প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পলিটিক্স ইন পলিটিক্স

খোন্দকার আতাউল হক : পৃথিবীর ১২২টি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে আমার বাংলাদেশও একটি স্বীকৃত গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু আমাদের দেশের গণতন্ত্রের অবয়বটা কেমন যেনো অগণতান্ত্রিক মনে হয়! পৃথিবীর বাকি ১২১টি গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্র কি আমাদের দেশের গণতন্ত্রের মতই? জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ব্যতীত গণতন্ত্র বাস্তবায়ন কি সম্ভব? আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক অধিকার তো জনগণের জন্য নয়। এসব অধিকার কেবল রাজনৈতিক দলসমূহের জন্যই প্রযোজ্য। এখানে জনগণের অধিকার অপহৃত এবং পদদলিত। রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে জনগণ চরম অসহায়। রাজনৈতিক দলগুলোর এমন সব আচার-আচরণ দেখে বলাই যায়, ‘কৌটার মধ্যে কৌটা’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অধিকাংশ জনসভায় প্রসঙ্গ টেনে বক্তৃতায় বলতে শুনেছি, ‘কৌটার মধ্যে কৌটা’। এই কথার অর্থ আমি যেভাবে বুঝেছি তা হলো, ‘পলিটিক্স ইন পলিটিক্স’। অর্থাৎ রাজনীতির মধ্যে রাজনীতি। দলের মধ্যে দল। নেতার মধ্যে নেতা। জনগণের সাথে এই খেলাটাই খেলছেন আমাদের রাজনীতিকরা। তারা মনে করেন আমরা শিয়াল প-িত আর জনগণ মুরগি। অথচ এরা ভুলেই গেছে যে, সংবিধান মতে জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস। যারা জনগণের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার বঞ্চিত করে নিজেদের দলীয় স্বার্থ অদায়ে অগণতান্ত্রিক এবং অপরাজনীতিতে লিপ্ত হয় তাদের কখনই জনহিতৈষী বা মানববান্ধব রাজনীতিবিদ বলা যায় না।

ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, ইংল্যান্ডকে বলা হয় গণতন্ত্রের জন্মভূমি। ইদানিং শুনতে পাচ্ছি বাংলাদেশে নাকি গণতন্ত্রের ‘মা’এর জন্ম হয়েছে। কি হাস্যকর কি নোংরামি! আমার শুনতে লজ্জা লাগে, ওদের বলতে লজ্জা করে না? জনগণের ভাবনা কিন্তু উল্টোটা। পেটে যাদের গণতন্ত্রের আদর্শিক নূন্যতম বিদ্যা নেই সে সব দলে নাকি গণতন্ত্রের মা আছে?

বিশ্বে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা আব্রাহাম লিংকনের পিতা জুতার ব্যবসা করলেও আব্রাহাম লিংকন ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত এবং বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি গণতন্ত্রের যুগোপযোগী সূত্রায়িত করেও ঐতিহাসিকভাবে ‘ফাদার অব দ্য ডেমোক্রেসি’ হতে পারেনি? এদেখেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলসমূহের শিক্ষা হয় না।

সবচেয়ে দু:খের বিষয় হলো, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা নির্বোধের মতো নিজেকে ‘বঙ্গবন্ধু’র উপাধির সারিতে নাম লেখাতে চায়। অথচ এই নির্বোধদের জানা প্রয়োজন শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন মানবতাবাদী এবং মানব বান্ধব রাজনীতিবিদ।

আজকাল বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলসমূহের এক শ্রেণির নেতাকর্মীদের চামচাগিরি পাকাপোক্ত করতে দলের শীর্ষ নেতাকে খুশি করার লক্ষ্যে ‘উপাধি’ প্রদানের হিড়িক পড়ে গেছে। দেশ ও জাতির কাছে সৃষ্টিশীল এবং ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন না করেই কেউ ‘দেশরত্ন’, কেউ ‘পল্লীবন্ধু’ আবার কেউ গণতন্ত্রের ‘মা’ হচ্ছেন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের এ হেন বিভৎস আচরণ দেখে গণতন্ত্র যেনো লজ্জাবতী গাছ হয়ে গেছে। যে দল যখন তাকে ছুঁতে যায়, সে অমনি লজ্জায় আড়ষ্ঠ হয়ে নুয়ে পড়ে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে, দেশে বড় তিনটি রাজনৈতিক দল। এই তিনটি বড় রাজনৈতিক দলই ক্ষমতার মোহমুক্তি হতে পারেনি। গণতন্ত্রকে তারা দলীয় কারাগারে বন্দি করেছে।

একত্ববাদী ও দলীয় মৌলবাদীর কারণে দেশে গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের সিলসিলা আবরণের অন্তরালে চলছে নোংরা রাজনীতি। ফলে গণতান্ত্রিক ভাষার পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে অগণতান্ত্রিক পরিভাষা। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের নামে এমন অশুভ, অসৌজন্য, অশোভন, দাম্ভিক, কর্কশ ভাষা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে ব্যবহার হয় কি না আমার জানা নেই।

আমার জানা মতে, গণতন্ত্র হচ্ছে সংঘাত, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসাকে পদানত করে পরমসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়। গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু ৪৭ বছরেও গণতন্ত্র অপরিপক্ব রয়ে গেলো।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ