প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বৃক্ষমানব : কবি কমল চক্রবর্তী

মাহমুদ হাফিজ : ফেড জিন্স আর চটকদার লাল-শার্ট ছেড়ে যেদিন খাটো ধূতির ওপর পাঞ্জাবি-ফতুয়া চড়ান, সেদিনই বুঝেছিলেন নাগরিক খ্যাতি ও চাকচিক্যময় কর্পোরেট জীবন তার জন্য নয়। নাগরিক কোলাহল ছেড়ে মধ্য বয়সেই বেছে নেন জল-জঙ্গল-প্রকৃতির জীবন। একহাতে কলম, আর অন্য হাতে কাস্তে-নিড়ানি; পকেটে বিভিন্ন গাছের বীজ। বলছি ভারতের বৃক্ষ-মানব কবি কমল চক্রবর্তীর কথা, সত্তরোর্ধ বয়সেও যিনি তারুণ্যে সজীব। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ভালোপাহাড়’ নামে দুর্গম পাহাড়ি প্রান্তরে দশ লাখ গাছের এক অরণ্য আর মুক্ত পাখির ভিন্ন জগৎ। যেখানে গভীর রাতে দুহাতে গাছ জড়িয়ে ‘হে বৃক্ষনাথ, বৃক্ষনাথ’ বলে কাঁদতে থাকেন তিনি।

সম্প্রতি কলকাতায় এই বৃক্ষমানবের সঙ্গে একটি আলাপচারিতায় বসতে চাইলে তিনি সম্মত হন। লেখালিখির জগতে অর্ধশতাধিক কাব্য, উপন্যাস, দর্শনের বই লিখেছেন তিনি। সাহিত্য নিয়ে আলাপ শুরু করতে চাইলে তিনি বললেন, ‘দ্যাখো, সাহিত্য বিশ্বকে বাঁচাবে না, বাঁচাবে বৃক্ষ। বৃক্ষ আছে, ছিলো, থাকবে। বিশ্বকে বাঁচাতে গাছ লাগাও, গাছ। বহুদিন থেকে বৃক্ষ বন্দনাই আমার দর্শন। বৃক্ষ ছাড়া প্রাণি বাঁচতে পারে না। আমরা যে খাবার খাই তা বৃক্ষজাত, আমাদের জামাকাপড়, ব্যান্ডেজ, তুলা বৃক্ষজাত। আমাদের পেট্রোল-কয়লার মূল উপাদান বৃক্ষ, আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস অক্সিজেনে বৃক্ষের অবদান, আমাদের গৃহে বৃক্ষের উপাদান। মানুষ যে ধর্ম-দর্শনেরই হোক, বৃক্ষের কাছে তার বাছবিচার নেই, সবাইকে সে ছায়া দেয়।’

কমল চক্রবর্তীর স্থায়ী বসবাস এখন ‘ভালোপাহাড়’-এ। ঝাড়খ–পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলা পুরুলিয়ার দলমা-রুয়াম পাহাড় বেষ্টিত এক নির্জন বিস্তীর্ণ এলাকা এটি। কিন্তু সরকারি খাতায় বান্দোয়ান, ডাঙরজুড়ি নামে এর পরিচয়। কলকাতা-জামশেদপুরে চলাচলকারী ‘ইস্পাত’ নামের ট্রেনে চেপে নির্জন গালুডি স্টেশনে নামার পরে বন-পাহাড়ি রাস্তায় স্কুটারে করে ভালোপাহাড়ে যাওয়া যায়।

গত শতকের নয় দশকের মাঝামাঝি কমল চক্রবর্তী বন্ধুদের নিয়ে এই পাহাড়ি রুক্ষ এলাকায় অরণ্য গড়ে তুলতে শুরু করেন যখন সেখানে কোনো গাছপালা ছিলো না। নদী ছিলো শুষ্ক। বৃষ্টিপাত তেমন হতোই না। তখন তারা ভাবলেন বৃক্ষই এর একমাত্র সমাধান। বৃক্ষই টেনে আনবে মেঘবৃষ্টি।  বর্তমানে সেখানে কাটা হয়েছে পুকুর, করা হয়েছে শাক-সবজির ও ধানের ক্ষেত। এর সঙ্গে জাগরণ বিদ্যাপীঠ, চিকিৎসাকেন্দ্র, খেলারমাঠ ইত্যাদি। কারণ এই অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতালদেও বসবাস। এখানে দুইশ আদিবাসী শিশুকে দুপুরের খাবার খাওয়ানো হয় যা আসে ভালোপাহাড়ের ক্ষেত থেকে। এখানে বিভিন্ন সময় আয়োজন করা হয় মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব, মূল উদ্দেশ্য স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা করা।

আড়াই দশক আগে অরণ্য সৃষ্টির যে শুরু, তারও আবার শুরু আছে। ষাটের দশকের শেষে জামশেদপুরে সমমনা পাঁচবন্ধু ‘পঞ্চ পা-ব’ খ্যাতি কুড়িয়ে ছিলেন। বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতি আর বাউন্ডুলেপনার জন্য। এরা হলেন বারীণ ঘোষাল, কমল চক্রবর্তী, সুভাষ ভট্টাচার্য, অরুণ আইন, শক্তিপদ হালদার। কমল চক্রবর্তী রচিত ‘কৌরব’ নাটক মঞ্চায়ন করতে গিয়ে তারা জোড় বাঁধেন। পরে যোগ দেন দেবজ্যোতি দত্ত। কাব্য ও প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে তারা বন-পাহাড়-সমুদ্রতীরে কবিতা ক্যাম্প শুরু করেন। এই সূত্রে পরে বের হয় ‘কৌরব’ পত্রিকা। ঘর ছেড়ে তিনচারদিন প্রকৃতির মাঝে থাকতে থাকতে এদের মধ্যে আসে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হলো ভালোপাহাড়। এরা কাব্যচর্চা, কর্পোরেট চাকরি ও বোহেমিয়ানার মধ্যেই খুঁজে বের করেন দলমা-রুয়াম পাহাড়ের মধ্যকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। শুরু হয় অরণ্য গড়ার কাজ। টাটা কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে কমল চক্রবর্তী ডেরা বাঁধেন পাহাড়ি প্রান্তরে। বারীণ ঘোষালও চাকরি ছাড়েন। অবশেষে ছয়বন্ধুর সম্মিলিত স্বপ্নের সার্থক রূপ দিতে সংসারহীন কমল চক্রবর্তীই নিবেদিত হয়ে যান।

ভালোপাহাড়ে কী কী গাছ আছে এ প্রশ্নে কমল চক্রবর্তী বলেন, ‘সেখানে কী নেই সেই প্রশ্ন করা ভালো। অশ্বত্থ, পাকুর, শিমুল, সপ্তপর্ণী, গামার, মহুয়া, হরিতকি, অর্জুন, শাল, শিরিষ, মেহগিনী, মেজুরি, সোনাঝুরি, পলাশ, আম, কাঁঠাল, হিজল, শিশু, কেয়া, ছাতিম, ঝাউ, দেবদারু, মুসানডা, বাদরলাঠি, বহেড়া, ধাওয়া, কেঁদ, থাইবট, চন্দন, কফি, মুচকুন্দ, জামরুল, জাম, আঙুর, আপেলসব। এই অরণ্যে সকাল-সন্ধ্যা টিয়া, ঘুঘু, বুলবুল, বসন্তবৌরি, ইষ্টিকুটুম, কোকিল, শালিক, কাক, চড়াই, টুনটুনি, হাড়িচাঁচা, মুনিয়া, বক, বেনেবৌয়ের কাকলি। সবজি ক্ষেতে আবাদ হচ্ছে সবজি, ফসলের মাঠে কালোনুনিয়ার মতো দেশি ধান। এর খামারের গরু যখন নিজস্ব মাঠের সবুজ ঘাসে চড়ে বেড়ায় তখন তার পিঠে বসে থাকে মেঠোশালিক।’

তিনি ‘হে বৃক্ষনাথ’ নামে একটি চমৎকার পুস্তিকাও রচনা করেছেন। বৃক্ষবন্দনাই এই বইয়ের মুখ্য বিষয়। এ বিষয়ে তিনি বলেন ‘একদল আছে- কুয়াশাপ্রান্তর, মেঘ ছুঁয়ে দিগন্তে কাকের উড়ে যাওয়া, শিশির-ঝরা রাত যাদের ভীষণ অপছন্দ। ফুলেফুলে হলুদ বেনেবৌ, রঙিন হাজারিকা, গরুর মাঠের ধবধবে সাদা বক এদের সহ্য হয় না। নিপুণ কলাকৌশলে পুঁথিপড়া বাঘাবাঘা প-িতরা আজ নির্মাণের ছুঁতোয় সব মুছে দিতে প্রস্তুত। এই পরিস্থিতির মুখে বৃক্ষময় একটি জগৎ গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

কমল চক্রবর্তী নাটক, কবিতার মধ্য দিয়ে লেখালিখি শুরু করলেও একের পর এক গোটা পঁচিশ উপন্যাস লিখেছেন। তার লেখার ঝুলিতে ‘মিথ্যেকথা’র মতো জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ যেমন রয়েছে তেমনি আছে অলীক গসপেল, বৃক্ষ, ব্রহ্মভার্গবপুরাণ, ব্রাহ্মণনবাব, আমারপাপ, রুটিরওপিঠ, লিটলম্যাগাজিন, কলকাতাসহ অনেক আলোচিত উপন্যাস। তবে আলাপচারিতায় তাকে লেখালিখি নিয়ে আলাপে খুব আগ্রহী হতে দেখা গেলো না। বৃক্ষচর্চাকে বন্দনার মধ্যে না রেখে বৃক্ষসৃজন ও বৃক্ষপ্রেম ছড়িয়ে দেয়াকে যিনি জীবনের আরাধ্য মেনেছেন, তার কাছে লেখালিখির আলাপ গৌণ। এ প্রসঙ্গে বরং তিনি এগিয়ে দেন তার জীবনদর্শন ‘হে বৃক্ষনাথ’। লেখক : মাহমুদ হাফিজ, প্রদায়ক সম্পাদক, দৈনিক আমাদের নতুন সময়। সম্পাদনা : বিভুরঞ্জন সরকার, শাশ্বত জামান।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ