প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নারী শ্রমিকের মানবেতর জীবন

সেলিম জাহান : ছবিটার দিকে যতবার চোখ পড়ে ততবারই একটা ভয়ংকর হিমশীতল ভয়ের অনুভূতি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে থাকে। আমার শুধু মনে হয়, যদি কোন মতে মেয়েটির মাথা থেকে একটি ইট ফস্কে পেছনের দিকে পড়ে! এটা ভাবতেই আমি শিউরে উঠি এবং অতি দ্রুত চোখ বন্ধ করে ফেলি। কিন্তু আমি চোখ বন্ধ করলেই তো আর বাস্তবতা বন্ধ হয় না – ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ ছবিটি কে পাঠিয়েছিলেন, কিংবা কোথা থেকে ওটা পেয়েছিলাম, মনে নেই – কিন্তু ছবিটা যে জীবন্ত আমার কাছে, বহুবার দেখেছি নানান সময়ে নানান জায়গায়। ঐ যে আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে গ্রামবাংলার নারী শ্রমিকদের ওপর বিস্তৃত এক গবেষণার সময়ে তিন মাস ধরে ফরিদপুর জেলার নানান অঞ্চলে টই টই করে ঘুরেছি দলবলসহ, তখনই প্রথম এ জাতীয় দৃশ্যটি দেখি। আশির দশকেই বাংলাদেশে মেয়েরা বেশ বড়সড় আকারে ক্রমপ্রসারমান নির্মাণখাতে আসতে শুরু করেছিল। তাঁরা মূলতঃ নিয়োজিত হয়েছিলো ইট ভাঙ্গা, ইট ভেজানো ও ইট বওয়ার কাজ -স্বল্প দক্ষতার অল্প মজুরীর কর্মকা-ে। কী অমানুষিক পরিশ্রম যে করতে হত এবং এখনো করতে হয় নির্মাণখাতে নিয়োজিত মহিলা মজুরদের। অতগুলো ভারী ইট কী করে তারা মাথায় তুলে নেয়? কী বিপজ্জনকভাবে তাদের সেগুলো বহন করতে হয়! কেউ কি কখনো ভাবে, এ কাজে তাদের শরীরের কতখানি ক্ষতি হচ্ছে?

কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণ তো শুধু নির্মাণ খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ওই তিনমাস ফরিদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরাঘুরির সময়ে কৃষিখাতেও নারী-শ্রমিকদের জীবন ও জগতের নানা রূঢ় বাস্তবতা দেখে ‘থ’ হয়ে গেছি। শ্রমিক হিসেবে তারা অন্য শ্রমিকের মতোই শোষিত- কোন সন্দেহ নেই তাতে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই তাদের শোষণ ও নিপীড়নের আরেকটা মাত্রিকতা আছে- এবং সেটা তারা শুধু নারী বলে।

গ্রাম-বাংলার নারী-পুরুষ শ্রমিকদের দেখে আমার সবসময়ে তিনটে কথা মনে হয়েছে। এক : শ্রম বাজারে পুরুষ শ্রমিকেরা শুধু ‘শ্রমিক’ হিসেবেই, কিন্তু নারী শ্রমিকেরা আসে ‘শ্রমিক’ ও ‘মা’ হিসেবে। কাজের মাঝেও তাঁদের ‘মাতৃত্ব’ স্বত্ত্বাকে নিয়ে আসতে হয়- সমাজে তাঁদের পূর্ব-নির্ধারিত ভূমিকা ও জীবন-বাস্তবতার নিরিখে এ ভিন্ন অন্য কোন উপায়ও নেই। বর্তমান ছবিটিও তো ঐ চালচিত্রের একটি বড় প্রমাণ। দুই : অন্ততঃ কৃষিখাতে, অর্থ-ভিত্তিক মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, নারী-শ্রমিকেরা শ্রমের বদলে পায় হয় ‘দু’সের ধান’, কিংবা ‘এক সের চাল’ অথবা ‘তিন সের খুদ’। তিন : নারীদেরকে খাটিয়ে নেয়া হয় বেশী- চুক্তি-মাফিক কর্মকা-ের বাইরে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দিয়ে কিংবা মজুরি না বাড়িয়ে কাজের সময়সীমা দীর্ঘতর করে।

আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে নারী-শ্রমিক নিয়োজনের ক্ষেত্রে তিনটে বিষয় দেখেছি, যা আমাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। তার প্রথমটি হচ্ছে ‘অগ্রিম ভাত-শ্রম ব্যবস্থা’। না আমি ‘পেটে-ভাতের’ ব্যবস্থার কথা (যেখানে শ্রমের বদলে শ্রমিক শুধু ভাত খেতে পাবে) বলছি না। আমি বলছি ওই ব্যবস্থার কথা, যেখানে বুভুক্ষায় কাতর নারী শ্রমিককে আজকে ভাত খেতে দেয়া হলো এই শর্তে যে, আগামীতে যখনই প্রয়োজন হবে, তখনই নারী শ্রমিক তার শ্রম দিতে বাধ্য থাকবে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে,ক্ষুৎপীড়িত নারী শ্রমিক দু’মুঠো ভাতের জন্য শৃঙ্খলিত হয়ে যাচ্ছে নানান মালিকের কাছে এবং সর্ব অর্থেই এ শৃঙ্খল অমানবিক।

দ্বিতীয়ত : বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে পুরুষ ও নারী ক্ষেতমজুর, উভয়েরই ফসল তোলার সময়ে প্রচরণ করে। নারী ক্ষেতমজুরদের ক্ষেত্রে কোনো কোনো জায়গায় একটি বিশেষ ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়, যার নাম ‘ফসল তোলা বিয়ে’। এ ব্যবস্থার মূল কথা হচ্ছে, যে সব নারী ক্ষেতমজুর ফসল তোলার সময়ে কাজ করতে আসে, তাদের মধ্যে যাদের কর্মঠ বলে মনে করা হয়, তাদের জোতদারেরা সাময়িকভাবে বিয়ে করে নেয়। এ বিয়ের শর্তগুলো হচ্ছে : ক. এ বিয়ে সাময়িক – ফসল তোলা ও আনুসঙ্গিক সব কাজ শেষ হয়ে গেলে পরেই এ বিয়ে আপনাআপনি ভেঙ্গে যাবে; খ. বিয়ে বজায়কালীন ক্ষেতমজুর-স্ত্রীটির খোরপোশের দায়িত্ব জোতদার-স্বামীর; গ. ফসল তোলার শেষে একটি পূর্ব-নির্ধারিত পরিমাণ ধান নারী ক্ষেতমজুরটি পাবে; ঘ. ‘ফসল তোলা স্ত্রী’ একজন সাধারণ স্ত্রীর মর্যাদা বা অধিকার পাবে না; ঙ. বিয়ে বজায়কালীন ক্ষেতমজুর-স্ত্রীটি যদি গর্ভবতী হয়, ‘ফসল তোলা বিয়ের’ নিয়ম অনুযায়ী, জোতদারের তার কোন দায়-দায়িত্ব নেই। সামন্ততান্ত্রিক উপায়ে নারী পীড়নের এ এক মোক্ষম উদাহরণ।

তৃতীয়ত : গ্রাম-অর্থনীতিতে অনেক সময়ে নারী শ্রমিককে নিয়োজন দান করা হয় এই শর্তে যে, তার কোন শিশু সন্তান থাকলে শিশুটিকে সে কাজের জায়গায় নিয়ে আসতে পারবে না। এ ব্যবস্থাটি করা হয় দু’টো কারণে- এক : শিশুসন্তান কর্মক্ষেত্রে থাকলে মায়ের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে এবং দুই : মাকে মজুরি হিসেবে খাবার দেবার ব্যবস্থা থাকলে শিশুটির জন্য অতিরিক্ত খাবার দিতে হতে পারে। এ ব্যবস্থার অধীনে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক মাকে অবিশ্বাস্য সব পন্থা অবলম্বন করতে দেখেছি। যেমন, মালিকের বাড়ীর সদরে শিশুসন্তানটিকে মা শেকল দিয়ে বেঁধে কিছু খাবার সামনে রেখে গেছে, যাতে শিশুটি হারিয়ে না যায়।

আশির দশকের শেষ দিকে ফরিদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, গ্রাম-বাংলায় নারী শ্রমিকেরা একটি সামন্ততান্ত্রিক অবকাঠামোতে কাজ করে, যেখানে মানুষের নূন্যতম মানবিক অধিকার ভুলুন্ঠিত। ৩০ বছর পরে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির আশ্বাস, তাদের নতুন করে বাঁচার চেতনা সেখানে পৌঁছেছে কিনা জানি না। কিন্তু বারে বারে কেনো যেনো মনে মনে হয়, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

লেখক পরিচিতি: জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ