প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী
মানবতার মুক্তির দিশারী মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমন ও বিদায়

আলহাজ্ব আব্দুম মুনিব : আরবী হিজরী সালের রবিউল আওয়াল মাসের আজ ১২ তারিখ। আমরা অনেকেই আরবী মাসের হিসাব রাখি না। আজ আমাদের জন্য যেমন আনন্দের দিন তেমন দুঃখের দিন । এই দিনে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দুনিয়াতে আগমন এবং বিদায়। আজকের দিনটি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন । এ দিনে আল্লাহ্ তায়ালার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, যাকে সৃষ্টি না করলে একটি ধুলিকনাও সৃষ্টি করতেন না, শ্রেষ্ঠ মানুষ, নবীদের সর্দার, মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মদিবস।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১৪শ বছর পূর্বে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার সুবহে সাদিকের সময় মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে মা আমিনার গর্ভে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। জন্মের পূর্বে তার জন্মদাতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। জন্মের মাত্র ৬ বছর পরে শিশু মুহাম্মদকে রেখে ধরাধাম থেকে বিদায় নেন জন্মদাত্রী মাতাও। এতিম মুহাম্মদ (সাঃ) শিশু ও বাল্যকালে চরম কষ্ট সহ্য করে স্বীয় দাদা আব্দুল মুত্তালিবের গৃহে লালিত-পালিত হন। এ আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যু পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর শৈশবকাল, বাল্যকাল এবং তারুন্যে অনেকগুলি অলৌকিক ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে মানুষের কাছে পরিলক্ষিত হয়। যুবক বয়সে আরবের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী হযরত খাদিজা (রাঃ) এর ব্যবসা দেখাশুনা করতেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে এবং ব্যবসায়িক কৃতকর্মে খুশি হয়ে হযরত খাদিজা (রাঃ) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিবাহের সময় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ২৫ বছর এবং হযরত খাদিজা (রাঃ) এর বয়স ছিল ৪০ বছর।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স যখন ৪০ বছরের কাছাকাছি তখন নবুওয়াতির লক্ষন তার মধ্যে পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। বিশ্ব ভ্রম্মান্ডের অধিবাসীদের কর্মকান্ড দেখে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন এবং মুক্তির পথ খুঁজতে থাকেন। এসময় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রায়শই ভূমি থেকে প্রায় ২২শ ফুট উঁচু হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান করতে আরম্ভ করেন। অবশেষে আসে সে কাঙ্খিত দিন, যেদিন আল্লাহ তায়ালা বিশ্ববাসীর নাজাতের ওসীলা হিসেবে অবতীর্ণ করতে শুরু করেন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স যখন ঠিক চল্লিশ বছর তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি রেসালাতের দায়িত্ব অর্জন করেন । হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে প্রথম ঐশ্বরিক বাণী-“ পড় তোমার প্রভূর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন”(সূরা আলাক্বঃ ০১)।

রেসালাত ও নবুওয়াতের দায়িত্ব পাওয়ার পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া জন্য আহ্বান করতে শুরু করেন । প্রথমদিকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দাওয়াতে তার একান্ত কিছু আত্মীয় এবং হিতাকাঙ্খীরা সাড়া দিলেও বিগড়ে যান অনেকে। পৌত্তলিক আচার ছেড়ে তারা কোন অবস্থায় ইসলামে প্রবেশ করবে না বলে শপথ নেন। নবীজীর দাওয়াতে সাড়া না দিয়ে উল্টো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে তার পথ থেকে সরে আসার প্রস্তাব দেয়। তারা আরও বলেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যদি তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয় তবে, মক্কার সবচেয়ে রুপসীকে তার জন্য এনে দেয়া হবে এবং মক্কার সবচেয়ে ধনবান ব্যক্তি হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়া হবে। ইসলামের শত্রুদের এ সকল প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার পরে কাফেররা বিভিন্নভাবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর নির্যাতন করতে আরম্ভ করে। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে হত্যা করা হবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আল্লাহ কাফেরদের ষড়যন্ত্রের কথা তার রাসূল (সাঃ) কে অবহিত করে তাকে মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করার আদেশ দেন ।

নবুওয়াত প্রাপ্তির মাত্র ১২ বছর অতিবাহিত হতে না হতেই ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার অনুচরবৃন্দসহ মক্কা ছেড়ে মদিনা অভিমূখে যাত্রা করেন । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্ম ভূমি মক্কার লোকেরা তাকে সঠিক ভাবে মূল্যায়ণ করতে না পারলেও মদিনাবাসী রতে্নর মূল্য বুঝতে বোকামী করেনি। তারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে আশ্রয় দেয় এবং হৃদয়ের মনিকোঠায় স্থান দেয়। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মদিনার বিধর্মীদের সাথে লিখিত ৪৭ টি সনদ সম্বলিত একটি চুক্তিপত্র করেন। ইসলামের ইতিহাসে যা মদিনা সনদ নামে পরিচিত। কথিত আছে বিশ্বের বুকে মদিনা সনদই প্রথম লিখিত সংবিধান। ইসলামী আইন-কানুন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মদিনা সনদের আলোকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পবিত্র মদিনা শরীফকে একটি কল্যান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তৃতি হতে থাকে। দলে দলে মানুষেরা শান্তির স্পর্শ পেতে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে প্রবেশ করে ।

৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৮ হিজরীতে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার দশ সহ¯্রাধিক সৈন্য নিয়ে মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং মক্কা বিজয় করেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর যে সকল মানুষগুলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল তাদেরকেও তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করেন। আবারও মানুষদেরকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহন করার আহ্বান জানান। মক্কা বিজয়ের পরে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আবারও মদিনায় ফিরে যান। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে পুনরায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কায় গমন করেন। মক্কায় হজ্জ কালীন সফরের মধ্যেই আল্লাহ তা’আলা তার প্রতি নাযিল করেন-‘‘আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম, এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের উপর পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য ধর্ম হিসেবে মনোনীত করে দিলাম”। এ আয়াত অবতীর্ন হওয়ার পর সাহাবীরা অঝোড় ধারায় কাঁদতে শুরু করলেন।

তখন রাসূল (সাঃ) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কাঁদছো কেন ? সাহাবীরা বললেন আমরা বুঝতে পারছি, অচিরেই আল্লাহ আপনাকে তার মেহমান করে নিবেন। কেননা কোন জিনিস পূর্ণতা পাওয়ার পর সেটা কমতে শুরু করে। যেহেতু ইসলাম পূর্ণতা পেয়েছে তাই আপনাকে আর আমাদের মধ্যে রাখা হবে না। হজ্জ্ পালন শেষে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে মদিনায় চলে আসেন। অবশেষে আসে সেই দুঃখের দিন, শোকের দিন । ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ তথা ১০ই হিজরী সনের ১২ই রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার পৃথিবীর মানুষকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন রাসুল (সাঃ)।

তার প্রস্থানে তার অনুসারীরা পাগল প্রায় হয়েছিল । শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ইন্তেকালের সাথে সাথে নুবওয়াতের দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। মহান আল্লাহর কাছে কোটি কোটি শুকরিয়া তিনি এই গুনাহগার বান্দাকে মক্কা মদিনার পবিত্র মাটি স্পর্শ করার সৌভাগ্য দান করেছেন। সৌভাগ্য দান করেছেন নবী পাকের রওজার সামনে দাড়িয়ে সালাম পেশ করার। আজ এ বিশেষ দিনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাই, যাতে কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সুপারিশ আমাদের নসীব হয়, আমিন ।

লেখক- কামিল (আল হাদিস) মাস্টার্স (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।-

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ