বিশ্বাসই হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘রাজনীতির শেষ কথা নেই’, সেখানে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু আপত্তিটা হলো ওইখানে, যেখানে গোলাম মাওলা রনির উপর ‘ফোকাস’ করতে গিয়ে পূর্বাপর সম-ঘটনাকে ‘আউট অব ফোকাস’ করে দেয়া হয়, নিদেনপক্ষে চেষ্টা হয়। যেখানে কে মনোনয়ন পেলো, কে পেলো না, সে বিষয়টিকে ‘ফোকাস’ করতে গিয়ে, আচরণ বিধির যে বারোটা বাজলো, সবার জন্য নির্বাচনের ক্ষেত্র সম হলো কিনা, সেসব ‘আউট অব ফোকাস’ করে ফেলা হয়, আপত্তিটা সেখানে। ড. কামাল হোসেন কোনো নির্বাচনে জিতেছিলেন কিনা, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি পারবেন না, এসব আলোচনার দাপটে জনগণ নির্বাচন করতে পারবে কিনা তাকে ‘আউট অব ফোকাস’ করে ফেলা হয়, আপত্তির প্রশ্নটা ওঠে তখনই।

বিগত নির্বাচনে বিএনপি না গেলেও প্রায় দেড়’শ আসনে প্রার্থীরা ভোটের মাঠে ছিলো, বিপরীতে জনগণ ভোটের দিন কেন্দ্রে ছিলো কিনা, সেটাই ছিলো মূল ফোকাসের বিষয়। এবারের নির্বাচনেও মানুষ কেন্দ্রে থাকবে কিনা, থাকলেও ভোট দিতে পারবে কিনা, এটাই হাল সময়ের ফোকাসের প্রধান বিষয়। ভোটের সাথে সম্পর্ক গণতন্ত্রের, গণতন্ত্রের সাথে রাষ্ট্রের। সঙ্গতই ভোটের ব্যর্থতা মানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। একজন ভোটার যখন ভোট দিতে ব্যর্থ হয়, তখন ওই ভোটার নয়, ব্যর্থ হয় রাষ্ট্র। আর ব্যর্থ রাষ্ট্রের মূল্য কতোটুকু তা গ্লোবাল পলিটিক্সের দিকে নজর দিলেই বোঝা যায়। সাদ্দাম আর গাদ্দাফির অটোক্র্যাসির কথা চিন্তা করলেও তা বোধে আসে।

গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয় যখন মানুষের ভোট প্রদানের অধিকার নিশ্চিত হয়। একটা রাষ্ট্রের কার্যকর হওয়া নির্ভর করে গণতন্ত্র কতোটা কার্যকর তার ওপর। আর গণতন্ত্রের ভিত্তিই হলো নির্বাচন, সেই নির্বাচনেরই যদি বারোটা বাজে, তবে গোলাম মাওলা রনি’দের নিয়ে মাথাব্যাথা অর্থহীন। ভোট প্রশ্নবিদ্ধ হলে, গণতন্ত্রও অর্থহীন। আর গণতন্ত্র অর্থহীন হওয়া মানে, রাষ্ট্রও অর্থহীন। অর্থাৎ সব শেষের হিসাব হলো, ‘ষোল আনাই মিছে’র হিসাব। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত