প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেধাবীদের রাজনীতির বাইরে রেখে পালাবদল কি সম্ভব?

ড. সেলিম জাহান : উঠতো না বিষয়টি, যদি না একটি সামাজিক আসরে আমার বন্ধুটি ঐ কথাটি না বলতেন। জোর এবং বেশ উত্তপ্ত আলোচনা চলছিল বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে নানা মন্তব্য আসছিলো নানা জনের কাছ থেকে। কে কে মনোনয়ন চাইছেন, কে কে মনোনয়ন পেতে পারেন, কে কে নিরাশ হবেন – এই নিয়ে নানান জল্পনা ও কল্পনা। এর মধ্যেই আমার বন্ধুটি বলে বসলেন, ‘মেধাবী মানুষদের নির্বাচন করা ও রাজনীতিতে আসা উচিত নয়, কারণ ভালো মানুষেরা আমাদের দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারবে না এবং কিছুই করতে পারবে না’। খট্ করে কথাটা কানে লাগলো আমার – খুব যে একটা একাত্মতা বোধ করলাম বক্তব্যটির সঙ্গে তাও নয়। অন্যদিকে, তার বক্তব্যের সমর্থনে মাথা নাড়লেন কেউ কেউ। তার কথা মেনেও নিলেন অনেকেই ।আমার অস্বস্তি কিন্তু গেল না। বন্ধুর কথাগুলোকে কেমন যেন বড় মোটা দাগের মনে হচ্ছিল আমার কাছে। সেই সঙ্গে শুধু তিনটে কথাই আমার মনের বাঁকে বাঁকে ঘুরপাক খেতে খেতে প্রশ্ন তুলতে লাগলো। প্রথমেই মনে হলো, ‘মেধাবী মানুষদের নির্বাচন ও রাজনীতি করা উচিত নয়’ – এ রকম একটা ঔচিত্যের প্রশ্ন তুলে আমার বন্ধুটি ব্যক্তি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেন একটি সীমারেখা টেনে দিচ্ছেন। একজন ব্যক্তি মানুষ – মেধাবী হোন কিংবা না হোন – তিনি রাজনীতিতে নামবেন কী নামবেন না, অথবা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন কী করবেন না, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। তার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অযাচিত উপদেশ দিয়ে এবং সেখানে সীমারেখা টেনে আমরা তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হাত দিচ্ছি। নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করাটা যেমন একজন মানুষের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়াটাও তাই। সেখানে সীমাবদ্ধতার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমরা তার অধিকার খর্ব করতে চাচ্ছি – যা অনুচিত।

দ্বিতীয়ত আমার বন্ধুটির উপদেশ মানলে বলতে হবে যে, রাজনীতিকে মেধাহীনদের হাতে ছেড়ে দাও, অথবা রাজনীতিতে মেধাবীদের আসা মানে মেধার অপচয়, কিংবা উভয়। তার এ মতামত, রাজনীতিতে এখন যারা কার্যরত তাদের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন কটাক্ষ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমার বন্ধুটির উপরোক্ত উপসংহার দু’টো কতক গুলো মৌলিক ভ্রান্ত ধারণার প্রতিফলন। সুতরাং ঐ উপসংহার দু’টো মেনে নিতে আমার প্রবল অনীহা। আমি জানি আমার সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন, তবু সবিনয়ে পাঁচটা যুক্তির কথা বলি।

এক. অন্য সব কিছুতেই মেধার ভূমিকা অনেক, সন্দেহ নেই, কিন্তু রাজনীতিতে মেধার প্রয়োজন আরো বেশি। কারণ রাজনীতি শুধু একের নয়, বহুর; শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যতেরও; শুধু কোনো গোষ্ঠীর নয়, পুরো জাতির, সমাজের ও দেশের। অতএব, সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতা, দিকনির্দেশনা, প্রজ্ঞা রাজনীতিতে বড় প্রয়োজন। এবং এ সবকিছুর জন্যে দরকার আছে মেধা ও মননের। আমাদের উপমহাদেশের রাজনীতিতে নানা সময়ে মেধাবী ও মননশীল ব্যক্তিত্বেরা নানান ভূমিকা রেখেছেন- তাতে দেশ, জাতি ও সময় সমৃদ্ধ হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনীতি ও জনসেবা মেধাকে আকৃষ্ট করতে চায় নানাভাবে। সেখানে রাজনীতিতে মেধার আগমনকে স্বাগত জানানোর বদলে একটি নেতিবাচক বেড়ি দিয়ে আটকাতে চাওয়া কী ঠিক?

দুই. আমার বন্ধুটির কথা যদি মেনে নেই, তা হলে প্রশ্ন থেকে যায় – ‘রাজনীতির প্রেক্ষিতে মেধাবীদের ভূমিকা কী হবে? মেধাবীরা কি শুধু ‘রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক’ আর ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষকের’ ভূমিকাই নেবে’? বহুকাল আগে আশির দশকে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক রেহমান সোবহান আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, যা এখনও আমার মনে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের পরিবর্তন যদি করতে চাও, তা হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে হবে। বাইরে থেকে শুধু ‘বুদ্ধিজীবীর’ মতামত দিয়ে কিছুই হবে না’। এমন অমোঘ বাণী বড় একটা শুনিনি। সে বাণীর মোদ্দা কথা ছিল, ‘নেমে এসো রাজনীতির ভূমিতে, গা লাগাও, তারপর বদলাতে চেষ্টা করো প্রেক্ষাপট’।

তিন. আমার বন্ধুটির মতামত একটি সুপ্ত মাত্রিকতা ধরে আছে – ‘মেধা যেখানে আছে, তাকে সেখানে রেখে দাও, কারণ অন্য ক্ষেত্রের মেধাবীরা রাজনীতিতে মেধাবান হতে পারেন না’। অন্য কথায়, ভালো গায়ককে রেখে দাও গায়কীতেই, বিদ্যানকে বইয়ের মধ্যেই চুবিয়ে রাখো, প্রখ্যাত লেখককে কলম ছাড়তে দিও না। কারণ কী? কারণ আমরা তাদের ঐখানেই দেখতে চাই, সেই সঙ্গে আমরা রায় দিয়ে দিচ্ছি যে রাজনীতির মেধা তাদের নেই। সুতরাং ব্যাপারটা মূলত আমাদের ইচ্ছার এবং আমাদের অহংয়ের – আমাদের রায়ের বস্তুনিষ্ঠতার নয়। কারণ, বাস্তবে দেখা গেছে যে অন্য ক্ষেত্রে যারা মেধাবী, তারা রাজনৈতিক বিষয়েও প্রজ্ঞাবান হতে পারেন, রাজনৈতিক বিষয়ে তাদেরও বিরাট অঙ্গীকার থাকতে পারে এবং নানান রাজনৈতিক কর্মকা-ে তারা নিজেদের অত্যন্ত সফল বলে প্রমাণ করেছেন।

চার. কাউকে রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে আমাদের যদি দ্বিধা থাকে, দ্বিমত থাকে, আপত্তি থাকে, তাহলে তাকে আটকানোর জন্য নির্বাচনকেই ব্যবহার করা কি সঙ্গত নয়? তা না করে একেবারে ইচ্ছার জন্মমুহূর্তেই সেটাকে আটকে দেয়ার প্রচেষ্টাটা কী সঠিক?

পাঁচ. জানি, রাজনীতিকদের নিয়ে আমাদের অনেক হতাশা আছে। রাজনীতিবিদদের অপছন্দ করি বলে কি রাজনীতিকেও অপছন্দ করতে হবে? এ তো ‘স্নানের জল ফেলে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুটিকেও ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সামিল। এমনটা আমরা যদি করি, তাহলে রাজনীতির একটি বিরূপ মনোভাব, একটি তীব্র অনীহা আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে প্রোথিত করবো, যার ফলাফল মঙ্গলজনক হবে না।

তৃতীয়ত আমার বন্ধুটির মতামতের মধ্যে যদি কিছুটা আপাত আংশিক সত্যি লুকিয়ে থাকে, সেটা তার বক্তব্যের দ্বিতীয়াংশে- ‘ভালো মানুষেরা রাজনীতিতে টিকতে পারবেন না এবং কিছু করতে পারবেন না’। না, ভালো মানুষেরা রাজনীতিতে টিকতে পারবেন না, যদি সে ‘একা এবং একজন হয়’। করতেও পারবেনা কিছুই। কোন দেশেই সেটা হয়নি। কিন্তু ভালো মানুষেরা যদি যূথবদ্ধ হন, ‘একা এবং কয়েকজন’ হন; একটি ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সংখ্যায় আসেন, তখন কিন্তু রাজনীতির আকৃতি- প্রকৃতি বদলে যেতে পারে, পাল্টাতে পারে তার খাল-নলচে, ঘুরে যেতে পারে দাবার দান। অবশ্য সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে ‘মেধাবী’ মাত্রই ‘ভালো মানুষ’ হয় না, যেমনি সব ‘ভালো মানুষই’ মেধাবী নয়।

শেষের কথা বলি, বহুকাল আগে উচ্চারিত হতে শুনেছি, ‘আমি রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য কঠিন করে তুলবো’। তার ফল শুভ হয়নি। দলবদলের রাজনীতি তাতে উৎসাহিত হয়েছে, রাজনৈতিক মূল্যবোধ ভূ-লুন্ঠিত হয়েছে এবং রাজনীতিতে দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে পড়েছে। আমার বন্ধুটির সুপারিশ মেনে নিলে সেটা হয়ে দাঁড়াবে, ‘আমরা মেধাবীদের জন্য রাজনীতি নেতিবাচক করে দেবো’। এটার ফলও ভালো হবে না। দিন বদলের পালায় মেধাবী মানুষদের রাজনৈতিক গণ্ডির বাইরে রেখে সে পালা বদল কী সম্ভব?

লেখক : অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ